সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে’
‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে’

‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে’

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলে। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের এ মারণাস্ত্র দুটি মুহূর্তে লাখো প্রাণ কেড়ে নেয় এবং তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত প্রভাবে মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম ট্র্যাজেডি রচিত হয়। এই হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি টানলেও, মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। আজ ৬ আগস্ট জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার ৮১তম বার্ষিকীতে এই আয়োজন।

পারমাণবিক বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জাপানের দুই শহর হিরোশিমা (বাঁয়ে) এবং নাগাসাকি (ডানে)

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস; জার্মানির নাৎসি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে তত দিনে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু অক্ষশক্তির আরেক দেশ জাপান তখনো অনমনীয়, কিছুতেই তারা পরাজয় স্বীকার করবে না। ফলে মূল রণক্ষেত্র ছেড়ে যুদ্ধ তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ইউরোপ, নতুন শক্তি হিসেবে দ্রুত এগিয়ে আসছে সোভিয়েত ইউনিয়ন—এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের ওপর একক আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের সামরিক শক্তি দেখাতে চাইছিল যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে ছিল জাপানের করা অপমানের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াইয়ে অবস্থিত মার্কিন নৌ ঘাঁটি পার্ল হারবারে আকস্মিক আক্রমণ করে জাপানই যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টেনে এনেছিল। আক্রান্ত হওয়ার পরদিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মান সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসা বাকি ছিল। দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে জুলাই মাসে পটসডাম সম্মেলনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলো জাপানকে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু অনমনীয় জাপান একবাক্যে তা প্রত্যাখ্যান করে।

অপমানের প্রতিশোধ, জাপানের অহংকার দমন এবং বিশ্বকে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি দেখাতে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান, যার পরিণতিতে মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছিল।

ম্যানহাটন প্রজেক্ট: মারণাস্ত্র তৈরির নেপথ্যে

পারমাণবিক বোমার ইতিহাস কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাফল্য নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতির ভীতি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতার ফসল। ১৯৩৮ সালে জার্মানিতে পারমাণবিক ফিশন আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আলবার্ট আইনস্টাইনসহ অনেক বিজ্ঞানী ভয় পেয়েছিলেন, নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার যদি সবার আগে পারমাণবিক বোমা হাতে পেয়ে যান, তবে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য।

ম্যানহাটন প্রকল্পে তৈরি বোমা, নাম গ্যাজেট

এই ভয় থেকেই ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে চিঠি লেখেন। এর ধারাবাহিকতায় সূচনা হয় অত্যন্ত গোপনীয় ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর। নিউ মেক্সিকোর লস আলামোসে গড়ে তোলা হয় গোপন গবেষণাগার। ওই পারমাণবিক গবেষণাগারের সামরিক প্রধান ছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভস এবং বৈজ্ঞানিক পরিচালক ছিলেন জে রবার্ট ওপেনহেইমার।

কয়েক শ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং শত কোটি ডলারের বাজেটে রাতদিন কাজ চলতে থাকে। অথচ যে ভয়ে এই মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। জার্মানির আত্মসমর্পণের পর নাৎসিদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তাহলে কেন ম্যানহাটন প্রজেক্ট বন্ধ হলো না? এর কারণ, মার্কিন সামরিক প্রশাসন ও রাজনীতিবিদেরা তত দিনে বুঝে গিয়েছিলেন, এই অস্ত্র কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করার অস্ত্র নয়, বরং এটি হবে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

ট্রিনিটি বিস্ফোরণের পর তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব

‘কোডনেম: ট্রিনিটি’

নিউ মেক্সিকোর আলামোগর্ডোর মরুভূমিতে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর ৫টা ২৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে ঘটে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা—যার কোডনেম ‘ট্রিনিটি’।

সেদিন মরুভূমির বালির ওপর থেকে হঠাৎ এক বিশাল আগুনের গোলা ও ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী মাশরুমের আকারে আকাশে উঠতে শুরু করে। সেটির আলোর ঝলকানি সূর্যের মতোই উজ্জ্বল ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর টের পাওয়া যায় ঝাঁকুনি ও ফাটলের শব্দ। চারপাশের পর্বত থেকে তার প্রতিধ্বনি শোনা যেতে শুরু করে।

বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর তীব্রতা ছিল প্রায় ২১ কিলোটন ট্রাইনাইট্রোটোলুইন বা টিএনটির সমান। মুহূর্তের মধ্যে ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) উঁচু পরীক্ষার টাওয়ার এবং এর চারপাশের তামা ও লোহার তৈরি সব যন্ত্রপাতি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আকাশে তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব।

রবার্ট ওপেনহাইমার (বাঁয়ে) ও ম্যানহাটান প্রকল্পের প্রধান জেনারেল লেসলি গ্রোভস ট্রিনিটি পরীক্ষা স্থলে প্রায় ১০০ ফুট উঁচু টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে পরীক্ষামূলক বোমাটি রাখা হয়েছিল

যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের চোখে ওই বিস্ফোরণ অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের অনুভূতি তৈরি করেছিল। নিজেদের সাফল্য দেখে শুরুতে তাঁরা সবাই উল্লাস করে উঠেছিলেন।

এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রের নতুন এক যুগে প্রবেশ করে।

দাবি করা হয়, সে সময় ওপেনহেইমার ভগবদ্‌গীতার একটি শ্লোক বলেছিলেন। সেটি হলো, ‘এখন আমিই মহাকাল, আমিই বিশ্বের ধ্বংসকর্তা’।

ওপেনহেইমার সংস্কৃত ভাষা জানতেন, গীতার শ্লোকও আওড়াতেন। তবে পরীক্ষায় পারমাণবিক বোমার ধ্বংসের ক্ষমতা নিজের চোখে দেখার পর তিনি এ কথা বলেছিলেন কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে।

পরে ১৯৬৫ সালে এনবিসি নিউজে প্রচারিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ডিসিশন টু ড্রপ দ্য বোম্ব’-এর জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওপেনহেইমার বলেন, ‘আমরা জানতাম পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। কয়েকজন হেসেছিল, কয়েকজন কেঁদেছিল, অধিকাংশ মানুষই ছিল নীরব। আমার হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্‌গীতার একটি লাইনের কথা মনে পড়েছিল; যেখানে বিষ্ণু যুবরাজকে (অর্জুন) বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাঁর কর্তব্য পালন করা উচিত এবং তাঁকে প্রভাবিত করতে নিজের বহু-বাহু রূপ ধারণ করে বলছেন, ‘এখন আমিই মহাকাল, বিশ্বের ধ্বংসকর্তা’। আমি মনে করি, আমরা সবাই কম-বেশি সেটাই ভেবেছিলাম।’

প্রথম পরীক্ষায় সাফল্যের পরে ওপেনহেইমারের অধীনে কাজ করা বিজ্ঞানীরা আরও দুটি বোমা বানাতে মনোযোগ দেন। প্রথমটি ছিল ইউরেনিয়ামভিত্তিক বোমা, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘দ্য লিটল বয়’ এবং প্লুটোনিয়ামভিত্তিক দ্বিতীয়টির নাম দেওয়া হয় ‘দ্য ফ্যাট ম্যান’।

৩ দশমিক ১ মিটার লম্বা এবং প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কেজি ওজনের ‘লিটল বয়’

‘লিটল বয়’: হিরোশিমার ওপর যেন নরক নেমে আসে

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। জাপানের শিল্পনগরী হিরোশিমার আকাশ ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। মানুষ তখন কাজে বের হচ্ছিলেন, শিশুরা যাচ্ছিল স্কুলে।

হঠাৎ করেই হিরোশিমার আকাশে দেখা দিল মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’। পাইলট পল টিবেটস বোমারু বিমানের পেট থেকে মুক্ত করে দিলেন ৩ দশমিক ১ মিটার লম্বা এবং প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কেজি ওজনের ‘লিটল বয়’-কে।

শহরের আকাশে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উঁচুতে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। পরের কয়েক সেকেন্ডে যা ঘটেছিল, তা মানুষের কল্পনাতীত।

বিস্ফোরণের কেন্দ্রে তাপমাত্রা মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রায় ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার কাছাকাছি।

প্রায় সাড়ে ১২ কিলোটন টিএনটির সমপরিমাণ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন এই বোমার আঘাতে শহরের কেন্দ্রস্থলের প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভস্মীভূত হয়ে যায়।

অকল্পনীয় তাপে কেন্দ্রের ১ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে থাকা কয়েক হাজার মানুষ মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। কোনো মন্ত্রবলে যেন তাঁরা হাওয়ায় উবে গেছে। অবশিষ্টাংশ হিসেবে মাটিতে পাথরের ওপর কেবল তাঁদের ছায়া মুদ্রিত হয়ে রয়ে যায়।

ঘণ্টায় শত শত মাইল বেগে ধেয়ে আসা বিস্ফোরণের ধাক্কায় (শকওয়েভ) শহরের কয়েক হাজার ভবন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। অটোমিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের নথিপত্র অনুযায়ী, বিস্ফোরণের প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই হিরোশিমার প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

বিস্ফোরণ-পরবর্তী প্রথম চার দিনের মধ্যেই আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হওয়ায় এবং তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে বছর শেষে মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

নাগাসাকিতে আঘাত হানা পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’

ফ্যাট ম্যান: নাগাসাকির দুর্ভাগ্য

হিরোশিমায় বোমাবর্ষণের মাত্র তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলে। দ্বিতীয় এই হামলার সঙ্গে ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও মর্মান্তিক পরিহাস লুকিয়ে আছে।

এদিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যবস্তু জাপানের নাগাসাকি শহর ছিল না। মার্কিন বোমারু বিমান ‘বক্সকার’-এর মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল জাপানের আরেক শিল্পসমৃদ্ধ শহর কোকুরা। পেটের ভেতর ‘ফ্যাট ম্যান’-কে নিয়ে মার্কিন বোমারু বিমান যখন কোকুরা শহরের ওপর পৌঁছায়, তখন নিকটস্থ কারখানায় অগ্নিকাণ্ড এবং আগের দিনের বোমাবর্ষণের কারণে পুরো শহরের আকাশ ঘন ধোঁয়া ও মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। মার্কিন পাইলট চার্লস সুইনি তিনবার কোকুরার ওপর চক্কর কাটেন, কিন্তু ভিউফাইন্ডারে লক্ষ্যবস্তু স্পষ্ট দেখতে পাননি।

বিমানের জ্বালানি দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। চালক সুইনি বিকল্প লক্ষ্যবস্তু নাগাসাকির দিকে মোড় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ২ মিনিটে নাগাসাকির ওপর ফেলা হয় ‘ফ্যাট ম্যান’। পাহাড়ে ঘেরা নাগাসাকি শহরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বোমার ক্ষয়ক্ষতি হিরোশিমার চেয়ে কিছুটা কম হলেও, মুহূর্তের মধ্যে ৪০ হাজার মানুষ উধাও হয়ে যায়। বছরের শেষ নাগাদ নাগাসাকিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০ হাজারের বেশি।

জাপানি ভাষায় যুক্ত হয় নতুন শব্দ ‘কোকুরা নো কোউন’, বাংলায় ‘কোকুরার সৌভাগ্য’। এর অর্থ অজান্তেই চরম বিপর্যয় থেকে বেঁচে যাওয়া। কিন্তু কোকুরার সেই বেঁচে যাওয়া নিশ্চিত করেছিল নাগাসাকির মৃত্যু পরোয়ানা।

কালো বৃষ্টি ও ‘হিবাকুশা’

বিস্ফোরণের পর নাটকীয়তা শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছিল আসল দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণের কিছুক্ষণ পর আকাশ থেকে নেমে আসে এক ঘন, থকথকে, তৈলাক্ত ও বিষাক্ত কালো বৃষ্টি, যা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক রেইন’বা ‘কালো বৃষ্টি’ নামে পরিচিত।

তীব্র তাপে দগ্ধ-তৃষ্ণার্ত মানুষ আকাশ থেকে পড়া সেই পানির ফোঁটা পান করেছিল। তাঁরা জানত না, ওই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় মিশে আছে অত্যন্ত মারাত্মক তেজস্ক্রিয় কণা।

যাঁরা পরমাণু বোমার আঘাতে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণে মারা যাননি, তাঁরা শিকার হন বিকিরণজনিত অসুস্থতায়। তাঁদের মাথার চুল উঠতে শুরু করে, চামড়ায় লাল দাগ দেখা দেয়, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু ঘটে।

হামলার পর যাঁরা অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’।

হিবাকুশারা কেবল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেননি, সমাজে তাঁরা দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। মানুষ ভয় পেত যে তাঁদের তেজস্ক্রিয়তা সংক্রামক কিনা। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মেও বিকিরণজনিত বিকলাঙ্গতা নিয়ে সন্তান জন্ম নেওয়ার আশঙ্কায় হিবাকুশাদের বিয়ে করা বা চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

নাগাসাকি হামলার মাত্র আট দিন পর (১৭ আগস্ট ১৯৪৫) ওপেনহাইমার পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে মার্কিন প্রশাসনে চিঠি পাঠান এবং লস আলামোস গবেষণাগারের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন

‘কাঁদুনে বিজ্ঞানী’

১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর। শরৎকালের এক সকালে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে প্রবেশ করেন কৃশকায় এক পদার্থবিজ্ঞানী-জে রবার্ট ওপেনহেইমার। তিন মাস আগেও যিনি ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে গোপন ও ধ্বংসাত্মক সামরিক উদ্যোগ ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর সর্বেসর্বা, বিশ্ব যাকে চেনে ‘পারমাণবিক বোমার জনক’ হিসেবে।

ওপেনহেইমার হোয়াইট হাউসে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সঙ্গে দেখা করতে। ট্রুম্যান মূলত ওপেনহেইমারকে ডেকেছিলেন পরমাণু শক্তির ওপর মার্কিন সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বিলে সমর্থন আদায় করতে।

তবে ওপেনহেইমার চেয়েছিলেন বিপরীতটা-পারমাণবিক প্রযুক্তি যেন কোনো একটি দেশের সামরিক ক্ষমতার হাতিয়ার না হয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বসংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে, যাতে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোখা যায়।

বিজ্ঞানীর চোখে-মুখে তখন ছড়িয়ে ছিল চরম মানসিক যন্ত্রণা ও অপরাধবোধ। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসলীলা এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষের করুণ মৃত্যু তাঁর মনোজগৎকে চুরমার করে দিচ্ছিল। কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক বোমা বানাতে কতদিন সময় লাগতে পারে—তখন ওপেনহেইমার ক্ষীণ স্বরে বলেন, তিনি তা জানেন না। ট্রুম্যান তখন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘কখনোই না।’

প্রেসিডেন্টের এমন অবিবেচক মানসিকতা দেখে শিউরে উঠেছিলেন ওপেনহেইমার। নিচু গলায়, কাঁপা স্বরে তিনি প্রেসিডেন্টকে বলে ওঠেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।’

একজন বিজ্ঞানীর এই অভাবনীয় আত্মোপলব্ধিতে সমবেদনা জানানো তো দূরের কথা, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবনচরিতকারদের বিবরণ অনুযায়ী, ট্রুম্যান পকেট থেকে একটি সাদা রুমাল বের করে ওপেনহেইমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে উপহাস করে বলেছিলেন, ‘তাহলে আপনার হাত মোছার জন্য এটি ব্যবহার করতে পারেন।’

বৈঠক সেখানেই শেষ। তাদের জীবনে এটিই ছিল প্রথম ও শেষ সাক্ষাৎ। ওপেনহেইমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ ট্রুম্যান তাঁর আন্ডারসেক্রেটারি অব স্টেট ডিন অ্যাচিসনকে কড়া গলায় নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আর কখনো যেন ওই কাঁদুনে বিজ্ঞানীকে আমার অফিসে ঢুকতে দেওয়া না হয়। বোমা আমি ফেলেছি, এর দায় আমার। ওর হাতে কোনো রক্ত লেগে নেই।’

এই একটি মাত্র সাক্ষাৎকারই পারমাণবিক যুগের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিকে উন্মোচিত করেছিল—যেখানে বিজ্ঞানের দূরদর্শী অন্বেষণ পরিণত হয়েছিল সংহারক অস্ত্রে, আর রাজনীতির অন্ধ ক্ষমতা অর্জনের কাছে হার মেনেছিল মানবজাতির বিবেক।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসচিত্র সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর মিত্রপক্ষের কাছে জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধের অবসান হয়।

তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, জাপানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযান চালাতে গেলে লাখ লাখ মার্কিন ও জাপানি সেনার প্রাণহানি হতো। তাই, যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার ছাড়া উপায় ছিল না।

কিন্তু ইতিহাসবিদ ও আধুনিক গবেষণা এই যুক্তির অসারতা প্রমাণ করেছে। ১৯৪৫ সালের আগস্টের আগেই জাপানের নৌ ও বিমানবাহিনী প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। নৌ অবরোধ এবং তীব্র খাদ্যসংকটে জাপান এমনিতেই আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল।

মূলত উদীয়মান বিশ্বশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রভাব বিস্তারের দৌড়ে নিজেদের একক আধিপত্য ও সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতেই যুক্তরাষ্ট্র নিরীহ জাপানিদের ওপর এই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করেছিল বলে অনেকে মনে করেন।

মানব ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায় কেবল কোনো যুদ্ধের সমাপ্তি টানার চেষ্টা ছিল না, বরং তা ছিল রাজনৈতিক স্বার্থে ঘটিত এক নির্মম গণহত্যার জীবন্ত দলিল।

তথ্যসূত্র: অটোমিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

About Editor Todaynews24

Check Also

পরিচয়পত্র ছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

পরিচয়পত্র ছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

ক্যাম্পাসে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *