Home / সকল আপডেট / গুলিবিদ্ধ হয়ে শাকিল বলেছিলেন, ‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো…’
গুলিবিদ্ধ হয়ে শাকিল বলেছিলেন, ‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো...’

গুলিবিদ্ধ হয়ে শাকিল বলেছিলেন, ‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো…’

‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো,…।’ মো. শাকিল আহমেদ যখন মুঠোফোন নম্বরটি বলছিলেন, তখন তাঁর দুই হাত ও দুই পা ধরে দুজন টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর শরীর থেকে রাস্তায় ঝরছিল রক্ত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর–১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হন শাকিল। তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার এই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এই তরুণ হয়তো আর বেঁচে নেই।

গত সোমবার মিরপুর–১ নম্বরের সাবলেটের বাসায় বসে শাকিল (২১) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমিও ভাবছিলাম, আর বাঁচব না।’

উন্নত চিকিৎসার জন্য শাকিল আহমেদকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল

সে মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে শাকিল জানালেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমেই মায়ের কথা মনে হয়েছে তাঁর। তাঁকে যাঁরা সাহায্য করছিলেন, তাঁদের তিনি এ কারণেই মুঠোফোন নম্বর বলছিলেন, যাতে মারা গেলে তাঁর লাশটা অন্তত মা নিতে পারেন। কবর দিতে পারেন।

তবে যে মুঠোফোন নম্বর তখন শাকিল বলছিলেন, সেটি আসলে তাঁর বড় বোনের বলে জানালেন তিনি।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে শাকিল এ আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ের দৃশ্য নিজেই তাঁর মুঠোফোনে ভিডিও করেছিলেন। শাকিলের কাছে থাকা ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁর সামনেই একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি তা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। স্লোগান দিচ্ছেন।

শাকিলের শরীরের কোথায় গুলি লেগেছিল, তা তাঁর কাছে জানতে চাই। তিনি বললেন, বাঁ নিতম্বে গুলি লেগে তা তলপেট ভেদ করে ডান পাশের কোমরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার লড়াই, নানা ভোগান্তির কথা প্রথম আলোকে শোনান শাকিল। তিনি বললেন, মল বের করার জন্য পেট কেটে কোলোস্টমি ব্যাগ ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁকে প্রায় দেড় বছর। মল বের হওয়ার পথ এখন বন্ধ। এ অবস্থায় থাইল্যান্ডের চিকিৎসকদের পরামর্শে একটি যন্ত্র ব্যবহার করে বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁকে এখন মলত্যাগ করতে হয়।

শাকিল বললেন, বিষয়টি আতঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এভাবে কত দিন চলতে হবে, তা তাঁর জানা নেই। তাঁর ডান পা সারাক্ষণ ঝিমঝিম করে। আর মানসিক যন্ত্রণা তো আছেই।

কথা বলতে বলতে সেই ভয়ানক দিনগুলোতে ফিরে যান শাকিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি রাজধানীর শ্যামলীর একটি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছেলে শাকিলকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন মা মোসাম্মৎ সেলিনা। তবে শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে যান শাকিল

গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে শাকিল বললেন, খুব বড় ব্যথা পেয়েছেন—এমন অনুভূতি হয়নি। কিছু একটা কামড় দিয়েছে, এমনটা মনে হয়েছে। প্যান্টের দিকে তাকিয়ে দেখেন, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সে মুহূর্তে শুধুই মনে হয়েছে, যে করেই হোক দৌড়ে অন্য আন্দোলনকারীদের কাছে যেতে হবে। ঘটনাস্থলে পড়ে গেলে তাঁকে মেরেই ফেলবে পুলিশ। তবে কয়েক সেকেন্ড দৌড়ানোর পরই বুঝতে পারেন, তিনি পড়ে যাচ্ছেন। পাশে থাকা একজনকে ধরে বলেছিলেন, তিনি পড়ে যাচ্ছেন।

ঘটনাস্থলে থাকা অন্য আন্দোলনকারীরা শাকিলকে উদ্ধার করে প্রথমে মিরপুরের আলোক হেলথকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান। শাকিল বললেন, চিকিৎসকেরা বলছিলেন, রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। গুলি মনে হয় দুটি লেগেছে। এসব কথা শুনলেও তিনি নিজে কিছু বলতে পারছিলেন না।

পরে রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে শাকিলের চিকিৎসা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শাকিলকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয়েছিল জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

সেদিনের কথা এখনো মনে আছে শাকিলের। তিনি বললেন, ততক্ষণে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বিভিন্ন সড়ক দিয়ে মানুষ গণভবনের দিকে ছুটছিল। এ অবস্থায় উল্টো পথে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হচ্ছিল। তাঁর বড় বোন শাকিলা আক্তার অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন। তিনি জানালা দিয়ে মুখ বের করে জনতাকে জায়গা করে দিতে বলছিলেন।

এমন একটি ভিডিও সংগ্রহ করেছেন শাকিল। তিনি বললেন, সন্ধ্যা নাগাদ গুলিতে আহত রোগীতে জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ভরে যায়।

২৬ আগস্ট শাকিলের জন্মদিন। ২০২৪ সালের এই দিনটির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বললেন, রাতে হুট করে মনে হলো, শরীর থেকে কী যেন বের হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা এসে দেখেন, শরীর থেকে বের হওয়া রক্তে সব ভেসে যাচ্ছে। সেদিন তাঁর আবার মনে হয়েছিল, তিনি মনে হয় বাঁচবেন না।

সেদিন কোনোভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেও এক সপ্তাহ পর আবার একই অবস্থা হয়েছিল বলে জানালেন শাকিল। তিনি বলেন, তখন চিকিৎসকেরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছিলেন, সমস্যাটা কোথায়। চিকিৎসকেরা একবার পরিবারের সদস্যদের এ কথাও বলেছিলেন যে শাকিলের পা কেটে ফেলতে হবে।

একপর্যায়ে শাকিলের মলত্যাগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানান শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, তাঁর চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব নয়।

শাকিল বললেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য গত বছর সরকারিভাবে তাঁকে প্রথমে সিঙ্গাপুর পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। পরে তাঁকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর আটটি অস্ত্রোপচার হয়। কোলোস্টমি ব্যাগ খুলে দেন চিকিৎসকেরা।

ছেলে শাকিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত মা মোসাম্মৎ সেলিনা

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথম দিকে চিকিৎসায় কোনো সরকারি সহায়তা পাননি বলে জানালেন শাকিল। তবে পরে সরকারিভাবে চিকিৎসাসুবিধা পান তিনি। শাকিল বলেন, সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য গত বছর থাইল্যান্ডে যান তিনি। সেখানে ছয় মাস চিকিৎসা চলে। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় চিকিৎসা শেষ না করেই তাঁকে দেশে ফিরতে হয়।

শাকিলের বাবা মো. সিরাজ হাওলাদার ২০১০ সালে মারা গেছেন। শাকিল ও তাঁর মা মোসাম্মৎ সেলিনা মিরপুরের সাবলেট বাসায় থাকেন। বড় বোন শাকিলা থাকেন মোহাম্মদপুরে স্বামীর সঙ্গে।

শাকিল আবার পড়াশোনা শুরু করেছেন। ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ শিখে ঘরে বসে তিনি কিছু আয় করছেন। সরকার নির্ধারিত ‘এ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি এককালীন পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। পাশাপাশি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন তিন লাখ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন শাকিল। বড় বোন ও তাঁর স্বামী নানাভাবে শাকিল ও তাঁর মাকে সহায়তা করছেন।

গত সোমবার ছেলের পাশে বসে মা মোসাম্মৎ সেলিনা বলছিলেন, শাকিল গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনিও ভেবেছিলেন, ছেলে মনে হয় আর তাঁর বুকে ফিরবেন না। ছেলে ফিরেছেন, তবে দিন যত যাচ্ছে, তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

দেশের বাইরে নিয়ে ছেলের চিকিৎসা করানোয় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এই মা। তিনি বলেন, তিনি সরকারের কাছে আর কিছু চান না।

পড়াশোনার পাশাপাশি ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ করেন শাকিল

জুলাই গণ-অভ্যত্থানে কখন যোগ দিয়ে ছিলেন, সেই স্মৃতি তুলে ধরেন শাকিল। তিনি বলেন, প্রথম দিকে আন্দোলনে না গেলেও পরে যান। বিশেষ করে রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যা, সাভারে লাশ পোড়ানোসহ বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখার পর তাঁর মনে হতে থাকে, এই আন্দোলনে অংশ নিতে হবে। তারপর আন্দোলনে যাওয়া শুরু করেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে একবার তাঁর শরীরে রাবার বুলেট লেগেছিল।

কথা বলতে বলতে শাকিলের কণ্ঠে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকার বিদায় নিয়েছে। এর বাইরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এসব দেখে এখন তাঁর মাঝেমধ্যে হতাশ লাগে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে শাকিল বলেন, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের শুধু ভাতা দিলেই হবে না। এই আন্দোলনে আপামর জনতা অংশ নিয়েছিল। সবাইকে নিয়ে দেশটা নতুন করে গড়তে হবে।

About Editor Todaynews24

Check Also

জাপানের বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিলেন ববি হাজ্জাজ

দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাপান প্রায় ৩০০ কোটিরও বেশি ভোক্তার একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *