এ বছর প্রযুক্তিপ্রেমীদের সব কৌতূহল কেবল একটি ফোনকে ঘিরে। ফোনটি হলো অ্যাপলের ‘আইফোন ১৮’। এখনো উন্মোচনের প্রায় দুই মাস বাকি থাকলেও আলোচিত এ ফোন নিয়ে তথ্য ফাঁস থেমে নেই। ফোনটির মূল নকশা ইতিমধ্যেই ফাঁস হয়ে গেছে। ফাঁস হয়েছে এর ভেতরের শক্তিশালী চিপসেটের বিবরণও। ক্যামেরায় বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি এর আকাশচুম্বী দাম নিয়েও নতুন তথ্য জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই আইফোনের প্রো ম্যাক্সের দাম প্রায় দুই লাখ টাকা হতে পারে। এমনকি এটি কবে বাজারে আসবে, জানা গেছে সে তথ্যও।
আকাশচুম্বী দাম
আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স হতে যাচ্ছে অ্যাপলের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্মার্টফোন। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ফোনঅ্যারেনা তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। চীনের টেক–বিষয়ক তথ্য ফাঁসকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্মার্ট পিকাচু’ জানিয়েছে, চীনে আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের প্রারম্ভিক মূল্য ১১ হাজার ইউয়ান থেকে শুরু হতে পারে। ডলারে রূপান্তর করলে এর দাম দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬২৫ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় কর ও শুল্ক বাদে এর দাম পড়বে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকার বেশি।
অন–ডিভাইস এআই চালানোর জন্য এই অতিরিক্ত র্যামের প্রয়োজন ছিল। এর ফলে আইফোন ১৮ প্রো–এর কাজের গতি অনেক বাড়বে। এটি চোখের পলকে স্ক্রিনে চলমান যেকোনো বিষয় স্ক্যান করতে পারবে।
এই আকাশচুম্বী দামের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো, চিপসেট তৈরিতে ব্যবহৃত ২ ন্যানোমিটার ওয়াফারের অতি উচ্চ মূল্য। দ্বিতীয় কারণ হলো, ১২ জিবি উচ্চ গতির র্যামের ক্রমবর্ধমান বাজারদর। এই দুটি যন্ত্রাংশের চড়া দামের কারণে অ্যাপলকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তবে প্রিমিয়াম গ্রাহকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে অ্যাপল তাদের পুরো লাইনআপ নতুনভাবে সাজাচ্ছে। তারা প্লাস মডেল বন্ধ করে দিয়ে অত্যন্ত পাতলা নকশার ‘আইফোন এয়ার’ বাজারে এনেছে। এ ছাড়া প্রো ম্যাক্স মডেলটিকে তৈরি করছে চরম শক্তিশালী এক মোবাইল ওয়ার্কস্টেশন হিসেবে।
টাটা গ্রুপের তথ্য ফাঁস
অ্যাপল তাদের নতুন ফোনের তথ্যের ব্যাপারে সব সময় কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখে। এটি তাদের ব্যবসার অন্যতম প্রধান কৌশল। তবে এবার সেই নিরাপত্তা দুর্গে বড় ফাটল ধরেছে। ভারতের টাটা ইলেকট্রনিকসের সার্ভারে বড় একটি সাইবার হামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ এই হামলা চালিয়েছে। তারা টাটা ইলেকট্রনিকসের হোসুর কারখানার সার্ভার হ্যাক করেছে। হ্যাকাররা সেখান থেকে প্রায় ৬৩০ গিগাবাইট অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য চুরি করেছে। পরে তারা সেসব তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে দেয়। এসব ফাইলের মধ্যে আইফোন ১৮ প্রোর আসল ব্লু–প্রিন্ট বা থ্রিডি নকশাও রয়েছে।

ফাইলগুলোয় আরও রয়েছে বিভিন্ন পার্টস সরবরাহকারীদের তালিকা। এমনকি ফোনটির ড্রপ–টেস্টের বাস্তব ছবিও ফাঁস হয়ে গেছে। অ্যাপল তাদের আইফোনের উৎপাদনব্যবস্থা চীন থেকে ভারতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের টাটা গ্রুপের কারখানায় এই উৎপাদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছিল। ঠিক এ সময়েই এই মারাত্মক বিপর্যয় ঘটল। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ও অ্যাপলের নিজস্ব দল ইতিমধ্যে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
২ ন্যানোমিটারের প্রসেসর
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের প্রধান আকর্ষণ হতে যাচ্ছে এর প্রসেসর। ফোনটিতে পরবর্তী প্রজন্মের ‘এ২০ প্রো’ চিপসেট ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ম্যাকরিউমারস এ তথ্য জানিয়েছে। তাইওয়ানের চিপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি এই প্রসেসর তৈরি করছে। এটি বিশ্বের প্রথম ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি চিপ।
চিপের ন্যানোমিটারের মাপ যত ছোট হয়, এর কার্যক্ষমতা তত বাড়ে। ২ ন্যানোমিটার চিপে ট্রানজিস্টরের ঘনত্ব বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এতে অ্যাপল প্রথমবারের মতো ‘জিএএ’ বা গেট–আউট–অ্যারাউন্ড ন্যানোশিট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তিতে ট্রানজিস্টরের গেট চারদিক থেকে চ্যানেলটিকে ঘিরে রাখে। এর ফলে বিদ্যুৎ অপচয় প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
ক্যামেরা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আইফোন ১৮ প্রো ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। অ্যাপল বিশ্লেষক মিং–চি কুও এই বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। প্রযুক্তি সাইট ম্যাকরিউমারসও এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
এই নতুন প্রযুক্তির কারণে আইফোন ১৮ প্রো–এর কাজের গতি অনেক বাড়বে। এটি বর্তমানের ফোনের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি দ্রুত কাজ করতে পারবে। একই সঙ্গে এর ব্যাটারি সাশ্রয় হবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এটি স্মার্টফোনের প্রসেসর প্রযুক্তিতে এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
১২ জিবি র্যাম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
অ্যাপল সাধারণত তাদের ফোনে বেশি র্যাম ব্যবহার করে না। যেখানে অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলো ১২ বা ১৬ জিবি র্যাম ব্যবহার করে, সেখানে অ্যাপল এত দিন ৮ জিবি র্যামে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে সেই প্রথা ভাঙছে। ম্যাকরিউমারস জানিয়েছে, আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেলে প্রথমবারের মতো ১২ জিবি র্যাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই বিশাল র্যাম ব্যবহারের পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। আইওএস ২৭ অপারেটিং সিস্টেমে অনেক নতুন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সুবিধা থাকবে। এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’। এর সঙ্গে থাকবে অত্যন্ত উন্নত ‘সিরি এআই’। ইন্টারনেটের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ফোনের ভেতরে এই এআই মডেলগুলো চলবে।
অন–ডিভাইস এআই চালানোর জন্য এই অতিরিক্ত র্যামের প্রয়োজন ছিল। এর ফলে আইফোন ১৮ প্রো–এর কাজের গতি অনেক বাড়বে। এটি চোখের পলকে পর্দায় চলমান যেকোনো বিষয় স্ক্যান করতে পারবে এবং এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীকে তাৎক্ষণিক ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সমাধান দিতে পারবে।
ক্যামেরায় ডিএসএলআরের ছোঁয়া
ক্যামেরা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আইফোন ১৮ প্রো ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। অ্যাপল বিশ্লেষক মিং–চি কুও এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। প্রযুক্তি সাইট ম্যাকরিউমারসও এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্সের প্রধান ৪৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় যুক্ত হচ্ছে ‘ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার’ বা পরিবর্তনশীল লেন্সের মুখ।
স্মার্টফোনের ক্যামেরায় লেন্সের মুখটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মাপে স্থায়ী থাকে। কিন্তু আইফোন ১৮ প্রো–তে যান্ত্রিকভাবে এই লেন্সের মুখটি ছোট–বড় করা যাবে। আমাদের চোখের মণি যেমন তীব্র আলোতে সংকুচিত হয় এবং অন্ধকারে প্রসারিত হয়, এই যান্ত্রিক লেন্সের কাজও হবে ঠিক তেমন। এর ফলে ব্যবহারকারীরা দুটি বড় সুবিধা পাবেন। প্রথম সুবিধাটি হলো সিনেমার মতো উন্নত ভিডিও। কড়া রোদে ভিডিও করার সময় অতিরিক্ত আলোর কারণে আইফোনের ভিডিও অনেক সময় কৃত্রিম দেখায়। পরিবর্তনশীল লেন্সের মুখটি ছোট করে দিলে ভিডিওতে সিনেমার মতো অত্যন্ত মসৃণ মোশন ব্লার পাওয়া যাবে।
চিপের ন্যানোমিটারের মাপ যত ছোট হয়, এর কার্যক্ষমতা তত বাড়ে। ২ ন্যানোমিটার চিপে ট্রানজিস্টরের ঘনত্ব বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এতে অ্যাপল প্রথমবারের মতো ‘জিএএ’ বা গেট–আউট–অ্যারাউন্ড ন্যানোশিট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
দ্বিতীয় সুবিধাটি হলো প্রাকৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার। কোনো ধরনের সফটওয়্যার বা পোর্ট্রেট মোডের সাহায্য ছাড়াই ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড প্রাকৃতিকভাবে অস্পষ্ট বা ব্লার করা সম্ভব হবে। লেন্সের অ্যাপারচার এফ/১.৪–এ সেট করে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
কোরিয়ান সংবাদমাধ্যম ইটি নিউজ জানিয়েছে, লেন্স সরবরাহের জন্য ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে বিখ্যাত লেন্স নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সানি অপটিক্যাল ও এলজি ইনোটেক। এ ছাড়া এবার প্রধান ক্যামেরার পাশাপাশি আলট্রা–ওয়াইড ও ৫ গুণ অপটিক্যাল জুমের টেলিফটো লেন্স দুটিকেও ৪৮ মেগাপিক্সেলে উন্নীত করা হচ্ছে।
ডায়নামিক আইল্যান্ডের সংকোচন
আইফোনের ডিসপ্লের ওপরের চওড়া কাটআউট বা ‘ডায়নামিক আইল্যান্ড’ অনেক ব্যবহারকারীর কাছেই বিরক্তির কারণ। আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে এই ডায়নামিক আইল্যান্ড প্রায় ৩৫ শতাংশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। ম্যাকরিউমারসের তথ্য অনুযায়ী, ফেস আইডির মূল ইনফ্রারেড ও ফ্লাড ইলুমিনেটর সেন্সর দুটিকে এবার ওএলইডি ডিসপ্লের নিচে বা স্ক্রিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে ডায়নামিক আইল্যান্ডের চওড়া মাপ ২০.৭৬ মিলিমিটার থেকে কমে মাত্র ১৩.৪৯ মিলিমিটারে নেমে আসবে।
ফোনের বডির ক্ষেত্রেও আসছে বড় পরিবর্তন। আইফোন ১৫ বা ১৬ সিরিজের ম্যাট ফিনিশের টাইটানিয়ামের পরিবর্তে অ্যাপল এবার ব্যবহার করছে ‘গ্রেড ৫’ পলিশড টাইটানিয়াম। এবারের মডেলটি ওজনে অত্যন্ত হালকা এবং সাধারণ টাইটানিয়ামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি স্ক্র্যাচ প্রতিরোধী হবে। এর সঙ্গে নতুন রং হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ‘স্যাটিন গোল্ড’ ও ‘ডিপ প্লাম’ (গাঢ় বেগুনি)।
ব্যাটারিতে নতুন প্রযুক্তি ও দ্রুত চার্জিং
ব্যাটারির স্থায়িত্ব বাড়াতে অ্যাপল এবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তারা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি প্রযুক্তির আদলে ‘স্ট্যাকড ব্যাটারি সেল’ প্রযুক্তি নিয়ে আসছে। ফোনঅ্যারেনার এক প্রতিবেদন অনুসারে, আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সে থাকছে ৫ হাজার ৫৬৭ মিলিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ারের একটি বিশাল ব্যাটারি। এটি আইফোনের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্যাটারি। স্ট্যাকড সেল প্রযুক্তির কারণে ব্যাটারির আকার খুব বেশি বড় না করেই এর শক্তি বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি চার্জিংয়ের গতিও বাড়ানো হচ্ছে। এবার টাইপ–সি পোর্টের মাধ্যমে আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ ৪০ ওয়াট পর্যন্ত তারযুক্ত চার্জিং ও ২০ ওয়াট পর্যন্ত ম্যাগসেফ চার্জিং সমর্থন করবে।
ফোর্বসের নিখুঁত দিনপঞ্জি, কবে আসছে বাজারে
ফোর্বস ম্যাগাজিনের জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি লেখক ডেভিড ফেলান গত ১৫ বছরের অ্যাপলের ইভেন্ট টাইমলাইন বিশ্লেষণ করে একটি নিখুঁত সময়সূচি প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার ‘লেবার ডে’ বা শ্রম দিবস পালিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী অ্যাপল কখনোই এই ছুটির দিন বা তার ঠিক পরের মঙ্গলবারে বড় কোনো ইভেন্ট আয়োজন করে না। এ বছর লেবার ডে পড়েছে ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার।
ফোর্বস জানিয়েছে, এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার প্যাসিফিক সময় সকাল ১০টায় অ্যাপলের মূল উন্মোচন অনুষ্ঠান বা ‘কি–নোট’ ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্সের পর্দা উন্মোচন করবেন অ্যাপলের সিইও টিম কুক। আইফোন ১৮–এর প্রি–অর্ডার শুরু হবে ১১ সেপ্টেম্বরে, আর বিশ্বজুড়ে এর বিক্রি শুরুর কথা রয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ফোর্বস, আল–জাজিরা, ম্যাকরিউমারস, ফোনঅ্যারেনা ও ম্যাশেবল থেকে নেওয়া।