বিএনপির বহিষ্কৃত এক নেতাকে ৮টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছে ডিএনসিসি। প্রতি বর্গফুটের দৈনিক ভাড়া মাত্র দেড় টাকা।
রাজধানীর বনানীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ফুডকোর্টে নির্মিত আটটি দোকানকে ‘খালি জায়গা’ (স্পেস) দেখিয়ে ছয় মাসের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রতি বর্গফুটের দৈনিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র দেড় টাকা। অর্থাৎ ৩০০ বর্গফুটের একটি দোকানের মাসিক ভাড়া সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। দোকানগুলো ভাড়া পেয়েছেন বনানী থানা বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তবে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, বিধি অনুযায়ী নির্মিত দোকান ‘খালি জায়গা’ দেখিয়ে ভাড়া দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ সুবিধা দিতেই এমন অবৈধ উপায়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, ফুডকোর্ট পরিচালনা বা ইজারা দেওয়ার জন্য করপোরেশনের কোনো নির্দেশিকা (গাইডলাইন) নেই। সে কারণে আপাতত জায়গাটিকে ‘স্পেস’ হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এরপরই বন্ধনীর ভেতরে লেখা, ‘নির্মিত ৮টি ফুডকোর্ট’। চিঠির ভাষা ও সম্পত্তির শ্রেণি পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফুডকোর্টটি বনানী কাঁচাবাজারের পাশে অবস্থিত। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ওই জায়গায় একসময় বাজারে আসা লোকজন গাড়ি পার্ক করতেন। সাবেক মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে সেখানে ফুডকোর্ট নির্মাণ করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যুর পর ফুডকোর্টটি আর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন কিংবা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
ফুডকোর্টটি নির্মাণের পর ধীরে ধীরে এটি দখলের কবলে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বনানী থানা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন সিকদার অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় শুরু করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বনানী ইউনিট বিএনপি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতাদের হাতে। তখন থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন তাঁরা।
দোকানকে ‘জায়গা’ হিসেবে দেখানো
বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ আছে, ‘বনানী ডিএনসিসি কাঁচাবাজারের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ৩৯৮ বর্গফুট জায়গা’। এরপরই বন্ধনীর ভেতরে লেখা, ‘নির্মিত ৮টি ফুডকোর্ট’। চিঠির ভাষা ও সম্পত্তির শ্রেণি পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দৃশ্যমান নির্মিত দোকানগুলোকে শুধু ‘জায়গা’ হিসেবে উল্লেখ করে সম্পত্তির প্রকৃতি পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ না করেই একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, যদি এটি কেবল খালি জায়গা হয়, তাহলে চিঠিতে ‘নির্মিত ৮টি ফুডকোর্ট’ উল্লেখ করা হলো কেন? আর যদি সেখানে নির্মিত দোকান থেকেই থাকে, তাহলে সেটি সম্পত্তি বিভাগের নয়, রাজস্ব বিভাগের বাজার শাখার মাধ্যমে দোকান হিসেবে বরাদ্দ বা ভাড়া দেওয়ার কথা।
ডিএনসিসির সাবেক একজন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ফুডকোর্টের আটটি দোকানকে মার্কেট উপ-আইনের আওতায় খাবার বিক্রির দোকান হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে ভাড়া দেওয়া যেত। সে ক্ষেত্রে উন্মুক্তভাবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হতো। আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দিতে হতো। এতে রাজস্বও বেশি আসত। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির দোকান পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকত না। তাই দোকানকে ‘জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে ভিন্ন পথে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মামুনকে দেওয়া আটটি দোকানের একেকটির ছয় মাসের ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা (মাসে ৯ হাজার ৮৩৫ টাকা)। এ ছাড়া জামানত হিসেবে দোকানপ্রতি ১ লাখ টাকা নিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে এই জামানতের অর্থ ফেরতযোগ্য।
ভাড়া মাত্র দেড় টাকা
গত ১০ জুন বনানী ফুডকোর্টের জায়গাটি ভাড়ায় বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন এমএমজেড এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি ডিএনসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। দলীয় শৃঙ্খলা, নীতি ও আদর্শবিরোধী অনৈতিক কর্মকাণ্ডে (চাঁদাবাজি) জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সিটি করপোরেশনের নথি অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার ১২ দিনের মধ্যে তড়িঘড়ি সব প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহ পর আরেকটি চিঠির মাধ্যমে ওই জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। মামুনকে দেওয়া আটটি দোকানের একেকটির ছয় মাসের ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা (মাসে ৯ হাজার ৮৩৫ টাকা)। এ ছাড়া জামানত হিসেবে দোকানপ্রতি ১ লাখ টাকা নিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে এই জামানতের অর্থ ফেরতযোগ্য।
মামুনের দাবি, বাকি সাতটি দোকানের কে কোনটা নিয়েছে, তা বনানী থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ এবং বনানী থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি কবির হোসেন জানেন।
৬ গুণ বেশি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা
ফুডকোর্টের এসব দোকান আগে থেকে অবৈধ দখলে রয়েছে। এখন আব্দুল্লাহ মামুন বরাদ্দ পাওয়ার পর নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে। দুই দোকানের মালিক জানান, এখন এককালীন ৫ লাখ টাকা জামানত এবং মাসে ৬০ হাজার টাকা ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বনানী থানা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রতিষ্ঠানের নামে দোকান বরাদ্দ নেওয়া হলেও ফুডকোর্টের আটটি দোকান মূলত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতারা ভাগ করে নিয়েছেন। বিষয়টি স্বীকার করে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ফুডকোর্টের অনুমোদন পেতে তাঁর প্রতিষ্ঠান এমএমজেড এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি ওই ফুডকোর্টে মাত্র একটি দোকান (৭ নম্বর দোকান) পেয়েছেন।
মামুনের দাবি, বাকি সাতটি দোকানের কে কোনটা নিয়েছে, তা বনানী থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ এবং বনানী থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি কবির হোসেন জানেন।
খালি জায়গা হিসেবে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ফুডকোর্ট বরাদ্দের নীতিমালা না থাকায় এটিকে দোকান হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি কাজ করছে, নীতিমালা হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবু সাঈদ ও কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁরা ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা দিলেও সাড়া দেননি।
এভাবে দোকান বরাদ্দ দেওয়া প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথ ‘ফিটফাট’ রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওই রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। নির্দেশনা আছে, ওই জায়গা যাতে ফিটফাট থাকে।
খালি জায়গা হিসেবে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ফুডকোর্ট বরাদ্দের নীতিমালা না থাকায় এটিকে দোকান হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি কাজ করছে, নীতিমালা হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।