রাজধানীর দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা (৪২) হত্যা মামলায় তাঁর স্বামী মো. সোহেল রানাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত এই আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু বকর সিদ্দিক।
আদালতে শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহাবুদ্দিন শেখ রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। তিনি বলেন, আসামিকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও তিনি হত্যা করেননি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে হত্যারহস্য বের করতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করার আবেদন জানান।
আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আদালত ভবন থেকে নিচে নামিয়ে নেওয়ার সময় সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি খুন করিনি। পুলিশ কোনো আসামি না পেয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আমি সঠিক তদন্ত চাই। বিচার চাই।’
রোকসানার লাশ উদ্ধার
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের বোন মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ওই দিন বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ১০ বছর বয়সী মেয়েকে স্কুলে দিয়ে অফিসে যান সোহেল রানা। বাসায় তখন একা ছিলেন সারা রোকসানা। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে স্কুল ছুটি হলে একাই বাসায় ফেরে মেয়েটি। ঘরে ঢুকে শোবার ঘরে মাকে বিছানায় মুখের ওপর বালিশচাপা অবস্থায় দেখতে পায় সে। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে সে বুঝতে পারে মায়ের শ্বাসপ্রশ্বাস নেই। পরে স্কুলে ফিরে অধ্যক্ষের মুঠোফোন থেকে বাবাকে বিষয়টি জানায়।
খবর পেয়ে সোহেল রানা এবং পরে সারা রোকসানার পরিবারের সদস্যরা বাসায় আসেন। ঘরের একটি জানালার গ্রিল কাটা পাওয়া যায় এবং আলমারি থেকে আনুমানিক ২০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে বলে জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, চোর বা ডাকাত দল গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে লুটপাটের পর সারা রোকসানাকে হত্যা করেছে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

পুলিশের সন্দেহ যেখান থেকে
মামলাটি তদন্তের এক পর্যায়ে শুক্রবার দিবাগত রাতে সোহেল রানাকে আটক করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে রিমান্ড আবেদনে বলেন, জানালার গ্রিল কাটা থাকলেও আশপাশের কেউ কোনো শব্দ শোনেননি। জানালার ভেতরের বারান্দায় পাওয়া জুতার ছাপের সঙ্গে সোহেল রানার জুতার মিল পাওয়া গেছে, যা সোহেল রানা নিজের বলে স্বীকার করেছেন। তবে বাইরের ছাদ বা বিপরীত পাশে কোনো জুতার ছাপ পাওয়া যায়নি।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, নিহত চিকিৎসকের মেয়ে পুলিশকে জানিয়েছে, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে মা তার সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিতেন। তবে ঘটনার দিন দরজা আটকানো হয়নি। এ ছাড়া সোহেল রানা বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখেও তাঁকে স্পর্শ বা চিকিৎসার চেষ্টা করেননি। সোহেল রানার ব্যবহৃত আলমারিটি অক্ষত ছিল। ঘটনাস্থলে থাকা পুরোনো খালি গয়নার বাক্সগুলো গুছিয়ে রাখা ছিল, যা দেখে প্রকৃতপক্ষে চুরি বা ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেই পুলিশ মনে করছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের কথা স্বীকার করে স্ত্রীর একটি সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ করার কথা বলেছেন সোহেল রানা।
পুলিশের এই আবেদনে সোহেল রানার বিরুদ্ধে নিহতের পরিবার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীকে নির্যাতন করে আসছিলেন এবং তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সারা রোকসানা বোনকে ফোন করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।