গ্রীষ্মের কড়া রোদে আমাদের শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল যায়। অতিরিক্ত ঘাম থেকে শুরু করে হিটস্ট্রোক বা রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু এর মধ্যে একটা মজার ধারণা বেশ প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, গ্রীষ্মকালে মাথার চুল একটু বেশি দ্রুত বড় হয়! বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা কতটুকু সত্যি? বিজ্ঞান বলছে, খুব বেশি নয়। তবে হ্যাঁ, ছেলেদের দাড়ির ক্ষেত্রে গল্পটা একটু ভিন্ন হতে পারে।
একটা বিষয় প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার। আমাদের চুল কিন্তু সব সময় একই গতিতে বাড়ে না। স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের মাথার চুল বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হয়। আমাদের প্রতিটি চুলের গোড়া মূলত চারটি চক্রের ভেতর দিয়ে যায়। সেগুলো হলো বৃদ্ধির পর্যায় (অ্যানাজেন), রূপান্তর পর্যায় (ক্যাটাজেন), বিশ্রামের পর্যায় (টেলোজেন) এবং ঝরে পড়ার পর্যায় (এক্সোজেন)।
মাথার প্রতিটি চুল স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে দুই থেকে আট বছর পর্যন্ত এই বৃদ্ধির পর্যায়ে থাকে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সময়টা কমতে থাকে। ফলে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডার্মাটোলজিস্ট এলিজাবেথ বাহার হুশমান্দ জানান, জিনগত কারণ, পুষ্টি, ওষুধ, মানসিক চাপ বা শরীরের কোনো প্রদাহের ওপর নির্ভর করে এ চক্রটি বদলাতে পারে। যেমন থাইরয়েডের সমস্যা, আয়রনের ঘাটতি, বড় কোনো অসুখ বা হুট করে ওজন কমে গেলে অনেক বেশি চুল ঝরতে পারে।
অনেকের ধারণা, পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান, যেমন তাপমাত্রা বা সূর্যের আলো আমাদের শারীরবৃত্তীয় নানা প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। রোদ লাগলে শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ বেশি তৈরি হয়। এ কারণেই অনেকে ভাবেন, গ্রীষ্মকালে চুল দ্রুত বাড়বে। কিন্তু এলিজাবেথ হুশমান্দ এই ধারণা একদম নাকচ করে দিয়েছেন।
এলিজাবেথ হুশমান্দ বুঝিয়ে বলেন, যদি কারও শরীরে সত্যিই ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতি থাকে, তবে সেই ঘাটতি পূরণ করলে হয়তো সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো হবে এবং চুল পড়াও কমবে। কিন্তু যার শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক মাত্রায় আছে, তিনি যদি রোদে পুড়ে আরও ভিটামিন ‘ডি’ নেন, তাতে তাঁর চুল জাদুর মতো বড় হয়ে যাবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ডার্মাটোলজিস্টরা মনে করেন, চুল বড় হওয়ার বিষয়টি মূলত আমাদের শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্য ও ফলিকলের কোষীয় অবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে, বাইরের ঋতুর ওপর নয়।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে চুল বাড়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে নব্বই দশকে ছোট দুটি গবেষণা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্চ মাসে মানুষের মাথার চুল সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির পর্যায়ে থাকে। এরপরের ছয় মাস এই হার কমতে থাকে এবং সেপ্টেম্বরে গিয়ে তা একদম তলানিতে ঠেকে।
মজার ব্যাপার হলো, দাড়ি বড় হওয়ার হিসাবটা আবার অন্য রকম! ওই গবেষণাতেই দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে দাড়ি সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে। শীতকালের তুলনায় জুলাই মাসে দাড়ি বাড়ার হার প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি থাকে!
পাঁচ বছর পর একই জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাও প্রায় একই কথা বলে। সেখানে দেখা যায়, গ্রীষ্মের শেষের দিকেই সবচেয়ে বেশি চুল বিশ্রামের পর্যায়ে (টেলোজেন) চলে যায়। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে চুল সবচেয়ে বেশি বাড়ে না, বরং সবচেয়ে কম বাড়ে!
পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ডার্মাটোলজি জার্নালে ৮২৩ জন নারীকে নিয়ে বেশ বড় পরিসরে আরেকটি গবেষণা হয়। সেখানে সুস্থ নারীদের পাশাপাশি অতিরিক্ত চুল পড়া সমস্যায় ভোগা নারীরাও ছিলেন। এত বড় গবেষণার ফলাফলও সেই পুরোনো কথাই মনে করিয়ে দেয়; গ্রীষ্মকালেই সবচেয়ে বেশি চুলের ফলিকল বিশ্রামে থাকে।
আর ওই যে দাড়ি ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ার কথা বললাম? শুনতে অনেক বেশি মনে হলেও বাস্তবে এই হার মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ০.৩ ইঞ্চি বেশি! এই সামান্য পরিবর্তন তুমি হয়তো খালি চোখে টেরই পাবে না।
সব মিলিয়ে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, নিয়ম মেনে পরিমিত রোদ পোহালে শরীরের উপকার হয় ঠিকই। এতে সেরোটোনিনের মতো হরমোন তৈরি হয়, যা আমাদের মন ভালো রাখে। কিন্তু আপনি যদি ভাবেন, গ্রীষ্মের কড়া রোদে ঘুরে বেড়ালে তোমার মাথার পাতলা চুল ঘন হয়ে যাবে, তবে সেই আশায় আপাতত গুড়ে বালি!
সূত্র: পপুলার সায়েন্স