ভাওয়াল রাজবাড়ীর রহস্যময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন স্থাপত্যকে পোশাকের নকশায় জীবন্ত করে তুলেছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী নিশাত জেরিন হৃদিকা। রইল বিস্তারিত…
একসময় ভাওয়াল রাজবাড়ীর অলিন্দ মুখর থাকত রাজকীয় পদচারণে। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শুধু ভাঙাচোরা খিলান, শেওলা ধরা ইট আর সময়ের বুকে জমে থাকা অসংখ্য গল্প। সেই হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ঐতিহ্য, জয়দেবপুরের রাজ শ্মশানেশ্বরী ও ভাওয়াল রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের রহস্যময় জীবনকাহিনিকে ফ্যাশনের ভাষায় নতুনভাবে তুলে ধরেছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী নিশাত জেরিন হৃদিকা। তাঁর কনসেপ্টভিত্তিক কালেকশনের নাম ‘পাস্ট পারফেক্ট’।

ভাওয়াল রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের জীবন উপমহাদেশের অন্যতম আলোচিত ইতিহাস। মৃত্যুর ঘোষণা, রহস্যময় অন্তর্ধান, সন্ন্যাসী হিসেবে ফিরে আসা ও নিজের পরিচয় ফিরে পেতে বছরের পর বছর আদালতে লড়াই—এই ঘটনাপ্রবাহ কালেকশনটির মূল অনুপ্রেরণা।

সাদা ও অফ–হোয়াইটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে পুরো কালেকশন। এর সঙ্গে বাদামি, পোড়ামাটি ও সেপিয়া টোনের মেলবন্ধন পোশাকগুলোয় ফুটিয়ে তুলেছে ভাওয়াল রাজবাড়ীর স্থাপত্য ও রহস্যময় আবহ। ভারী অলংকরণের পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন কাট, মিনিমাল সিলুয়েট, হাতে আঁকা নকশা ও সূক্ষ্ম সুচিকর্মের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহ্যকে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন ডিজাইনার।
কালেকশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো স্থাপত্যকে নকশার অংশ করে তোলা। কখনো লম্বা ট্রেইলের গাউনের নিচের অংশজুড়ে ফুটে উঠেছে জয়দেবপুরের রাজ শ্মশানেশ্বরী মন্দিরের অবয়ব।


একই স্থাপত্যচিত্র উঠে এসেছে পুরুষদের স্লিভলেস ভেস্টের পেছনেও। পোশাকের ক্যানভাসে স্থাপত্যের এই উপস্থাপন কালেকশনটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
শুধু স্থাপত্যই নয়, ভাওয়াল রাজবাড়ীর খিলান, অলংকরণ ও নান্দনিক মোটিফও বিভিন্ন পোশাকে নতুনভাবে ধরা দিয়েছে। কোথাও অলংকারধর্মী জ্যামিতিক নকশা, সূক্ষ্ম ফুলেল সুচিকর্ম, আবার কোথাও বিমূর্ত রেখায় ফুটে উঠেছে প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ।

একটি ক্রপ টপ ও লেয়ারড স্কার্টে বাদামি মোটিফের সঙ্গে নিচের অংশে খিলানের রেখাচিত্র পোশাকটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। অন্যদিকে স্লিম–ফিট সাদা ড্রেসের বুকজুড়ে সুচিকর্মে ধরা দিয়েছে রাজকীয় সৌন্দর্যের মিনিমাল প্রকাশ।
কালেকশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পোশাক মারমেইড সিলুয়েটের একটি গাউন। এই গাউনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কাঁধজুড়ে বিস্তৃত স্টেটমেন্ট কলার।

সূর্যের কিরণ কিংবা প্রাচীন রাজমুকুটের অলংকরণ থেকে অনুপ্রাণিত এই কলারে বাদামি ও সোনালি রঙের জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। সাদামাটা সিলুয়েটের এই গাউনের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে কলারটিই, যা পোশাকটিকে দিয়েছে ভাস্কর্যধর্মী আবেদন।
নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্যই আলাদা নকশার পোশাক তৈরি করা হয়েছে এ কালেকশনে। পুরুষদের পোশাকে দেখা যায় ঢিলেঢালা স্ট্রেইট–কাট ট্রাউজারের সঙ্গে স্লিভলেস ওপেন–ফ্রন্ট ভেস্ট, লং টিউনিক ও পরিচ্ছন্ন কাটের সিলুয়েট।

অন্য লুকে লম্বা টিউনিকের সামনের অংশে ব্যবহার করা হয়েছে বাদামি মোটিফ, সঙ্গে রাখা হয়েছে স্ট্রেইট–কাট প্যান্ট। অতিরিক্ত অলংকরণের বদলে সংযত নকশা ও স্বাভাবিক ফিট পুরুষদের পোশাকেও এনে দিয়েছে ট্রেন্ডি আবেদন।


অন্যদিকে নারীদের পোশাকে রয়েছে বডিকন ড্রেস, মারমেইড সিলুয়েট, ক্রপ টপ, লেয়ারড স্কার্ট ও মেঝে ছুঁয়ে যাওয়া দীর্ঘ ট্রেইলের ব্যবহার।
নারী ও পুরুষ—উভয়ের পোশাকেই একই রঙের প্যালেট, মোটিফ ও একই কনসেপ্টের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। তবে সবচেয়ে প্রশংসার দাবি রাখে পোশাকগুলোর কাট ও সিলুয়েট। কনসেপ্টভিত্তিক কালেকশন হলেও এগুলো কেবল রানওয়ের জন্য নয়, বাস্তবেও অনায়াসে পরা সম্ভব।


ভাওয়াল রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষেই হয়েছে কালেকশনটির ফটোশুট, যা পুরো ভাবনাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। পুরোনো ইটের দেয়াল, শেওলা ধরা স্থাপনা আর আলোছায়ার মায়াবী খেলায় পোশাকগুলো যেন ইতিহাসেরই এক জীবন্ত অংশ হয়ে উঠেছে। লোকেশন ও পোশাকের এই নিখুঁত মেলবন্ধন প্রতিটি ফ্রেমে তৈরি করেছে রহস্যময় এক আবহ। মনে হচ্ছে যেন ভাওয়াল রাজার সেই বহুল আলোচিত কাহিনি নতুন করে প্রাণ পেয়েছে, তবে এবার সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায়।

‘পাস্ট পারফেক্ট’ শুধু একটি ফ্যাশন কালেকশন নয়; এটি ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও এক রহস্যময় অতীতকে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় নতুন করে দেখার একটি সৃজনশীল প্রয়াস।


অতীতের সেই রাজকীয় উত্তরাধিকারকে পোশাকের নকশায় রূপ দিয়ে নিশাত জেরিন হৃদিকা দেখিয়েছেন, ফ্যাশন কেবল পরিধানের মাধ্যমই নয়; এটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও এক শক্তিশালী ভাষা।
ছবি: নিশাত জেরিন হৃদিকা