কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফখরুল আলমের জানাজাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি ভৈরব উপজেলা আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর জানাজাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে দেখা গেছে। জানাজার আগে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জানাজার এক দিন পর গতকাল মঙ্গলবার রাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অন্তত সাতজনের বাড়িতে অভিযান অথবা বাড়ির সামনে টহল দেয় পুলিশ। এ সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী নবী হোসেন আটক করা হয়।
ভৈরব থানার উপপরিদর্শক এমদাদুল কবির আজ বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, নবী হোসেনকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। ৫ আগস্টের আগে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় হওয়ায় মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। তিনি এখন থানায় আছেন।
গত সোমবার মারা যান তিনবারের সাবেক মেয়র ফখরুল আলম। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও এই আওয়ামী লীগ নেতা ভৈরবেই ছিলেন।
সোমবার সন্ধ্যায় ভৈরব কেবি পাইলট হাইস্কুল মাঠে ফখরুল আলমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও অংশ নেন। উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সভাপতি মো. শাহিন, সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমানসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শুরুর আগে মাইকে ফখরুল আলমের জীবন কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে স্মৃতিচারণাও করেন বিএনপি নেতারা। ভৈরব ও কুলিয়ারচর নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলমও শোক বার্তা পাঠান।
গতকাল দিবাগত রাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক আহমেদসহ আরও কয়েকজন নেতার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। রাত দেড়টার দিকে শহরের পঞ্চবটি এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী নবী হোসেনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
পরে বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল মনসুর, পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক মেয়র ইফতেখার হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক আহমেদসহ দলের আরও কয়েকজন নেতা।
জানাজা শেষে স্থানীয় লোকজনের আলোচনায় উঠে আসে দুটি বিষয়। দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রকাশ্যে একসঙ্গে উপস্থিত হওয়া এবং প্রকাশ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া। তখন থেকেই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, জানাজার মতো ধর্মীয় আয়োজনকে মাধ্যম করে আওয়ামী লীগ ভৈরবে নিজেদের দলীয় উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন গা ঢাকা দেওয়া ও জামিনে আসা নেতা-কর্মীরা পুনঃসংগঠিত হওয়ার ইঙ্গিত দিলেন, অন্যদিকে মাঠে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখার বার্তাও দিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইস্যুটি নিয়ে নিজ দলেই বেশ চাপে পড়েন বিএনপির মূল নেতারা। তখন থেকেই পুলিশি পদক্ষেপের আলোচনা শুরু হয়।
আওয়ামী লীগের কয়েক জন নেতা জানান, পুলিশি অভিযানের আশঙ্কা আওয়ামী লীগের নেতারাও করেছিলেন। তাই দীর্ঘদিন পর এলাকায় ফেরা নেতারা বাড়তি সতর্কতার মধ্যে ছিলেন।
গতকাল দিবাগত রাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক আহমেদসহ আরও কয়েকজন নেতার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। রাত দেড়টার দিকে শহরের পঞ্চবটি এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী নবী হোসেনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
ভৈরব থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) লিমন বোস স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী নবী হোসেনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানাজায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন স্থানীয় দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। ফখরুল আলম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাই তাঁকে ঘিরে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক নয়।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ এখন দেশে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল। জয় বাংলা তাদের রাজনৈতিক স্লোগান। তাই প্রকাশ্যে এ ধরনের স্লোগান দেওয়ার সুযোগ নেই। জানাজার মতো ধর্মীয় ও স্পর্শকাতর পরিবেশকে ব্যবহার করে তারা নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একজন নেতার মৃত্যুকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।