জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ জেলায় গতকাল বুধবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ছিল। আগের দিন মঙ্গলবার এনসিপির দুই কেন্দ্রীয় নেতার গাড়ি লক্ষ্য করে ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং এক নেতাকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে ডাকা গতকালের বিক্ষোভ কার্যত পণ্ড হয়েছে। হবিগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি করতে চাইলেও এনসিপির নেতা–কর্মীরা পুলিশি বাধার মুখে পড়েন।
গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের পথে রওনা দেন এনসিপির নেতারা। সোয়া পাঁচটার দিকে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের বাহুবলে ঢোকার পর তাঁরা আবারও পুলিশি বাধার মুখে পড়েন।
এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা তখন সড়কে অবস্থান নেন।
সেখানে পুলিশের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা বাগ্বিতণ্ডা শেষে রাত নয়টার দিকে এনসিপির নেতারা ওই এলাকা ছেড়ে যান। তবে তার আগে রাত আটটার দিকে তাঁরা বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় বিচার দাবি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে হবিগঞ্জ টাউন হলের সামনে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি ও সমাবেশ হয়। এতে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন। সমাবেশ শেষে নাসীরুদ্দীনের গাড়িবহর হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা দিলে স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে সার্কিট হাউসে নিয়ে যান।

এর কিছুক্ষণ পর পেছনে থাকা সারজিসের গাড়িকে ধাওয়া দেওয়াসহ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে তাঁর গাড়ি শহরের সোনালী ব্যাংক ভবনে আশ্রয় নেয়। খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ব্যাংক ভবনটির সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। এরপর রাত আটটার দিকে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। পরে রাতে হবিগঞ্জেই ছিলেন সারজিস এবং নাসীরুদ্দীন চলে যান মৌলভীবাজারে।
ওই হামলার ঘটনার প্রতিবাদে হবিগঞ্জ পৌর শহরে গতকাল বেলা তিনটায় সমাবেশের ডাক দিয়েছিল এনসিপি। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এর মধ্যেই হবিগঞ্জের সমাবেশস্থলের দিকে রওনা হন এনসিপির নেতারা।
পুলিশি বাধায় এনসিপির গাড়িবহর
হবিগঞ্জে বিক্ষোভ সমাবেশে যাওয়ার পথে বিকেল চারটায় শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও এলাকায় চা-কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এনসিপির নেতাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। ওই গাড়িবহরে নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলম ছাড়াও দলের মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নারী শক্তির সদস্যসচিব মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে এনসিপির নেতাদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার উদ্দেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য থ্রেট (হুমকি) কারা? আপনি তাদের না ধরে আমাদের রাস্তা আটকাচ্ছেন? আপনি হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা দিসেন, শ্রীমঙ্গলের রাস্তা আটকাচ্ছেন? আপনি আনলফুল (বেআইনি) কাজ করতেসেন।’
তখন একজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, তাঁদের সীমানা পার হলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তখন হাসনাত বলেন, ‘আপনি যদি পারেন সিকিউরিটি দিবেন, যদি না পারেন তাহলে আমরা আমাদের দায়িত্ব নিয়ে চলে যাব।’
ব্যারিকেডের সামনে সারজিস আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘বিএনপি সরকার এখন প্রশাসনকে আবার আওয়ামী লীগের মতো ব্যবহার করবে। ওয়ান ফোরটিফোরের (১৪৪ ধারা) ধারেকাছেও যাইনি, আমাদেরকে আটকায়ে দিসে।’
ঘণ্টাখানেক বাগ্বিতণ্ডা শেষে বিকেল পাঁচটার দিকে ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জের পথে রওনা হন এনসিপির নেতারা। সোয়া পাঁচটার দিকে বহরটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের বাহুবলের কামাইছড়া এলাকায় পৌঁছানোর পর আবারও পুলিশি বাধার মুখে পড়ে।

একপর্যায়ে এনসিপি নেতারা সড়কেই অবস্থান নেন। সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কে একটি বাস আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছে। এনসিপির নেতারা বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় অবস্থান করছেন। এ সময় তাঁরা ‘বাহ্ পুলিশ চমৎকার, স্বৈরাচারের তাঁবেদার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। বাসের সামনে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ ও স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) দুই শতাধিক সদস্য।
একজনের চোখে গুরুতর আঘাত
মঙ্গলবার ছাত্রদল–যুবদলের নেতা–কর্মীদের হামলার ঘটনায় এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সংগঠক আলিফ চৌধুরী চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাঁর চোখে রড দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে এনসিপি অভিযোগ করেছে।
আহত আলিফকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল ঢাকা এনে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁকে দেখতে এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল হাসপাতালে যায়। সেই দলে থাকা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, আলিফের বাঁ চোখে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। অনেক ফ্লুইড বের হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (আজ) সকালে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার হবে।’ ডান চোখেও আলিফ ঝাপসা দেখছেন বলে জানান মনিরা শারমিন।
জুলাই পদযাত্রায় যত বাধা–হামলা
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ শিরোনামে জেলায় জেলায় পদযাত্রা করছে এনসিপি। ৬ জুলাই বিকেলে গাজীপুরের কালীগঞ্জে পদযাত্রার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়।
পদযাত্রা করতে গিয়ে এই প্রথম হবিগঞ্জে বড় হামলা–বাধার মুখে পড়ল এনসিপি। এর আগে ২৭ জুলাই এনসিপির পদযাত্রার দিন মেহেরপুর শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তারে দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত কুশপুত্তলিকাসদৃশ বস্তু ঝুলতে দেখা যায়। মেহেরপুরের সমাবেশস্থলের কাছ থেকে একটি বোমাসদৃশ বস্তুও উদ্ধার করে পুলিশ। তারও আগে, কর্মসূচি শুরুর দিন ৬ জুলাই রাতে ঢাকার সাভারে এনসিপির পদযাত্রা–পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে ওই ককটেল হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে এনসিপি। এ ঘটনায় যুবলীগের দুই নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।