সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / জুমচাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে
জুমচাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে

জুমচাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে

‘পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও প্রথম আলো

জুম সম্পূর্ণ প্রকৃতি ও পরিবেশনির্ভর একটি কৃষিব্যবস্থা। জুম শুধু একটি চাষাবাদ নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই জুমচাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাঁদের কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা দিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ি সড়কের সাবারাং রেস্টুরেন্টের মিলনায়তনে ‘পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও প্রথম আলো এ বৈঠকের আয়োজন করে।

গোলটেবিল বৈঠকের অতিথি রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেন, জুমচাষকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। জুমচাষিদের কৃষক কার্ড, সরকারি প্রণোদনা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার বিষয়ে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা করবেন বলে জানান। এ ছাড়া গোলটেবিল আলোচনা থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলো তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন বলেও উল্লেখ করেন।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি অন্য যেকোনো অঞ্চল থেকে আলাদা। এই বাস্তবতায় জুমচাষ পাহাড়ি মানুষের জন্য একটি প্রয়োজনীয় কৃষিব্যবস্থা। তাই জুমকে নিষিদ্ধ বা বন্ধ করার কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়। জুমচাষ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কখনো হারিয়ে যাবে না। জাতীয় কৃষি নীতিতে জুমচাষের স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি জুমের উৎপাদনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে জুমচাষিরাও কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন এবং সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন।

কাজল তালুকদার বলেন, জুমচাষিরা কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় কৃষিঋণ, প্রণোদনা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাঙামাটি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জুমচাষিদের তালিকা করে তাঁদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র ও সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটি বিবেচনা করা হবে।

নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে

গোলটেবিল বৈঠকে চাকমা সার্কেলের প্রধান দেবাশীষ রায় বলেন, জুমকে একেবারে সব সমস্যার সমাধানও বলা যাবে না, আবার সব সমস্যার কারণও বলা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে জুমকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।

জুমকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতির দাবির সঙ্গে একমত জানিয়ে চাকমা সার্কেল প্রধান বলেন, প্রণোদনা পাওয়ার জন্য জুমকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। জুমচাষিরা আনন্দের জন্য জুমচাষ করেন না। জীবিকার তাগিদে করেন।

বীজ সংরক্ষণ নিয়ে দেবাশীষ রায় বলেন, বীজ ব্যাংকের ধারণা ভালো। কিন্তু বাস্তবে জুমের বীজ এক বছরের বেশি সংরক্ষণ করা কঠিন। তাই শুধু ব্যাংক গড়লেই হবে না, দেশীয় বীজ সংরক্ষণের উপযোগী পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। জুম নিয়ে গবেষণাকেন্দ্র করা জরুরি। জুম বাঁচাতে হলে জেলা পরিষদ, সার্কেল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, এনজিও ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

‘পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। গতকাল রাঙামাটির একটি রেস্তরাঁয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান জুমচাষের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, জুমচাষ একসময় ছিল সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল কৃষিব্যবস্থা। পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনই ছিল এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু এখন অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। মানুষ বেশি আয় করতে চায়। তাই হাইব্রিড জাত, সার, কীটনাশক ও বাজারমুখী ফসলের দিকে ঝুঁকছে।

জুমের পরিবর্তিত বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক মিসবাহুজ্জামান বলেন, আগে একটি জুমের জমি ২০-২৫ বছর পতিত রাখা হতো। এই সময়ে মাটির উর্বরতা, অণুজীব এবং জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিকভাবে পুনরুদ্ধার হতো। এখন সেই আবর্তকাল কমে যাওয়ায় মাটির স্বাভাবিক পুনর্জন্মের সুযোগও কমে গেছে। জুমচাষের পরিবর্তে ফলবাগান করার কারণে পাহাড়ে ভূমিধসের ঘটনা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংকটে জুমচাষ, প্রণোদনা দেওয়ার তাগিদ

পাহাড়ে ধীরে ধীরে জুমচাষ কমছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ থেকে ১০ বছরে প্রায় আড়াই হাজার একর জুমের জমি কমেছে। একসময় ১৭ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হলেও এখন হচ্ছে ১৫ হাজার ৩২৬ হেক্টর জমিতে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, জুম নিয়ে একটি বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম কেন জুম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কীভাবে তাদের আবার এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং কীভাবে জুমকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকিয়ে রাখা যায়—এসব বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি জুয়াম লিয়ান আমলাই জুমকে বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী করার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বন বিভাগসহ বিভিন্ন মহল প্রায়ই জুমিয়াদের বন ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী করে। শুধু দোষারোপ না করে বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে এই কৃষিব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য নাইউপ্রু মারমা মেরি বলেন, ‘জুম হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নবান্নের মতো উৎসব, পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন মোনঘরের নির্বাহী পরিচালক অশোক কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি ভবতোষ দেওয়ান, ইউএনডিপির এসআইডি-সিএইচটির জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বিপ্লব চাকমা, খাগড়াছড়ির কাপতলা পাড়ার জুমচাষি ও পিআইসির সভাপতি প্রভাংশু ত্রিপুরা, প্রগ্রেসিভের নির্বাহী পরিচালক সুচরিতা চাকমা, টয়মুর নির্বাহী পরিচালক দিনেন্দ্র ত্রিপুরা, ভাঙামুড়া পাড়ার জুমচাষি ফুলরানি ত্রিপুরা, কবিদাংয়ের নির্বাহী পরিচালক লালসা চাকমা।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শঙ্কর সাহা। ধন্যবাদ জানান জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

About Editor Todaynews24

Check Also

আজ ৮/৮: কেন এই দিনকে ‘ইনফিনিটি ডে’ বলা হয়?

আজ ৮ আগস্ট- তারিখটি দেখতে যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশেষ এক প্রতীকী অর্থ। ৮/৮ সংখ্যার সঙ্গে অসীমতার প্রতীক ‘∞’-এর মিল থাকায় অনেকের কাছে দিনটি ‘ইনফিনিটি ডে’ বা ‘অসীম দিবস’ নামে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *