শিল্পের সূচনাকে মানুষ দেখেছে যোগাযোগ সৃষ্টির অনন্য এক মাধ্যম হিসেবে, যেমন গুহাচিত্র। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মেসোপোটেমিয়া সভ্যতায় গল্প বলার জন্য দৃশ্যচিত্র-সংবলিত কিউনিফর্ম লিপি ব্যবহার করা হতো, যা প্রাচীনতম রূপ-চিত্রলিপি, এটি শিল্পের শুরুর দিককার গ্রাফিকসংশ্লিষ্ট কাজ! সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের নানা প্রকার দাঁড়িয়ে গেছে।
চারুশিল্পের ব্যবহারিক দিককে আমরা কাজে লাগাই পণ্যকে মোড়কজাত করা থেকে শুরু করে এর বিপণনে, প্রচার ও প্রসারের সব আয়োজনে। একে প্রয়োজনীয় মনে করলেও আমরা শিল্পের কাতারে ফেলি না ব্যবহার্য কাজ বলে। বিজ্ঞাপনজগতে সাধারণত তাঁদের সৃজনশীলতা উপেক্ষিত হয় সেবাগ্রহীতার কাছে!
গ্রাফিক ডিজাইনারদের সৃজনশীল সত্তাকে সামনে আনার একটি কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করে নতুন কিছুর আস্বাদ পাওয়া গেল শিল্পী মাহবুবুর রহমানের পরিচালনা ও কিউরেটিংয়ে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের আয়োজনে ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ বা ‘নির্দেশনার বাইরে’ নামে ১০ জন শিল্পীর একটি যৌথ প্রদর্শনীতে।

আয়োজনস্থল বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়। অংশগ্রহণকারী ১০ জন হলেন মাহবুবুর রহমান, ইমরান হোসেন পিপলু, মনির মৃত্তিক, আলী সাগর, শেখর শাশ্বত, পীযূষ তালুকদার পিন্টু, সনৎ কুমার বিশ্বাস, মিতা মেহেদী, মেহেদী হাসান ও শিমুল দত্ত।
গ্রাফিক ডিজাইনে পাঠ নেওয়া এবং গ্রাফিক কাজে নিয়োজিত শিল্পীদের ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন কনসেপ্ট নিয়ে গড়া কাজের এই প্রদর্শনীতে কিউরেটর শিল্পী নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন। কিউরেটিং নোটে তিনি উল্লেখ করেছেন—‘শিল্পের ইতিহাসে আধুনিকতাবাদ (মডার্নিজম), কিউবিজম এবং দাদা আন্দোলন গ্রাফিক ডিজাইনের বিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধের পক্ষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আমেরিকার প্রপাগান্ডা পোস্টার এর বড় উদাহরণ। শিল্পবিপ্লবের যুগে মূলত রুশ গঠনবাদ (কনস্ট্রাক্টিভিজম) আন্দোলনের প্রভাবে আকার ও গঠনশৈলীর শক্তি প্রতীয়মান হয়। এর ধারাবাহিকতা জুরিখের পোস্টার ও সাইনবোর্ডে এখনো দৃশ্যমান। পোস্টারগুলো একেকটি অনন্য চিত্রকর্ম মনে হয়। ২০২৫ সালে জুরিখ সফরে দাদা আন্দোলনের সূতিকাগার ‘ক্যাবারে ভলতেয়ার’ ও ‘কুনস্তহাউস জুরিখ’-এর সংগ্রহ, বিশেষ করে পোস্টার দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই।’

এসব দেখে মাহবুব ও তাঁর সঙ্গীরা দেশে এ ধরনের আয়োজনের চিন্তা করেন। এই ভিন্নধারার প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ১৮ জুলাই।
সুপ্রশস্ত ও উঁচু কাচের দরজার ডান দিকে কিউরেটিং নোট। এর পরের দেয়ালে তরুণ শিল্পী শেখর সাখাওয়াতের তিনটি কাজ ‘আ ট্রিবিউট টু দ্য আলটিমেট’, ‘গ্রাটিচুড’ ও ‘পারসেপশন অব দ্য আলটিমেট’ নামে। চুল দিয়ে সূচিকর্মের সঙ্গে সাদা সূচিনকশা করা পটের ওপর ততোধিক সাদা রঙের ওই লেখাগুলো ঐতিহ্যের পরিচ্ছন্ন সুন্দরের সঙ্গে আধুনিকতার যথেচ্ছ স্বাধীনতার সাংঘর্ষিক অবস্থা তুলে ধরে।
কিউরেটর মাহবুবুর রহমানের গড়া ‘নেট ওয়েট: দ্য স্ট্যান্ডারাইজড সেলফ’ শিরোনামে কয়েকটি দৃশ্যমান প্লাস্টিকের অভিজাত বাক্সে একের পর এক সাজানো পণ্য। এসবের একেকটিতে আছে স্বচ্ছ প্লাস্টিকে গড়া মানুষের সম্ভবত শিল্পীর নিজেরই নাক, কান, চোখ, আঙুল! করপোরেট বাণিজ্যের বিশ্বে অর্থপ্রবাহের আতিশয্যে মানুষ ও তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব এখন আবশ্যিক পণ্যের তালিকায়!

প্রদর্শনীতে সনদ বিশ্বাসের প্রকল্প অ্যানিমেটেড ভিডিও আর্ট, যার নাম ‘অসম্পূর্ণ কিংবদন্তি’। গ্যালারির ভেতরে ছোট্ট একটি অন্ধকার ঘর, এতে প্রজেকশন হচ্ছে শ্মশানে এক তান্ত্রিক গুরু ধ্যানমগ্ন, পরের দৃশ্যে এক মাংসভুক সুপারম্যান ও তৃণভোজী ডাইনোসরের ছবি, ওদের মধ্যে সংঘর্ষ। শেষে এই দুইয়ে মিলে তৈরি হয় ডাইনোম্যান! ব্যঙ্গাত্মক হলেও যার যার সীমানা ঠিক রাখার ক্ষেত্রে একপ্রকার তাগিদ এটি, যা দর্শকদের জন্য বেশ শিক্ষামূলক নির্মাণ!
এ প্রদর্শনীর ১০ জন শিল্পীর অন্যতম ইমরান হোসেন পিপলুর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি জানালেন, গ্রাফিক ডিজাইনারদের সৃজনশীল কাজ অনেক সময় সেবাগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের মনঃপূত হয় না, এতে তাঁর সৃজনসত্তা ধাক্কা খায়। আমরা চেয়েছি সেই রিজেকশনকে নিয়েই শিল্পীর স্বকীয় চিন্তা এবং তাঁদের কাজকে কেন্দ্র করে দর্শকের সঙ্গে একটি মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে।

পিপলু কাগজের ভাস্কর্যই বেশি করেন, অন্যান্য মাধ্যমেও কাজ করেন। তবে পেশাগতভাবে তিনি গ্রাফিক ডিজাইনার। কথা বলতে বলতেই দেখা হলো তাঁর কাজ।
‘মার্জিনস অব এরর’ শিরোনামের তিনটি কাজ। কোনাকুনি দুই দেয়ালে বিশাল অক্ষরে লেখা সংলাপ। নানা রঙে ছোট-বড় ইংরেজি অক্ষরে প্রথমটিতে লেখা ‘ফুড ফর দ্য হাংরি’, এরপর আছে ‘(সেফ নয়) ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। শেষটিতে লেখা ‘স্মলেস্ট স্টেজ ইউএস ইজ ইউএন আইডেনটিফাইড’! অক্ষর সাজিয়ে সামান্য কটি বাক্যে ব্যঙ্গভাবের জুতসই প্রকাশ এবং বিশ্ব সংস্থার অকার্যকারিতার বিরুদ্ধে এক প্রকার প্রতিবাদও!
গ্রাফিক ডিজাইন কাজে অক্ষর দিয়ে নকশা রচনায় মিতা মেহেদীর দক্ষতার প্রকাশ আমরা ইতিমধ্যেই পেয়েছি। এ প্রদর্শনীর জন্য তিনি তিনটি চিত্রপটে রঙিন কাপড় কেটে ঢাকা মহানগরের তিনটি এলাকা যথাক্রমে কলাবাগান, ভূতের গলি ও কাঁটাবন শব্দ লিখে ওই তিন এলাকার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে এর নামকরণের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

‘ভূতের গলি’ নামের চিত্রপট কালোর মধ্যে গলির অবয়ব রচেছেন শিল্পী ছাইরং ও কাছাকাছি কিছু অনুজ্জ্বল রঙের বস্ত্রখণ্ড দিয়ে। ইলেকট্রিক খাম্বা ও তার, মাকড়সার জাল—এসব এই গলিকে শিল্পিত উপায়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করেছে।
তেমনই ‘কলাবাগান’ কলাগাছময়, পেছনে লাল সূর্য আর সামনে পথ, সে পথ ধরে চলছে ঢাকার বাহন রিকশা। তৃতীয় পট ‘কাঁটাবন’ তথৈবচ কণ্টকময় তাঁর নকশা রচনায়!
কাজটির শিরোনাম ‘উই আর নাইনটি এইট পারসেন্ট হিউম্যান’। মানব অবয়বসদৃশ মুখোমুখি তিন গুণিতক ছয়টি দেহকাঠামোর অভ্যন্তরে ইলাস্ট্রেশনের মতো রেখাঙ্কনে আবার কতক অবয়ব ও কাঠামো এবং এমন একটি নারী অবয়বের ফ্রকের মতো বৃত্তাকার নকশায় একটি স্লোগান দিয়ে চিত্র সম্পন্ন করেছেন মেহেদী হাসান। তাঁর কাজের মাধ্যম প্লাস্টিক কাগজের বোর্ড।

নগরকেন্দ্রে কিংবা দূরপাল্লার পথের ধারে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড হরহামেশা দেখা যায়। গ্যালারির অভ্যন্তরে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন নবীন শিল্পী আলী সাগর। তাতে ইংরেজি বর্ণে বড় বড় অক্ষরে লিখেছেন—‘ফিল মোর’। এর নিচে একটা হার্ট আর সেটিকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে লেখা ‘মেড বাই দ্য ইউনিভার্স’-এর নিচে যা লেখা সেটি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—আমাদের অসম্পন্ন সৃজন দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চেষ্টা করেছি, কারণ সবশেষে অনুভূতিই সবকিছু।
চিত্রশালার মেঝের একটি জায়গায় শিল্পী মনির মৃত্তিক সবুজ, হলুদ ও নীল রঙের প্লাস্টিকের পাটি বিছিয়ে নদীসহ বড় একটি জমিন তৈরি করে তার ওপর ‘উন্নয়ন’ লেখা ক্ষুদ্রকায় লালচে ইট সাজিয়ে নানা স্থাপনার সমাবেশকে ফুটিয়ে তুলেছেন। একপাশে ওই ইট দিয়ে আগ্রহী দর্শক চাইলেও বোধ করি নিজের পছন্দসই কিছু বানাতে পারেন। সবুজের শরীরে কংক্রিটের হানা নিয়ে শিল্পী বলতে চেয়েছেন—ফসলি জমিতে উন্নয়নের ইট স্থাপনা প্রকৃতিকে দিন দিন সংকুচিত করছে!

ওষুধপত্র, চালডাল, ডিমও আজকাল বিজ্ঞাপিত। শিল্পী শিমুল দত্ত ‘ইন আ পারফেক্ট ইলিউশন’ নামের কাজটির মাধ্যমে সেই করপোরেট বাণিজ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন সাদা দেয়ালে ঝোলানো ক্যাপসুল, ডিম, চাল আর সম্পদের বস্তার ওপর নানা লেখা দিয়ে। যেমন ক্যাপসুলের গায়ে ইংরেজিতে লেখা—তোমার স্বাস্থ্য আমার অধীনে। ডিমে লেখা—মেয়াদকাল অসীম!
শিল্পী পীযূষ তালুকদার পিন্টু গড়েছেন ‘গুজবের কান’। দেয়ালে ঝুলছে বড় আকৃতির একটি কান, কানের ফুটো দিয়ে ঝুলছে নানা রঙের সুতো। এর দুপাশে লেখা আছে—‘এই নিয়েছে ঐ চিল, যা কান নিয়েছে গুজবে’। মানবসমাজে বিশেষ করে স্বল্পশিক্ষিত সমাজে গুজব ছড়ানো সহজ ও আত্মঘাতীও হয়!
১০ জন শিল্পীর যৌথ অংশগ্রহণে দক্ষিণের কাচের দেয়ালে তাঁরা কাগজ, প্লাস্টিক কেটে নানা মজার ইমেজ তৈরি করেছেন, যা দর্শকদের জন্য এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। আশার কথা নতুন প্রজন্ম মন দিয়ে কাজগুলো দেখছে ও ছবি তুলছে।
প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ৮ আগস্ট। দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে রোববার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।