সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / জ্ঞানের স্তরবিন্যাস: ‘মারাতিবুল ইলম’-এর দর্শন
জ্ঞানের স্তরবিন্যাস: ‘মারাতিবুল ইলম’-এর দর্শন

জ্ঞানের স্তরবিন্যাস: ‘মারাতিবুল ইলম’-এর দর্শন

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা জ্ঞানের ঐক্যের কথা বললেও কখনোই সব জ্ঞানকে একই মর্যাদা দেয় না। কারণ, বাস্তবতা যেমন স্তরবিন্যস্ত, তেমনি তাকে জানার পথও স্তরবিন্যস্ত। যে বিশ্বে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, ভৌত ও নৈতিক, সাময়িক ও চিরন্তন, কারণ ও উদ্দেশ্য একসঙ্গে বিদ্যমান, সেখানে জ্ঞানেরও মারাতিব বা স্তর থাকা অবশ্যম্ভাবী।

এই স্তরবিন্যাস ক্ষমতার নয়; বরং বিষয়, পরিসর ও ব্যাখ্যাগত গভীরতার। অতএব জ্ঞানের ঐক্যকে বুঝতে হলে তার মারাতিবও বুঝতে হবে। এখানে সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করে ওহিগত জ্ঞান। এর শ্রেষ্ঠত্ব আলোচ্য বিষয়ের কারণে।

ওহি এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়, যা অন্য কোনো জ্ঞানের শাখার পদ্ধতিগত এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। অস্তিত্ব কেন, মানুষের উদ্দেশ্য কী, নৈতিকতার চূড়ান্ত ভিত্তি কোথায়, মৃত্যুর পরিণতি কী, আমানত ও খেলাফতের প্রকৃত তাৎপর্য কী ইত্যাদির জবাব ওহির কাছে পাই।

অতএব ওহি প্রকৃতিপাঠের চূড়ান্ত দিগ্‌দর্শক। সে কারণ ব্যাখ্যা করে না; সে উদ্দেশ্য উন্মোচন করে।

বিজ্ঞান যদি উদ্দেশ্যের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তবে সে নিজের সীমানা অতিক্রম করে; আবার ধর্ম যদি পরীক্ষাগারের ভাষায় প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে চায়, তবে সে–ও তার নিজস্ব মারাতিব থেকে সরে যায়।

পরবর্তী স্তরে অবস্থান করে ফিতরাতগত জ্ঞান। এটি মানুষের অন্তঃস্থ স্বীকৃতিশক্তি। যার উসিলায় মানুষ ন্যায়–অন্যায়, সৌন্দর্য–কুশ্রীতা, ভারসাম্য–বিশৃঙ্খলার প্রাথমিক বোধ হাসিল করে। এই জ্ঞান সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; আবার সম্পূর্ণ অবিশ্বস্তও নয়। এটি ওহির আলোয় পরিশুদ্ধ হয় এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিণত হয়।

ফিতরাত মানুষের অন্তরের মিজান। কিন্তু এই মিজান নফস, অভ্যাস ও সংস্কৃতির ধুলায় আচ্ছন্ন হতে পারে। অতএব তাকে জাগ্রত রাখার জন্য ওহি ও তাজকিয়াহ অপরিহার্য।

এরপর আসে পর্যবেক্ষণমূলক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। এই জ্ঞান উন্মোচন করে সৃষ্টি কীভাবে কাজ করে তার কার্যকারণ, বিন্যাস, পরিবর্তন ও নিয়মাবলি। এই জ্ঞানের মর্যাদা প্রায় অপরিসীম। কারণ, খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে হলে সৃষ্টির কার্যপ্রণালি জানা আবশ্যক।

কিন্তু সৃষ্টির উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা বিজ্ঞানের এখতিয়ার নয়। বিজ্ঞান যদি উদ্দেশ্যের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তবে সে নিজের সীমানা অতিক্রম করে; আবার ধর্ম যদি পরীক্ষাগারের ভাষায় প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে চায়, তবে সে–ও তার নিজস্ব মারাতিব থেকে সরে যায়। জ্ঞানের স্তরবিন্যাস এই সীমারেখাগুলো সুস্পষ্ট করে।

এরপর রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান। এগুলো মানুষের সম্মিলিত জীবন, অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠান ও সভ্যতার পরিবর্তনশীল হাকিকত ব্যাখ্যা করে। এদের সত্য আপেক্ষিক অর্থে নয়; বরং প্রসঙ্গনির্ভর অর্থে বিকাশমান।

কারণ, মানবসমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ফলে এই জ্ঞানগুলো সংশোধনযোগ্য ও ক্রমবিবর্তনশীল। কিন্তু তাই বলে এদের গুরুত্ব কমে না; বরং এগুলো ছাড়া বাস্তব সমাজে ওহিগত নীতির প্রয়োগও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞান দর্শনের জায়গা নিতে চায়, দর্শন ওহির জায়গা নিতে চায়, আবার লোকজ অভিজ্ঞতা পরীক্ষিত জ্ঞানের বিকল্প হয়ে উঠতে চায়, তখন সমাধান আসে না, সমস্যা বাড়ে।

সবশেষে রয়েছে কারিগরি ও প্রয়োগগত জ্ঞান। কৃষিকৌশল, চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রশাসন, অর্থব্যবস্থা কিংবা প্রযুক্তি। এসব হচ্ছে মানুষের জীবন পরিচালনার প্রয়োজনীয় উপকরণ। এগুলোর মূল্য তাদের এস্তেমালে।

তবে এগুলোকে কখনোই আখলাকি বা ওজুদগত সত্যের স্থলাভিষিক্ত করা যায় না। একটি প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত হতে পারে, কিন্তু তা মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না, এই সওয়ালের জবাব প্রযুক্তি নিজে দিতে পারে না।

কোনো জ্ঞানকে ছোট বা বড় করা এই স্তরবিন্যাসের মতলব নয়। এ বিন্যাসের উদ্দেশ্য হলো, প্রতিটি জ্ঞানকে তার যথার্থ মাকামে স্থাপন করা। কারণ, বিশৃঙ্খলা তখনই জন্ম নেয়, যখন কোনো একটি স্তর নিজেকে সমগ্র জ্ঞানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হিসেবে কায়েম করতে চায়।

তখন বিজ্ঞান দর্শনের জায়গা নিতে চায়, দর্শন ওহির জায়গা নিতে চায়, আবার লোকজ অভিজ্ঞতা পরীক্ষিত জ্ঞানের বিকল্প হয়ে উঠতে চায়, তখন সমাধান আসে না, সমস্যা বাড়ে।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই অ-মিজানকে প্রত্যাখ্যান করে। সে বলে ইলমেরও আদব আছে; আর সেই আদবের প্রথম শর্ত হলো প্রতিটি জ্ঞানকে তার নিজস্ব মারাতিবে প্রতিষ্ঠিত করা।

অতএব ‘মারাতিবুল ইলম’ ধারণাটি ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার একটি মৌলিক ভিত্তি। কারণ, জ্ঞানের ঐক্য তখনই সুসংহত হয়, যখন তার ভেতরের স্তরবিন্যাসও সুস্পষ্ট হয়। ঐক্য মানে, সমতাই নয়; ঐক্য হলো সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যের নাম।

আর জ্ঞানের প্রকৃত নেজামও প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন প্রতিটি ইলম তার যথার্থ মাকাম চিনে নিয়ে অপর ইলমের সঙ্গে তাআউন (সহযোগিতা) ও তাকামুল বা পূর্ণতা বিধানের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।

  • মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

About Editor Todaynews24

Check Also

খুলনায় অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী রুবেল গ্রেপ্তার

খুলনায় সন্ত্রাসী শিবলী হোসেন রুবেল (৪৬) নামে এক ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও খুলনা সদর থানা পুলিশ। মহানগরীর মোতলেবের মোড় এলাকায় আব্দুল হক হাওলাদারকে গুলিবর্ষণের ঘটনার তদন্তে তাকে গ্রেপ্তার...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *