সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪৫ বছর ধরে শিক্ষকতা
এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪৫ বছর ধরে শিক্ষকতা

এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪৫ বছর ধরে শিক্ষকতা

মোক্তার হোসেনের একটি পা অকার্যকর। হাঁটতে হয় লাঠির ওপর ভর দিয়ে। একটি হাতও স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল। তবু জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। শিক্ষার্থীদের পড়াতে প্রতিদিনই সাইকেল নিয়ে বের হন তিনি। প্রায় ৪৫ বছর ধরে পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন তিনি।

এখন বয়স ৬৫ হলেও থামেনি মোক্তারের পথচলা। তাঁর জীবন যেন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক দীর্ঘ গল্প। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ডান পা অকার্যকর হয়ে যায়। একই সঙ্গে তাঁর ডান হাতও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই বয়সে অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন মোক্তারকে শিখতে হয়েছে কীভাবে একটি পা নিয়েই জীবনের সঙ্গে চলতে হয়।

হাঁটাচলার জন্য কোনো ক্রাচ কেনার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। তাই একটি লাঠিই হয়ে ওঠে মোক্তারের চলার ভরসা। সেই লাঠিতে ভর দিয়েই শুরু হয় তাঁর স্কুলে যাওয়া। প্রতিবন্ধকতা কখনো তাঁর পড়াশোনার আগ্রহ কমাতে পারেনি; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে তাঁর রোল থাকত সেরা ১০–এর মধ্যে।
স্বপ্ন ছিল বড়। পড়াশোনা শেষ করে ভালো কোনো সরকারি চাকরি করবেন, পরিবারকে অভাব থেকে মুক্ত করবেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা মোক্তারের সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র, তখন তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে তাঁদের পরিবার থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে যান। তখন সংসারে ছিল তিন ভাই ও আট বোন। বাবার সহযোগিতা না থাকায় সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁদের ওপর। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই তাঁকে সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়।

শিক্ষার্থীদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সাইকেল নিয়ে রওনা দিচ্ছেন মোক্তার হোসেন। সম্প্রতি বেড়া পৌর এলাকার শাহপাড়ায়

বন্ধ হয়ে যায় মোক্তারের পড়াশোনা। স্বপ্ন থেমে যায়, কিন্তু দায়িত্ব থামেনি। সংসার চালাতে তিনি ছোট একটি মুদিদোকান শুরু করেন। দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আট বোনকে বিয়ে দেওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা, অভাবের সঙ্গে লড়াই করা—সবই করতে হয়েছে তাঁকে। মুদিদোকান চালানোর পাশাপাশি একসময় আশপাশের দু-একজন শিক্ষার্থীকে পড়ানো শুরু করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিলেন বলে পড়ানোর প্রতি তাঁর আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল। ধীরে ধীরে এলাকায় তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দোকান ছেড়ে পুরোপুরি প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন।

তবে এই পথও সহজ ছিল না। তিনি যেহেতু দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তাই মূলত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ছিল দরিদ্র পরিবারের। ফলে আয়ও ছিল সীমিত। বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতে হতো তাঁকে। লাঠিতে ভর দিয়ে এক পায়ে হাঁটা তাঁর জন্য কষ্টকর ছিল। রিকশায় যাতায়াত করার সামর্থ্যও ছিল না। তখনই একটি সাইকেল জোগাড় করেন তিনি। শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম।

এক পায়ে সাইকেল চালানো শেখা মোক্তারের জন্য ছিল কঠিন পরীক্ষা। প্রথম দিকে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে বহু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু চেষ্টা আর আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মানে কঠিন বাস্তবতাও। ধীরে ধীরে তিনি আয়ত্ত করেন এক পায়ে সাইকেল চালানোর কৌশল। একপর্যায়ে সাইকেলই হয়ে ওঠে তাঁর চলার সঙ্গী। প্রায় ৪৫ বছর ধরে লাঠি সঙ্গে নিয়ে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। সাইকেল চালানোর সময় লাঠিটি থাকে তাঁর পাশে, আর হাঁটার সময় সেই লাঠিই আবার তাঁর অবলম্বন।

মোক্তার হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। পড়াশোনা করে ভালো কিছু করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সংসারের দায়িত্বের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। তবে কখনো থেমে যাইনি। যত দিন শরীর চলে, তত দিন শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে যেতে চাই। আমার কষ্টের জীবন থেকে যদি কেউ সাহস পায়, সেটাই আমার বড় পাওয়া।’

প্রাইভেট পড়ানোর আয় দিয়েই চলে মোক্তারের সংসার। আগে মাসে ৮ থেকে ১০টি বাড়িতে পড়াতে পারলেও বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো পারেন না। বর্তমানে পাঁচ-ছয়টি বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান। টিউশনির জন্য নির্দিষ্ট কোনো বেতন তিনি ঠিক করে দেন না। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী যে যতটুকু দেন, সেটিই হাসিমুখে গ্রহণ করেন। এভাবেই মাসে তাঁর আয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই কোনোরকমে চলে তাঁর সংসার।

মোক্তার থাকেন একটি জীর্ণ টিনের ঘরে। অভাব এখনো তাঁর জীবনের সঙ্গী। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। সারা জীবন প্রাইভেট পড়িয়ে জমানো টাকা এবং ধারদেনা করে ছেলেকে সিঙ্গাপুরে শ্রমিকের কাজে পাঠিয়েছেন।

মোক্তারের স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, ‘আমাদের সংসারে অভাব সব সময়ই ছিল। কিন্তু আমার স্বামী কখনো হাল ছাড়েননি। শরীরের কষ্ট, সংসারের চিন্তা—সবকিছু নিয়েই তিনি দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন। তাঁর এই পরিশ্রম নিয়ে আমি গর্ব করি।’

মোক্তারের ছাত্রদের একজন বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মোক্তার স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছি। তাঁর কাছ থেকে শুধু পড়াশোনা নয়, পরিশ্রম ও সাহসের শিক্ষাও পেয়েছি। নিজের জীবনের অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও তিনি অন্যের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করে চলেছেন। একটি পা, একটি সাইকেল আর অসীম মনোবল নিয়ে তাঁর এই পথচলা আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষকের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি হার না–মানা জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।’

About Editor Todaynews24

Check Also

সংরক্ষিত বনে উজাড় হচ্ছে হাতির খাবারের উৎস বাঁশবাগান

সংরক্ষিত বনে উজাড় হচ্ছে হাতির খাবারের উৎস বাঁশবাগান

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি সংরক্ষিত বনের প্রায় ৮ একরের একটি বাঁশবাগানের একাংশ উজাড় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় লোকজনের দাবি, এটি বন্য হাতির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎস। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাঁশবাগান ধ্বংস হলে হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসবে। এতে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়বে।চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনে অবস্থিত বাঁশবাগান উজাড় হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান, বাগানটি দীর্ঘদিন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *