মদিনার ভোরের আলো যেন অন্য রকম। ফজরের আজান শেষে মসজিদে নববির সবুজ গম্বুজে সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই চারপাশে এক অপার্থিব প্রশান্তি নেমে আসে। সেই পবিত্র শহরেই কয়েকটি দিন কাটানোর পর এক সকালে আমি আর বন্ধু সাইমন রওনা দিলাম ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় যুদ্ধক্ষেত্র—বদরের উদ্দেশে।
টয়োটা গাড়িটি মদিনা শহর ছাড়িয়ে যখন মহাসড়কে উঠল, তখন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল মিলিয়ে গেল। সামনে শুধু দীর্ঘ পথ। দুই পাশে অনন্ত মরুভূমি, কালচে আগ্নেয় পাহাড়, শুকিয়ে যাওয়া উপত্যকা আর দিগন্তজোড়া আকাশ। সৌদি আরবের আধুনিক মহাসড়কগুলো বিস্ময় জাগায়। কোথাও যানজট নেই, নেই অযথা হর্নের শব্দ। ঘণ্টায় শত কিলোমিটার গতিতে গাড়ি ছুটলেও পথের নিস্তব্ধতা ভাঙে না।
গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, এই পথ দিয়েই তো চৌদ্দ শ বছরেরও বেশি আগে এগিয়ে গিয়েছিলেন আল্লাহর রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবিরা। পার্থক্য শুধু একটাই—আমরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বসে যাচ্ছি, আর তাঁরা উত্তপ্ত মরুভূমি পেরিয়েছিলেন উটের পিঠে, কখনো হেঁটে, কখনো পালাক্রমে সওয়ার হয়ে।
বদর মদিনা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু ইতিহাসের হিসেবে এই পথের দূরত্ব চৌদ্দ শ বছরেরও বেশি। যতই সামনে এগোচ্ছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল সময় যেন উল্টো দিকে হাঁটছে।
ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। হিজরির দ্বিতীয় বছর, রমজান মাসের ১৭ তারিখ। মুসলিম বাহিনীর সদস্য মাত্র ৩১৩ জন। তাঁদের অধিকাংশের কাছেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধসামগ্রী ছিল না। অল্প কয়েকটি ঘোড়া, প্রায় সত্তরটি উট—যেগুলোও সবাই পালাক্রমে ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে মক্কার কুরাইশ বাহিনী ছিল প্রায় এক হাজার যোদ্ধার বিশাল বাহিনী, পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ও অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে।
মানবিক হিসাব বলছিল, এই যুদ্ধের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা ছিল ভিন্ন।
পবিত্র কোরআনে বদরের যুদ্ধকে বলা হয়েছে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’—সত্য ও মিথ্যার ফয়সালার দিন (সূরা আল-আনফাল, ৮:৪১)। এই একটি শব্দই বদরের মাহাত্ম্য বুঝিয়ে দেয়। এটি কেবল দুটি বাহিনীর সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল ঈমান ও কুফরের, ন্যায় ও অন্যায়ের মুখোমুখি অবস্থান।
গাড়ি সামনে এগিয়ে চলেছে। দূরে দূরে খেজুরবাগান চোখে পড়ছে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট জনপদ। কিন্তু অধিকাংশ পথজুড়েই শুধু মরুভূমি আর পাহাড়। প্রকৃতির এই নির্জনতা মানুষকে নিজের ভেতরে ডুব দিতে শেখায়। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে, শুধু ইতিহাস কথা বলছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
বদরে পৌঁছেই প্রথম যে অনুভূতিটি হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজকের বদর শান্ত, পরিচ্ছন্ন, ছোট্ট একটি শহর। কিন্তু এই নীরবতার বুকেই একদিন রচিত হয়েছিল মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনে সেই প্রান্তর, যেখানে একদিন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। এই মাটিতেই তিনি আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে দোয়া করেছিলেন। সেই দোয়ার প্রতিধ্বনি যেন আজও এই মরুর বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
বদরের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করতেই যেন ইতিহাসের পর্দা ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল। চারদিকে নীরবতা, অথচ এই নীরবতার বুকেই একদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তাকবিরের ধ্বনি, তরবারির ঝনঝনানি আর ঈমানের অবিনাশী শক্তির ঘোষণা।
ইসলামের প্রখ্যাত সিরাতবিদ আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরী তাঁর আর-রাহীকুল মাখতূম গ্রন্থে বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন। মুসলমানরা মূলত আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলাকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলে যায়। মক্কা থেকে কুরাইশদের বিশাল বাহিনী যুদ্ধের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ শুরুর আগে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। মুহাজিরদের পাশাপাশি আনসার সাহাবিরাও একবাক্যে জানিয়ে দেন, আল্লাহর রাসুল যেখানে যাবেন, তাঁরাও সেখানেই থাকবেন। হজরত সাদ ইবনে মুআজ (রা.)-এর দৃঢ় প্রত্যয়ের বক্তব্য ইসলামের ইতিহাসে আজও সাহসের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বলেছিলেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন, তবুও আমরা আপনার সঙ্গ ছাড়ব না। এই আনুগত্য শুধু একজন নেতার প্রতি নয়; এটি ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ।
এরপর মুসলিম বাহিনী বদরের কূপগুলোর নিকট অবস্থান নেয়। সাহাবি হুবাব ইবনে মুনযির (রা.) কৌশলগতভাবে পরামর্শ দেন, এমন স্থানে অবস্থান নেওয়া হোক যাতে পানির উৎস মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মতামত গ্রহণ করেন। একজন নবী হয়েও যোগ্য পরামর্শকে গ্রহণ করার এই শিক্ষা আজও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যুদ্ধের আগের রাতটি ছিল অবিস্মরণীয়। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহ–তাআলা মুসলমানদের ওপর প্রশান্তির ঘুম নাজিল করেন এবং বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে বালুময় ভূমি শক্ত হয়ে যায় এবং তাঁদের অন্তর দৃঢ় হয় (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ১১)। মরুভূমির সেই বৃষ্টি ছিল শুধু প্রকৃতির ঘটনা নয়; ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ।
আজ সেই প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হচ্ছিল, ইতিহাস কখনো কেবল বইয়ের পাতায় বন্দী থাকে না। কিছু কিছু স্থান নিজেই ইতিহাস হয়ে যায়। বদর তেমনই একটি ভূমি। এখানকার বাতাসে, পাহাড়ে, বালুকণায় যেন এখনো সেই দিনের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের সংরক্ষিত অংশে দাঁড়িয়ে আমরা দীর্ঘ সময় নীরবে চারপাশ দেখছিলাম। দূরে পাহাড়, মাঝখানে সমতল ভূমি, আর ইতিহাসের ভারে নত এক নীরব পরিবেশ। মনে হচ্ছিল, সময় যেন এখানে থেমে আছে; শুধু মানুষ বদলেছে, বদলায়নি এই ভূমির মহিমা।
বদরের যুদ্ধক্ষেত্র ঘুরে আমরা এগিয়ে গেলাম শহিদ সাহাবিদের স্মৃতিবিজড়িত সংরক্ষিত এলাকায়। চারদিকে সুনিপুণ পরিচর্যা। নির্দিষ্ট সীমানা দিয়ে ঐতিহাসিক স্থানটি সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে আগত দর্শনার্থীরা ইতিহাসের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রেখে স্থানটি দেখতে পারেন। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই নীরব প্রান্তর একদিন ছিল তাকবিরের ধ্বনি, ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ আর আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় সাক্ষী।

স্মৃতিফলকে বদরের শহিদদের নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রতিটি নামের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের পাতায় যাঁদের পড়েছি, তাঁরা যেন এইমাত্র এখান দিয়ে হেঁটে গেছেন। তাঁদের ত্যাগের কারণেই ইসলামের আলো মরুপ্রান্তর ছাড়িয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছেছে।
এরপর আমরা বদর শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে গেলাম। ছোট, পরিচ্ছন্ন, শান্ত পরিবেশ। সেখানে নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলাম। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের দেখে মনে হলো, বদরের শিক্ষা কোনো একটি জাতির জন্য নয়; এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য সাহস, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা।
বর্তমান বদর শহর সৌদি আরবের আল মদিনা অঞ্চলের একটি শান্ত জনপদ। মরুভূমির আবহ, খেজুরবাগান, ছোট ছোট বাজার আর সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শহরটিকে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ইতিহাসের কারণে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ এখানে আসেন, কিন্তু শহরটি তার সরলতা হারায়নি।
ফেরার পথে আমরা একটি ঐতিহাসিক কূপে থামলাম, যেটিকে স্থানীয় লোকজন অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখেন। অনেকে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং বরকতের নিয়তে বাড়িতে নিয়ে যান। আমরা সেই পানি পান করলাম।
মদিনার পথে ফেরার সময় সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। মরুর পাহাড়গুলো সোনালি আলোয় যেন নতুন রূপ ধারণ করেছে। আমি আর বন্ধু সাইমন খুব বেশি কথা বলছিলাম না। আমাদের দুজনের মনেই হয়তো একই অনুভূতি—আজ আমরা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান দেখে ফিরছি না; ফিরে যাচ্ছি এমন এক ভূমি থেকে, যেখানে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবিরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।
মনে পড়ছিল সুরা আল-আনফালের সেই ঘোষণা—বদর ছিল ইয়াওমুল ফুরকান, সত্য ও মিথ্যার ফয়সালার দিন। ইতিহাসের অসংখ্য যুদ্ধ সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। কিন্তু বদর আজও বেঁচে আছে; কারণ, এটি কেবল একটি সামরিক বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ঈমান, ধৈর্য, শূরা, নেতৃত্ব এবং আল্লাহর সাহায্যের ইতিহাস।
মদিনায় ফিরে যখন আবার মসজিদে নববির সবুজ গম্বুজ চোখে পড়ল, তখন হৃদয় ভরে গেল কৃতজ্ঞতায়। আল্লাহ–তাআলা এমন এক ভূমিতে যাওয়ার তাওফিক দিয়েছেন, যার প্রতিটি বালুকণা মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
অনেক ভ্রমণ মানুষকে নতুন দৃশ্য উপহার দেয়, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু বদরের সফর আমাকে শিখিয়েছে অন্য এক শিক্ষা—সত্যের পথে চলার জন্য সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া জরুরি নয়। প্রয়োজন অটল বিশ্বাস, বিশুদ্ধ নিয়ত এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা।
মদিনা থেকে বদরের পথ হয়তো কয়েক ঘণ্টার। কিন্তু সেই পথ পাড়ি দিয়ে মনে হয়েছে, আমি যেন চৌদ্দ শ বছরের ইতিহাস অতিক্রম করে ফিরে এলাম। বদরের মরুপ্রান্তর আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়গুলো নিশ্চুপ, বাতাস শান্ত। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শুনলে মনে হয়, সেই নীরবতার ভেতর আজও প্রতিধ্বনিত হয় এক চিরন্তন আহ্বান—সত্যের জন্য অবিচল থাকো, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো; কারণ, হক কখনো পরাজিত হয় না।