২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই আমরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করেছি আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন করি রাষ্ট্রনায়ককে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে কখনো চলেছে প্রধানমন্ত্রীর শাসন, আবার কখনো প্রেসিডেন্টের শাসন। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই চলে এমন নিয়মে। তবে পৃথিবীতে এমন একটি দেশ আছে, যেখানে রয়েছে একাধিক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী।
শুনতে অবাক লাগলেও, এমনটি রয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায়। মূল গল্পে ঢোকার আগে জানিয়ে রাখা ভালো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা কোনো আলাদা দুটি দেশ নয়, বরং একটি দেশ। দেশটির প্রধান দুই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অঞ্চলের নামেই নামকরণ করা হয়েছে এই দেশের।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় রয়েছে তিনজন প্রেসিডেন্ট। প্রশ্ন জাগতেই পারে—কেন এই আশ্চর্য পদ্ধতিতে চলছে দেশটি? উত্তর লুকিয়ে আছে দেশটির রক্তাক্ত ইতিহাসে।
দেশটি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছর ধরে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বসনিয়াক, সার্ব ও ক্রোয়াট—এই তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে চলা ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারায় লক্ষাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হন অনেকে। ১৯৯৫ সালের ডেটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয় এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী এককভাবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সেই লক্ষ্যেই গঠন করা হয় তিন সদস্যের প্রেসিডেন্সি। তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর একজন করে মোট তিনজন প্রতিনিধিত্ব করেন, যাঁরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তাঁরা সবাই সমান ক্ষমতার অধিকারী এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পালাক্রমে প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ সেখানে সরকারপ্রধান হিসেবে কোনো একক ব্যক্তি নেই; বরং রাষ্ট্র পরিচালিত হয় যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে।
শুধু তা-ই নয়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে এক অনন্য ব্যবস্থা। দেশটিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রয়েছে দুটি স্বায়ত্তশাসিত সত্তা, একটি বিশেষ প্রশাসনিক জেলা এবং ১০টি ক্যান্টনের নিজস্ব সরকার। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি স্তরের সরকারপ্রধান আলাদা। সব মিলিয়ে গণনা করলে দেশটিতে রয়েছে মোট ১৪ জন সরকারপ্রধান।
এমন অদ্ভুত রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী সহজে অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। তা ছাড়া, এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সব জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারকে।
তবে এর বেশ কিছু অসুবিধাও রয়েছে। বহু স্তরের প্রশাসন ও একাধিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণেও অনেক সময় উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত আটকে যায়।
পৃথিবীতে আমাদের অজানা এমন অনেক অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে, যার মধ্যে এই দেশটির শাসনব্যবস্থা একটি।