সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / দেশের প্রাইমারি শিক্ষকদের জীবন: শ্রাবণ মেঘে ঢাকা
দেশের প্রাইমারি শিক্ষকদের জীবন: শ্রাবণ মেঘে ঢাকা

দেশের প্রাইমারি শিক্ষকদের জীবন: শ্রাবণ মেঘে ঢাকা

স্কুল ছুটির পর রহমত (ছদ্মনাম) স্যারকে খুব বেশি খুঁজতে হয় না। গ্রামের মাঠেই তাঁকে পাওয়া যায়। কখনো শিশুদের ক্রিকেট দেখছেন, আবার কখনো ফুটবল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে দু-একজন শিক্ষার্থীর বাড়িতে ঢুঁ মারেন। কে পড়ছে, কে পড়ছে না—সেই খোঁজ নেন। কারও জ্বর হলে বিনা মূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করেন। তাঁর ঘরে ওরস্যালাইনের মজুত সব সময় থাকে। গ্রামের মানুষও বিপদে-আপদে বিনা মূল্যে তা নিতে পারেন।

উত্তরের সীমান্তঘেঁষা বাড়াই পাড়া গ্রামের মানুষের কাছে রহমত স্যার শুধু শিক্ষক নন, পরম আপনজন। কিন্তু এই আদর্শ শিক্ষকের নিজের সংসার চলে অত্যন্ত কষ্টে। প্রতি মাসেই মুদি ও মাছের দোকানে বাকির খাতা বড় হতে থাকে। এক পারিবারিক আড্ডায় রহমত স্যার বলছিলেন, ‘আমি সৎ পথে থেকে জীবন পার করতে চাই।’

কিন্তু বর্তমান বাজারদরে সৎ থেকে ‘ভালো হয়ে চলা’ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার খরচ হু হু করে বাড়ছে। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন আটকে আছে ১৩তম গ্রেডে। মূল বেতন শুরু হয় মাত্র ১১ হাজার টাকায়। রহমত স্যারের মতে, শিক্ষকদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। একই সঙ্গে সমাজে শিক্ষকদের প্রতি সম্মানও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁর পোশাক ও সাজগোজ নিয়ে ফেসবুকে কটাক্ষ করা হয়। এই ঘটনায় শিক্ষক সমাজের মানসিক কষ্ট সামনে আসে। এর প্রতিবাদে দেশের শিক্ষিকারা ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করেন। তাঁরা ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি ব্যবহার করেন। এটি কেবল একটি গান ছিল না। এটি ছিল শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার একপ্রকার নীরব প্রতিবাদও।

মাঠপর্যায়ে সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সৎ শিক্ষকেরা মোটেও ভালো নেই। বঞ্চনায় তাঁদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। প্রায় ১৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করা এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘বেতনের টাকায় সংসার চলে না। পরিবারের প্রয়োজনে ধার করতে হয়। সেই ধার শোধ করতে আবার নতুন ধার লাগে।’

এই সুযোগে গ্রামপর্যায়ে চড়া সুদের কারবার জমে উঠেছে। হাজার হাজার শিক্ষক বাধ্য হয়ে বেতনের চেক বন্ধক রেখে ঋণ নিচ্ছেন। মাসের শুরুতে বেতন আসার আগেই বড় অংশ সুদের কারবারির পকেটে চলে যায়।

তবে সংকট শুধু বেতনে নয়। বড় ক্ষত রয়েছে নিয়োগ ও প্রশাসনিক অরাজকতায়। শিক্ষক নিয়োগের বড় অংশ মেধার ভিত্তিতে হলেও প্রতিটি নিয়োগ একটি অংশ অনৈতিকভাবে শিক্ষকতা পেশায় ঢোকে। প্রায় প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষায় ‘কেন্দ্র কন্ট্রাক্ট’ বা প্রশ্ন সমাধানের মতো জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। অনৈতিক উপায়ে আসা এই শিক্ষকেরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না। তাঁরা স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা বা কোচিং-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর তাঁদের অনুপস্থিতির বাড়তি কাজের চাপ সামলাতে হয় সৎ শিক্ষকদের।

সাধারণ শিক্ষকদের ভাষ্য, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর এই নেটওয়ার্কের কাছে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা জিম্মি হয়ে আছে। দেশের মধ্যাঞ্চলের এক প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘অসৎ শিক্ষকেরা শিক্ষা অফিসারদের মাসোয়ারা দিয়ে পার পেয়ে যান। আর নিয়ম মানা শিক্ষক সামান্য ভুলেও শোকজ বা হয়রানির মুখে পড়েন।’

সাধারণ শিক্ষকদের বদলি, ছুটি, সার্ভিস বুক হালনাগাদ কিংবা অবসরের পেনশন—প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুষের অলিখিত নিয়ম চালু আছে। রংপুর বিভাগের এক শিক্ষক জানান, ঘুষ না দিলে সার্ভিস বুকে লাল কালি দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। অথবা ফাইল আটকে রাখা হয়।

এই অরাজক ব্যবস্থার কুফল সরাসরি পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০২৩ অনুযায়ী, এক বছরে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ১০ লাখের বেশি। বিপরীতে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে। এতে স্পষ্ট, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার ওপর থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত আস্থা হারাচ্ছেন।

সাধারণ শিক্ষিকারা এবার শ্রাবণ মেঘের গান গেয়েছেন। সংহতি জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা জানেন শুধু গান গেয়ে এই সংকট কাটবে না। তাই অবিলম্বে সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড দেওয়া, পদোন্নতির ব্যবস্থা করা এবং নিয়োগের অনিয়ম ও শিক্ষা অফিসের ঘুষ-হয়রানি বন্ধ করার দাবি সাধারণ শিক্ষকদের। উত্তরাঞ্চলের এক সহকারী শিক্ষকের কথা, ‘আমরা আন্দোলন করতে চাই না। শুধু সম্মান নিয়ে শান্তিতে বাচ্চাদের পড়াতে চাই। সরকার কি আমাদের এই সাধারণ চাওয়াটুকু পূরণ করবে?’

About Editor Todaynews24

Check Also

জাপানে ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩, ধসে পড়া বিপণিবিতানে উদ্ধার অভিযান

জাপানে ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩, ধসে পড়া বিপণিবিতানে উদ্ধার অভিযান

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, এখনো অনেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। এটি মূলত সময়ের বিরুদ্ধে এক লড়াই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *