সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / ভোলায় বালু উত্তোলনে ডুবছে চর
ভোলায় বালু উত্তোলনে ডুবছে চর

ভোলায় বালু উত্তোলনে ডুবছে চর

মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলো একসময় ছিল ভাঙনকবলিত মানুষের নতুন আশ্রয়। এখন সেই চরই বিলীন হচ্ছে।

ঝুপ ঝুপ শব্দে মেঘনায় ভেঙে পড়ছে চর। আর কয়েক গজ দূরেই শতাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেডে চলছে বালু উত্তোলন। ভোলার সদর উপজেলার মেঘনাতীরের মানুষের অভিযোগ, একদিকে যত্রতত্র বালু তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে জেগে ওঠা চর, বসতভিটা ও ফসলি জমি।

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলার সীমান্তসংলগ্ন মেঘনা নদীতে শতাধিক খননযন্ত্র (ড্রেজার) ও বাল্কহেড দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যেখান থেকে বালু তোলা হচ্ছে সে জলসীমা ভোলার সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের কালুপুর ও দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর ও বৈরাগীর চর মৌজা। বৈরাগীর চর ও মধুপুর চরের গা ঘেঁষে খননযন্ত্র ফেলে বালু তোলা হচ্ছে। এক দিকে বালু তোলা হচ্ছে, আরেক দিকে মাটি ভেঙে পড়ছে নদীর মধ্যে ঝুপ ঝুপ শব্দে।

ভোলা সদরের কাচিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, ইউনিয়নের আটটি মৌজার মধ্যে সাতটি মৌজার ৩ হাজার ৭০৫ একর জমি ভাঙনে বিলীন হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বারাহিপুর ও রামদেবপুর মৌজার ৮৮০ একরসহ ১ হাজার একর জমি জেগে ওঠে। ওই জমিতে ভাঙনকবলিত ৫২০টি পরিবারকে ঘর ও জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বালু উত্তোলনের ফলে গত দুই বছরে মৌজা দুটি বিলীন প্রায়। বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০-২৫টি ঘর কোনোরকমে টিকে আছে। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে পাশের মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর ও বৈরাগীর চর মৌজা।

কাচিয়া মাঝের চরের বাসিন্দা তানজির আলম মাঝি বলেন, ‘বাড়িঘর ভাঙনের পরে সরকার মাঝের চরে আশ্রয় দিয়েছিল। ভালোই ছিলাম। ভাঙনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাকা ঘর মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন পাশের ইউনিয়নের মধুপুর এসেছি। আশ্রয় নিয়েছি অন্যের বাড়িতে।’

ভোলার স্বনামধন্য কৃষক আবুল হাসান। তিনি বৈরাগীর চরে শতাধিক একর জমিতে চাষাবাদ ও গবাদিপশু পালন করেন। তাঁর ভাষ্য, মেঘনা নদীর আগ্রাসী রূপ ভোলার মানুষের জন্য নতুন নয়। কিন্তু গত কয়েক বছরের মানবসৃষ্ট ভাঙন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বালুখেকো মানুষের নির্মম লোভের কারণে মেঘনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা রামদেবপুর, বারাহীপুর, মধুপুর ও বৈরাগীর চর বিলীন হচ্ছে। ৬০-৭০টি ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আবুল হাসান বলেন, বালু উত্তোলনের সরাসরি প্রভাবে চরাঞ্চল, ইলিশা লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটের ব্লকবাঁধ, রাজাপুর ও শিবপুরের জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।

মহিষ বাথানের মালিক আবুল কাশেম। তাঁর বাথানে ৬৫০টি মহিষ। তিনি বলেন, ভোলা সদর এলাকার চরগুলোর অবস্থা ভালো না। দিনরাত সমানতালে বালু কাটার কারণে চরের জায়গাজমি, মহিষের ঘাস, বাথান সব মেঘনা নদীতে ভেঙে সাফ হয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলা ড্রেজার চরের সঙ্গে ঠেকিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। আর দিনের বেলা চর থেকে একটু ফারাকে বালু তোলা হচ্ছে।

ভোলা জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, স্থানীয় লোকজনের দাবি উপেক্ষা করে ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র মেঘনা নদীর ধনিয়া, ইলিশা ও কাচিয়া ইউনিয়নের জলসীমানায় প্রশাসন বাংলা ১৪২৮ সন থেকে চারটি বালুমহাল ঘোষণা করে। ওই বছর (২০১৯ সালে) বালু উত্তোলনের জন্য প্রথম দরপত্র আহ্বান করে জেলা প্রশাসন। চলতি বছরে (বাংলা ১৪৩৩ সাল) চারটি মহাল ইজারার ডাক দিলেও ৩ (কাচিয়া) ও ৪ নম্বর (দক্ষিণ গাজীপুর) বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটির দাম বেশি থাকায় কেউ ইজারার নিলামে অংশ নেননি।

স্থানীয় লোকজন জানান, ইজারাকৃত যে দুটি মহাল থেকে বালু তোলার কথা, সে দুটি মহাল থেকে বালু তোলা হচ্ছে না। বালু তোলা হচ্ছে ইজারাদারের সুবিধামতো জলসীমা থেকে।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় চার নম্বর বালুমহালের ইজারাদার ভোলা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি জামিল হোসেনের সঙ্গে। দাবি করেন, বালু উত্তোলনের বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। লাইসেন্স তাঁর নামে হলেও ইজারাটি জেলা বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করছে। জামিল বলেন, ‘শুনেছি ইলিশার শেষ লক্ষ্মীপুর জেলা সীমানার দিকে অনুমোদিত সীমানার মধ্যে বালু তোলা হচ্ছে। ভোলার সীমানায় ও কাচিয়া মাঝের চরের ভাঙন ঠেকাতে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলব।’

বিষয়টি নিয়ে ভোলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পাউবোর কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যেখান থেকেই বালু তোলা হোক না কেন, যদি তা উপকূল বা চরের একেবারে কাছ থেকে তোলা হয়, তবে চরের ওপর তার সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়বেই। চরের পাশ থেকে বালু তুললে নদীর তলদেশ গভীর হয়ে পাড় ধসে পড়ে এবং ভাঙন মারাত্মক রূপ নেয়।

ভোলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, মেঘনা নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে ৭০-৮০টি ড্রেজার দিয়ে একাধারে বালু তোলা হচ্ছে। সরকার বছরে যতটুকু বালু তোলার অনুমতি দিয়েছে, ওই বালুর অল্প দিনে তুলে ফেলা হচ্ছে। বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধন, উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভের মতো আন্দোলন হচ্ছে। কিছুতে কিছু হচ্ছে না। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে মানুষ ঘর–বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। বালু উত্তলন বন্ধে জোরাল পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

About Editor Todaynews24

Check Also

জুলাইয়ে আহতদের জন্য দিয়েছিল চীন, সেই রোবটে সবার চিকিৎসা

জুলাইয়ে আহতদের জন্য দিয়েছিল চীন, সেই রোবটে সবার চিকিৎসা

৬২টি রোবটের ৫৭টি রোবোটিক পুনর্বাসন যন্ত্র ও ৫টি ফিজিক্যাল থেরাপি ট্রেনিং বেড রয়েছে। ৫৭টি রোবটের মধ্যে ২২টি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *