‘আমরা সকলেই তো এক, অভিন্ন। আমাদের কারোর ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আমরা নাগরিক হিসেবে সকলে সমান। কারোর প্রতি বৈষম্য হোক, আমরা তা চাই না। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই।’ ১৬ জুলাই সকালে সভাকক্ষে ঢুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কথাগুলো বললেন।
আমি এই ঢাকা শহরে আছি ১৯৮৬ সাল থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে। অ্যাকাউন্টিংয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল ছিল তখন। ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী’ বলে দলীয় সংগীত গাইতাম। তারপর প্রায় ৪০ বছর কেটে গেল। কত কিছু করেছি! কত চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণের জন্য, সুন্দরের জন্য। কত কলাম লিখেছি। তারপর নানা সংগঠনে জড়িয়েছি।
লোকনাট্য দলও করেছি। কখনো কোনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এভাবে দেখা হয়নি। কথা হয়নি। ১৬ জুলাই সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের একমাত্র এমপি আন্না মিনজ দিদির অনুরোধে আমি রাজি হয়েছি প্রধানমন্ত্রীর সামনে মূল কথা উপস্থাপনের জন্য। ঠিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী এলেন। ওনার বাঁ পাশে বসলেন আন্নাদি, তারপর আমি। ডান পাশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারপর বিজন কান্তি সরকার, নৃগোষ্ঠী বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
দেশের ১৮ জেলার নানা প্রান্তের ১৬ জাতিগোষ্ঠীর ৫৯ জন প্রতিনিধির বক্তব্যে বোঝা গেল যে তাঁদের জীবনে এমন ঘটনা এবারই প্রথম। একজন বললেন, তাঁরা কোনো দিন ভাবতেও পারেননি, প্রধানমন্ত্রী তাঁর অফিসে সমতলের আদিবাসী মানুষের কথা এভাবে শুনবেন। সবার পক্ষে আন্না মিনজ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
আমি পাশে বসে অনেক কিছু ভাবছিলাম। স্থানের অভাবে হয়তো এখানে বলা হবে না। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশেরই সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া, উপেক্ষিত, অসহায়-অনুচ্চারিত কণ্ঠ যাদের, তাদের কথাই তো শুনবেন। সেটি এত দিনেও কেন হলো না? এত দীর্ঘ সময় লাগল কেন? এক দিনের এই দেখা হওয়াতেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। তবে এখানে আসা মানুষগুলো প্রফুল্লমনে বাড়ি ফিরে গেছেন।
শেষে আমরা বলেছিলাম, আশা করি, এবার একটি স্থান হবে, জায়গা হবে সরকারে, রাষ্ট্রে আদিবাসী মানুষের জন্য। আপনি বলবেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান অ্যান্ড ইউ হ্যাভ আ হোম। আমরা আমাদের ঘর খুঁজে পাব, আশা-ভরসার ঠিকানা হবে আমাদের।
ষাটোর্ধ্ব কয়েকজন সচিবালয়ের গেটে এসে বেঞ্চিতে জিরিয়ে নিয়েছেন সকালে। কয়েকজনের কাঁধে মাঝারি সাইজের ব্যাগ ছিল। ঢাকায় থাকা কেউ বলেছেন, এত বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছেন কেন? গ্রামের মানুষটি বলেছেন, এই মিটিং শেষে এখান থেকেই ফিরে যাবেন। ব্যাগ কোথায় রাখব? সত্যিই এসএসএফ সভাকক্ষে ব্যাগ অ্যালাউ করেনি।
সবকিছুর শেষে প্রধানমন্ত্রীর খোলামেলা, দীর্ঘ ইতিবাচক কোমল কথা, গভীর আন্তরিকতা, সাধারণের মতো বারান্দায় গিয়ে ছবি তোলা, অনেকের সঙ্গে সেলফি তোলা, একসঙ্গে সবাইকে ফটোফ্রেমে না ধরায় দ্বিতীয় দফা ছবি তুলতে নিজেই বলা—সবই আমাদের এই মানুষদের মনে গেঁথে থাকবে চিরদিন।
আমি পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলাম। এ জন্য ছবিতে আপনারা আমাকে হয়তো দেখতেই পাবেন না। আমি নিশ্চিত, এই সাধারণ আদিবাসীরা বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পরিবার, সন্তান, স্বজনদের এই দিনের গল্প বলবেন। কুলাউড়ার মুরইছড়ার খাসিয়া নারী ফ্লোরা তালাং ফেরার পথে আমাকে বলছিলেন, প্রধানমন্ত্র্রী আমাকে ‘বোন’ সম্বোধন করে গ্রামের স্কুলের বিষয়টি দেখবেন বলেছেন।
আজ এই লেখা দীর্ঘ করব না। আমরা কী চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে, তা সংক্ষেপে বলছি। আমরা লিখিতভাবে সাতটি দাবি দিয়েছি। তার আগে বলেছি, আমাদের জন্মভূমি দেশ অনেক সুন্দর। সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈচিত্র্যে অনন্য সমৃদ্ধ। এই বৈচিত্র্যই আমাদের মহিমা, সৌন্দর্য ও শক্তি। আপনি যে ‘রেইনবো নেশনের’ কথা বলেছেন, তার বাস্তব অংশীদার দেশের নানা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এই সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, মাহাতো, গারো, হাজং, খাসিয়া, মণিপুরি, কোচ বর্মণ, চা–বাগানসহ নানা জাতির মানুষেরা, পাহাড়ের মানুষেরা।
বিশ্বব্যাপী এই মানুষেরা বন, প্রকৃতি-পরিবেশ, নদী, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য, যা আমাদের কমন হোম, আজকের প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে চলেছেন। আরও বলেছি, এত কিছুর পরও এই আদি মানুষেরা বিশ্বের সমৃদ্ধ, প্রাচীন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হলেও ঐতিহাসিক অবিচার ও কালের বিবর্তনে আজ সবচেয়ে অসহায়, দরিদ্র, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
প্রধানমন্ত্রীকে আমরা মনে করিয়ে দিয়েছি, আপনার সরকার একটি ‘ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতিমূলক’ জাতি গড়ার অঙ্গীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে (নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ৮)। ইশতেহারে বলেছেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্ম, অঞ্চল, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয়, নারী-পুরুষনির্বিশেষে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর নাগরিককে একসূত্রে গেঁথে একটি বৈচিত্র্যময় পারস্পরিক বোঝাপড়ার সেতুবন্ধ রচনা করবেন।
আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ জাতি গঠনে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখতে চেয়েছি। আর সমতলের আদিবাসীদের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন চেয়েছি।
সবার কথা প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। নোট নিয়েছেন ছোট চারটি কাগজে। আমাদের বক্তব্য চলাকালেই তাঁর কার্যালয়ের কর্মকর্তাকে কিছু বিষয়ে নোট নিতে বলেছেন। সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়, ভূমি, জীববৈচিত্র্য ও বনকেন্দ্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য ভূমি কমিশন, তরুণ ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানে সহায়তা, উচ্চশিক্ষার্থে বৃত্তি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের জন্য সমতলসহ চা–বাগানের মানুষের অন্তর্ভুক্তিকরণ, ভাষা–সংস্কৃতি বিকাশে একাডেমি স্থাপন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দের পরিবর্তে ‘বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী/আদিবাসী’ শব্দ প্রতিস্থাপন ইত্যাদি।
আমাদের এত এত সমস্যা! তবে তিনি ছিলেন অতিশয় শান্ত, ধীর ও ইতিবাচক। ধাপে ধাপে এসব দেখার কথা বললেন। মজা করে বললেন, আমরা স্কুলে পরীক্ষা দিয়েছি না? পরীক্ষায় সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটির উত্তর আমরা সবার আগে লিখতাম। কারণ, কঠিনটা দিয়ে শুরু করলে পরে আর সময় পাওয়া যেত না। ভূমি সমস্যার জটিলতার কথা বললেন। ইকোপার্ক কী দরকার বলে প্রাকৃতিক বনের যত্নের কথা বললেন। তিনি বিজনদাকে দেখিয়ে আমাদের বিষয়গুলো আন্তকিতার সঙ্গে দেখার কথা বললেন।
শেষে আমরা বলেছিলাম, আশা করি, এবার একটি স্থান হবে, জায়গা হবে সরকারে, রাষ্ট্রে আদিবাসী মানুষের জন্য। আপনি বলবেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান অ্যান্ড ইউ হ্যাভ আ হোম। আমরা আমাদের ঘর খুঁজে পাব, আশা-ভরসার ঠিকানা হবে আমাদের। আমরা পুরোনো দুঃখ-বঞ্চনার দিন পেরিয়ে, ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’—এ স্বপ্ন নিয়ে, মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে অংশীদার হয়ে একসঙ্গে পথ চলতে চাই। আপনি আন্তরিকতা, সহানুভূতি ও মানবিকতায় দেশকে অনন্য উচ্চতায় এগিয়ে নিন।
-
সঞ্জীব দ্রং লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব