মানুষের এগিয়ে চলার মূলে আছে উদ্ভাবন। এটিই আমাদের সৃজনশীল মনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য প্রকৃতির শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো। চিন্তাশক্তির মাধ্যমে প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু একজন উদ্ভাবকের পথ সহজ নয়। তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় তিনি প্রাপ্য স্বীকৃতিও পান না। ভুল বোঝাবুঝি ও অবহেলাও সঙ্গী হয় তাঁর। তবু নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারার আনন্দই তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তিনি সেই সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন, যাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা না থাকলে মানবসভ্যতা এত দূর এগোতে পারত না।
আমার নিজের জীবনেও সেই আনন্দের অভাব ছিল না; বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পেয়েছি। বহু বছর ধরে আমি যেন একধরনের মুগ্ধতার মধ্যেই বেঁচে ছিলাম। অনেকে আমাকে খুব পরিশ্রমী মানুষ বলে। চিন্তাকেই যদি পরিশ্রম ধরা হয়, তাহলে হয়তো কথাটি সত্যি। কারণ, জেগে থাকা প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই আমি চিন্তা করে কাটিয়েছি। কিন্তু কাজ বলতে যদি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে কোনো দায়িত্ব পালন করাকে বোঝায়, তাহলে হয়তো অলসদের তালিকায় আমার নামই সবার আগে থাকবে। বাধ্য হয়ে কোনো কাজ করতে আমার কখনোই ভালো লাগেনি। আমি সব সময় নিজের চিন্তাশক্তির ওপর ভরসা করেছি। সেই চিন্তাই আমাকে পথ দেখিয়েছে, আনন্দ দিয়েছে এবং জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো এনে দিয়েছে।
আমার নিজের জীবনেও সেই আনন্দের অভাব ছিল না; বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পেয়েছি। বহু বছর ধরে আমি যেন একধরনের মুগ্ধতার মধ্যেই বেঁচে ছিলাম।
ইলেকট্রিক্যাল এক্সপেরিমেন্টারের সম্পাদকদের অনুরোধে, বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের কথা ভেবেই আমি এই লেখাগুলো লিখছি। এখানে আমি আমার জীবনের ঘটনাগুলো যতটা সম্ভব সত্য ও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরব। তাই আমাকে ফিরে যেতে হবে শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে। আবার মনে করতে হবে সেই সব ঘটনা, মানুষ আর অভিজ্ঞতার কথা, যেগুলো আমার জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জীবনের একেবারে শুরুর দিকের চেষ্টাগুলো আসে সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। সেগুলোকে চালিত করে কল্পনা, যার তখনো কোনো লাগাম থাকে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়। তখন আমরা আরও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে শিখি। তবু শৈশবের সেই প্রথম দিকের প্রবণতাগুলোকে কখনোই তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়। সেগুলো হয়তো তখনই কোনো ফল দেয় না, কিন্তু ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়। আজ মনে হয়, ছোটবেলাতেই যদি আমার সেই প্রবণতাগুলোকে ঠিকভাবে বুঝতে পারতাম এবং বিকশিত করার সুযোগ পেতাম, তাহলে মানবজাতির জন্য আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। কিন্তু বড় হওয়ার আগে আমি নিজেই বুঝতে পারিনি, আমার ভেতরে একজন উদ্ভাবক লুকিয়ে আছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, আমার এক বড় ভাই ছিল ডেন। সে ছিল অসাধারণ মেধাবী। ১২ বছর বয়সেই সে মারা যায়। সেই শোক থেকে আমার মা-বাবা আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি।
জীবনের একেবারে শুরুর দিকের চেষ্টাগুলো আসে সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। সেগুলোকে চালিত করে কল্পনা, যার তখনো কোনো লাগাম থাকে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়।
আমাদের একটি অসাধারণ অ্যারাবিয়ান ঘোড়া ছিল। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেটি উপহার দিয়েছিল। প্রাণীটি ছিল যেমন সুন্দর, তেমন বুদ্ধিমান। পরিবারের সবাই ওকে খুব ভালোবাসত। একবার ঘোড়াটা এমন একটি কাজ করেছিল, যা না হলে আমার বাবার জীবনই হয়তো রক্ষা পেত না।
এক শীতের রাতে জরুরি কাজে বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। নেকড়ের উপদ্রবে ভরা সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় হঠাৎ আতঙ্কে শিউরে উঠে ঘোড়াটি উন্মাদের মতো ছুট লাগাল। বাবা ছিটকে পড়েন বরফঢাকা মাটিতে। কিছুক্ষণ পর ঘোড়াটি একাই বাড়িতে ফিরে আসে। তখন ঘোড়ার সারা শরীরে ক্লান্তির ছাপ, আচরণে স্পষ্ট অস্থিরতা। সবাই বুঝতে পারে, কিছু একটা ঘটেছে। বাড়ির লোকজন বেরিয়ে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, ঘোড়াটিই সবাইকে পথ দেখিয়ে আবার ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা বাবাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায়। জ্ঞান ফেরার পর ঘোড়ায় চেপে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা তিনি বরফের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। এই ঘোড়াটির কারণেই পরে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল। ঘোড়াটির জোর ধাক্কায় মারাত্মক আহত হয়েছিল আমার ভাই। সেই আঘাতের ফলেই পরে তার মৃত্যু হয়। সেই দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। আজ ছাপ্পান্ন বছর পেরিয়ে গেছে, তবু সেই ঘটনার স্মৃতি আমার চোখে একদম স্পষ্ট, একটুও ম্লান হয়নি। আমার ভাইয়ের অসাধারণ প্রতিভা ও কৃতিত্বের কথা মনে হলে নিজের যেকোনো সাফল্যই আমার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতো।
এক শীতের রাতে জরুরি কাজে বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। নেকড়ের উপদ্রবে ভরা সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় হঠাৎ আতঙ্কে শিউরে উঠে ঘোড়াটি উন্মাদের মতো ছুট লাগাল।
আমি যতই ভালো কিছু করি না কেন, তা যেন বাবা-মায়ের মনে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ছেলের শোক আরও গভীর করে তুলত। ফলে ছোটবেলা থেকেই নিজের প্রতি আমার খুব একটা আস্থা ছিল না। তবে আমাকে যে একেবারে নির্বোধ ছেলে মনে করা হতো, তা নয়। একটি ছোট্ট ঘটনা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।
এক দিন শহরের কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে আমি অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলাম। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এক ধনী ভদ্রলোক আমাদের প্রত্যেককে একটি করে রুপার মুদ্রা দিচ্ছিলেন। আমার সামনে এসে তিনি থেমে গেলেন। আমার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার চোখের দিকে তাকাও।’
কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাটি পাওয়ার আশায় আমি হাত বাড়িয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু তিনি মুদ্রাটি সরিয়ে নিয়ে হেসে বললেন, ‘না, তোমাকে এটা দিতে পারি না। তুমি বড়ই চালাক ছেলে!’
আমাকে নিয়ে আরেকটি মজার গল্প আমাদের পরিবারে বেশ প্রচলিত ছিল। আমার দুই বয়স্ক খালা ছিলেন। দুজনের মুখেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তাঁদের একজনের হাতির দাঁতের মতো সাদা দুটি দাঁত ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে থাকত। তিনি যখনই আমাকে আদর করে চুমু দিতেন, দাঁত দুটি আমার গালে বিঁধে যেত। ফলে এই স্নেহশীল কিন্তু দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় নয়, এমন দুই খালার কোলে যেতে হবে—এর চেয়ে ভয়ের আর কিছু আমার কাছে ছিল না।
কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাটি পাওয়ার আশায় আমি হাত বাড়িয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু তিনি মুদ্রাটি সরিয়ে নিয়ে হেসে বললেন, ‘না, তোমাকে এটা দিতে পারি না। তুমি বড়ই চালাক ছেলে!’
এক দিন আমি মায়ের কোলে বসেছিলাম। তখন তাঁরা মজা করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বল তো, আমাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি সুন্দর?’
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। তারপর একটু ভেবে একজনকে দেখিয়ে বললাম, ‘তিনি অন্যজনের মতো অত কুৎসিত নন।’
এ ছাড়া জন্মের পর থেকেই আমাকে ধর্মযাজক হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। এই চিন্তা আমার মনে সব সময় একধরনের চাপ সৃষ্টি করে রাখত। অথচ আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু বাবা ছিলেন খুব দৃঢ়চেতা মানুষ। সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে সরানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

তিনি ছিলেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর এক অফিসারের সন্তান। তাঁর ভাই ছিলেন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গণিতের অধ্যাপক। তাঁদের দুজনেরই সামরিক শিক্ষা ছিল। কিন্তু পরে বাবা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন। ধর্মযাজক হন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই এ পেশায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি ছিলেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যসম্পন্ন মানুষ। একাধারে প্রকৃতিদার্শনিক, কবি ও লেখক। তাঁর ধর্মোপদেশ ছিল সাবলীল, প্রাণবন্ত এবং বাকপটু। অনেকে সেগুলোর তুলনা করতেন আব্রাহাম আ স্যাঙ্কটা-ক্ল্যারার বক্তৃতার সঙ্গে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য থেকে দীর্ঘ অংশ তিনি অনায়াসে মুখস্থ আবৃত্তি করতে পারতেন। মজা করে প্রায়ই বলতেন, চিরায়ত সাহিত্যের কোনো রচনা যদি এক দিন হারিয়েও যায়, তবে তিনি স্মৃতি থেকে তা হুবহু লিখে দিতে পারবেন।
আমার বাবা ছিলেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর এক অফিসারের সন্তান। তাঁর ভাই ছিলেন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গণিতের অধ্যাপক। তাঁদের দুজনেরই সামরিক শিক্ষা ছিল।
লেখক হিসেবেও আলাদা পরিচিতি ছিল তাঁর। তিনি ছোট ছোট, তীক্ষ্ণ ও ঝরঝরে বাক্যে লিখতেন। তাঁর লেখায় থাকত বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা ও সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। দুটি এমন মিলেমিশে থাকত, যা সহজেই পাঠকের মনে দাগ কাটত। তাঁর রসবোধ ছিল পুরোপুরি নিজস্ব। দুটি ছোট উদাহরণ দিচ্ছি।
আমাদের খামারে কাজ করত ‘মানে’ নামে এক লোক। লোকটি ছিল ট্যারা। এক দিন সে কাঠ কাটছিল। কুঠার তুলে কোপ দিতে যাবে, এমন সময় বাবা তার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন, ‘ঈশ্বরের দোহাই, মানে! যেদিকে তাকিয়ে আছ, সেদিকে কোপ দিও না; যেখানে কোপ দিতে চাও, সেদিকে দাও!’
আরেক দিন তিনি এক বন্ধুকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে বেরিয়েছেন। গল্পে মশগুল হয়ে বন্ধুটি খেয়ালই করেননি যে তাঁর দামি পশমের কোট গাড়ির চাকার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। বাবা শান্তভাবে বললেন, ‘কোটটা একটু ভেতরে টেনে নাও। নইলে আমার গাড়ির টায়ারটাই নষ্ট হয়ে যাবে!’
নিজের সঙ্গে কথা বলার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল তাঁর। কখনো নিজের কণ্ঠস্বর বদলে তিনি এমনভাবে কথোপকথন চালিয়ে যেতেন, শুনে মনে হতো, ঘরে একাধিক লোক আছে। কখনো সেই কথাবার্তা উত্তপ্ত তর্কের রূপ নিত। বাইরে থেকে কোনো অপরিচিত লোক শুনলে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করত, ঘরের ভেতরে অন্তত দু-তিনজন মানুষ আলোচনা করছে।
গল্পে মশগুল বন্ধুটি খেয়াল করেননি যে তাঁর দামি পশমের কোট গাড়ির চাকার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। বাবা শান্তভাবে বললেন, ‘কোটটা একটু ভেতরে টেনে নাও। নইলে আমার গাড়ির টায়ারটাই নষ্ট হয়ে যাবে!’
আমার উদ্ভাবনী ক্ষমতার উত্তরাধিকার আমি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। তবু বাবার দেওয়া শিক্ষাও আমাকে কম সাহায্য করেনি। তিনি নিয়মিত এমন সব অনুশীলন করাতেন, যা স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করত। কখনো আমি আর বাবা একজন আরেকজনের মনের কথা অনুমান করার চেষ্টা করতাম। কখনো কোনো বাক্য বা লেখার ত্রুটি খুঁজে বের করতাম। আবার কখনো দীর্ঘ বাক্য হুবহু মুখস্থ বলে যেতে হতো, কিংবা মনে মনে জটিল অঙ্ক কষতে হতো। এসব অনুশীলনের উদ্দেশ্য ছিল স্মৃতিশক্তি, যুক্তিবোধ ও সূক্ষ্ম বিচারক্ষমতা গড়ে তোলা। আজ বুঝতে পারি, সেগুলো সত্যিই কাজে দিয়েছে।
আমার মা দেশের এক প্রাচীন ও সম্মানিত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। তাঁদের বংশে উদ্ভাবনের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। তাঁর বাবা এবং দাদা দুজনই গৃহস্থালি, কৃষিকাজ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন যন্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরি করেছিলেন। মা ছিলেন অসাধারণ দক্ষ, সাহসী এবং অদম্য মানসিক শক্তির অধিকারী। জীবনে তিনি একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি।

মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বাবা আক্রান্ত মানুষদের শেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন। সেই সময় পাশের একটি পরিবারও মহামারিতে আক্রান্ত হয়। বাবা বাড়িতে না থাকায় মা একাই তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে যান। পরিবারের পাঁচজন সদস্যই অল্প সময়ের ব্যবধানে মারা যান। মা নিজ হাতে তাঁদের শরীর ধুয়ে পরিষ্কার করেন। পোশাক পরিয়ে দেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী ফুল দিয়ে সাজিয়ে সমাধির জন্য প্রস্তুত করে রাখেন। তাঁর বাবা ফিরে এসে দেখেন, খ্রিষ্টীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়ে গেছে।
মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বাবা আক্রান্ত মানুষদের শেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন।
আমার মা জন্মগতভাবেই উদ্ভাবক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধার নাগাল যদি তাঁর হাতে থাকত, তবে তিনি অসাধারণ সব কাজ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তিনি নিজের প্রয়োজনেই নানা রকম যন্ত্র ও সরঞ্জাম বানাতেন। নিজের হাতে কাটা সুতা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন নকশার কাপড় বুনতেন। এমনকি বীজ রোপণ করে সেখান থেকে নিজেই গাছ ফলাতেন, বড় করতেন, তারপর সেই গাছ থেকে আঁশ ছাড়িয়ে সুতা তৈরি করতেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করতেন । আমাদের পরার বেশির ভাগ কাপড়, এমনকি ঘরের অনেক আসবাবও ছিল তাঁর নিজের হাতে তৈরি। ৬০ বছর বয়স পার হওয়ার পরও তাঁর আঙুলের দক্ষতা এতটুকু কমেনি। তিনি অনায়াসে চোখের একটি পাপড়িতে তিনটি গিঁট বেঁধে দেখাতে পারতেন।
তবে আমার ভেতরের উদ্ভাবক সত্তা এত দেরিতে প্রকাশ পাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ছিল। ছোটবেলায় আমি এক অদ্ভুত সমস্যায় ভুগতাম। হঠাৎ হঠাৎ চোখের সামনে নানা রকমের ছবি ভেসে উঠত। প্রায়ই এর সঙ্গে থাকত তীব্র আলোর ঝলকানি। এতে বাস্তব জিনিস দেখা কঠিন হয়ে পড়ত। আমার চিন্তাভাবনা ও কাজের স্বাভাবিক ধারাও ব্যাহত হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এগুলো সবই ছিল এমন দৃশ্য বা বস্তুর ছবি, যা আমি আগে বাস্তবে দেখেছিলাম। কল্পনায় তৈরি কোনো ছবি কখনো এভাবে চোখের সামনে আসত না। কেউ কোনো বস্তুর নাম উচ্চারণ করলেই সেই বস্তুর একটি স্পষ্ট ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। অনেক সময় বুঝতেই পারতাম না, আমি সত্যিই কোনো বাস্তব জিনিস দেখছি, নাকি শুধু সেটার একটি মানসিক প্রতিচ্ছবি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীর অস্বস্তি ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিত।
আমার মা জন্মগতভাবেই উদ্ভাবক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধার নাগাল যদি তাঁর হাতে থাকত, তবে তিনি অসাধারণ সব কাজ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
মনোবিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যার যাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম, তাঁদের কেউই এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ঘটনাটি তাঁদের কাছেও ছিল একেবারে অস্বাভাবিক। তবে আমার ধারণা, এই প্রবণতাটি বংশগত ছিল। কারণ, আমার ভাইয়ের মধ্যেও একই রকম লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনার ফলে মস্তিষ্ক থেকে রেটিনায় সৃষ্টি হওয়া একধরনের প্রতিফলিত স্নায়বিক ক্রিয়ার ফলেই এই ছবিগুলো দেখা দিত। এগুলো কোনোভাবেই অসুস্থ মনের বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন ছিল না। কারণ অন্য সব ক্ষেত্রে আমার বিচারবুদ্ধি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মনও ছিল শান্ত ও স্থির।
আমার কষ্টের মাত্রা বোঝাতে একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আমি কোনো শেষকৃত্য কিংবা তেমন বেদনাদায়ক কোনো দৃশ্য দেখেছি। তারপর রাতের নিস্তব্ধতায় যখন চারদিকে সব শান্ত হয়ে গেল, তখন সেই দৃশ্যের স্পষ্ট ছবি আবার জোর করে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। আমি চোখ বন্ধ করলেও সেটি মিলিয়ে যেত না; বরং মনে হতো, দৃশ্যটি যেন সত্যিই আমার সামনে উপস্থিত।
সেই ছবিগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে থাকত এবং যতই সেগুলো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, ততই যেন আরও স্থির হয়ে ঝুলে থাকত। এমনকি হাত বাড়িয়ে সেগুলোর ভেতরে নাড়ানোর চেষ্টা করলেও অনেক সময় মনে হতো, ছবিগুলো যেন বাতাসে স্থির হয়ে ঝুলে আছে।
অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনার ফলে মস্তিষ্ক থেকে রেটিনায় সৃষ্টি হওয়া একধরনের প্রতিফলিত স্নায়বিক ক্রিয়ার ফলেই এই ছবিগুলো দেখা দিত।
আমার এই ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে মানুষের মনের মধ্যে যে ছবি তৈরি হয়, এক দিন তা কোনো পর্দায় প্রক্ষেপণ করে অন্যদেরও দেখানো সম্ভব হবে। এমন কিছু করা গেলে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরনই আমূল বদলে যাবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এক দিন এই অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হবেই। এ কথাও বলতে পারি, এই সমস্যার সমাধান নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভেবেছি এবং এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি।
দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার যখন এই প্রক্রিয়াটিকে মানসিকভাবে চেষ্টা করে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, তখন ধীরে ধীরে এই উপায়টির কার্যকারিতা কমে আসত। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমার কল্পনা পরিচিত জগতের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে চলে যেত। আমি একের পর এক নতুন দৃশ্য দেখতে শুরু করতাম। প্রথম দিকে সেগুলো ছিল অস্পষ্ট ও ঝাপসা। আমি মনোযোগ দিয়ে দেখতে গেলেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি সেগুলোকে স্থির রাখতে শিখলাম। ক্রমে সেগুলো আরও স্পষ্ট ও জীবন্ত হয়ে উঠত। এমনকি শেষ পর্যন্ত রূপ পেত বাস্তব বস্তুর মতোই।
খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম, আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি মেলে যখন কল্পনার জগতে আরও দূরে, আরও অজানা জায়গায় চলে যাই। একের পর এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। এভাবেই শুরু হলো আমার মানসিক ভ্রমণ। প্রতি রাতে, কখনো কখনো দিনের বেলাতেও যখন একা থাকতাম, আমি কল্পনায় যাত্রা শুরু করতাম। নতুন নতুন শহর, দেশ আর অচেনা জনপদে ঘুরে বেড়াতাম। সেখানে বাস করতাম। মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতাম। বন্ধুত্ব গড়ে তুলতাম। আশ্চর্যের বিষয়, সেই মানুষগুলো আমার কাছে বাস্তব জীবনের মানুষের মতোই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাদের উপস্থিতিও ছিল খুব বাস্তব।
খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম, আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি মেলে যখন কল্পনার জগতে আরও দূরে, আরও অজানা জায়গায় চলে যাই। একের পর এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই।
আমি প্রায় ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবেই চলেছি। তারপর আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে উদ্ভাবন। তখন আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, আমি অবলীলায় মনের মধ্যে যেকোনো কিছু কল্পনা করতে পারি। কোনো মডেল, নকশা বা পরীক্ষার প্রয়োজন হতো না; সবকিছুই আমি মনের চোখে বাস্তবের মতো স্পষ্ট দেখতে পেতাম। এভাবে অজান্তেই আমি উদ্ভাবনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি নতুন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলাম। এটি প্রচলিত পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আমার বিশ্বাস, এটি অনেক বেশি দ্রুত ও কার্যকর।
কেউ যখন একটি অস্পষ্ট ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে যন্ত্র নির্মাণ শুরু করে, তখন অনিবার্যভাবেই সে যন্ত্রটির খুঁটিনাটি ও ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক পরিবর্তন ও উন্নতি করতে গিয়ে তার মনোযোগ ধীরে ধীরে মূল ধারণা থেকে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত হয়তো কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়, কিন্তু প্রায়ই তার জন্য গুণগত মানের সঙ্গে আপস করতে হয়।
আমার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধারণা মাথায় আসা মাত্র আমি তা মনের মধ্যে নির্মাণ করতে শুরু করতাম। তার কাঠামো বদলাতাম। প্রয়োজনমতো উন্নতি করতাম। তারপর কল্পনার মধ্যেই সেটি চালিয়ে দেখতাম। আমার টারবাইন কারখানায় চলছে নাকি শুধু আমার কল্পনায়, এ দুটির মধ্যে আমার কাছে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমনকি সেটি ভারসাম্য রেখে চলছে কি না, তাও আমি নির্ভুলভাবে বুঝতে পারতাম। ফলাফলেও কখনো কোনো পার্থক্য হতো না। কোনো যন্ত্র বাস্তবে তৈরি না করেই আমি এর বিকাশ ঘটাতে, পরিমার্জন করতে এবং চূড়ান্ত রূপ দিতে পারতাম।
আমার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধারণা মাথায় আসা মাত্র আমি তা মনের মধ্যে নির্মাণ করতে শুরু করতাম। তার কাঠামো বদলাতাম। প্রয়োজনমতো উন্নতি করতাম।
যখন নিশ্চিত হতাম যে সম্ভাব্য সব উন্নতিই সম্পন্ন হয়েছে এবং কোথাও আর কোনো ত্রুটি নেই, তখনই সেই মানসিক সৃষ্টিকে বাস্তব রূপ দিতাম। আশ্চর্যের বিষয়, আমার যন্ত্র বাস্তবে ঠিক সেভাবেই কাজ করত, যেভাবে আমি কল্পনা করেছিলাম। পরীক্ষার ফলও আমার প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যেত। ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় এর একটি ব্যতিক্রমও ঘটেনি। ঘটবেই-বা কেন? প্রকৌশল বৈদ্যুতিক হোক বা যান্ত্রিক, তা মূলত নির্ভুল বৈজ্ঞানিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন কোনো সমস্যা নেই, যা গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায় না, কিংবা বিদ্যমান তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক তথ্যের ভিত্তিতে যার ফল আগে থেকে নির্ণয় করা অসম্ভব। তাই কেবল একটি অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে সরাসরি নির্মাণকাজে নেমে পড়াকে আমি সব সময় শক্তি, অর্থ ও সময়ের অপচয় বলেই মনে করেছি।
তবে শৈশবের সেই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার একটি ইতিবাচক দিকও ছিল। নিরবচ্ছিন্ন মানসিক অনুশীলন আমার পর্যবেক্ষণশক্তিকে অসাধারণ করে তুলেছিল। আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল। আমি খেয়াল করলাম, প্রতিটি দৃশ্য বা ছবি মনে আসার আগে কোনো না কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে বাস্তব কোনো বস্তুকে দেখার অভিজ্ঞতা থাকে। তাই প্রতিবারই আমি সেই প্রথম উদ্দীপনাটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রচেষ্টা প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। খুব সহজেই আমি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক খুঁজে পেতে শিখে যাই।
নিরবচ্ছিন্ন মানসিক অনুশীলন আমার পর্যবেক্ষণশক্তিকে অসাধারণ করে তুলেছিল। আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।
অল্পদিনের মধ্যেই বিস্ময়ের সঙ্গে বুঝতে পারলাম, আমার প্রতিটি চিন্তার পেছনেই রয়েছে বাইরের কোনো উদ্দীপনা। শুধু চিন্তাই নয়, আমার প্রতিটি কাজও একইভাবে কোনো না কোনো বাহ্যিক প্রভাব দিয়ে পরিচালিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি আসলে একধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমাত্র, যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এবং সেই অনুযায়ী চিন্তা ও কাজ করে।
এই উপলব্ধিরই ব্যবহারিক ফল ছিল টেলঅটোমেটিকসের ধারণা। যদিও এখন পর্যন্ত এটি খুব সীমিত আকারেই বাস্তবায়িত হয়েছে, তবু এর সুপ্ত সম্ভাবনা এক দিন অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পাবে। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। বহু বছর ধরে আমি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র নিয়ে কাজ করছি। আমার বিশ্বাস, এমন যন্ত্র নির্মাণ করা সম্ভব, যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বুদ্ধিমান সত্তার মতো আচরণ করতে পারবে। সেদিন বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
আমার বয়স যখন প্রায় ১২ বছর, তখন প্রথমবারের মতো আমি ইচ্ছাশক্তির জোরে চোখের সামনে ভেসে ওঠা কোনো দৃশ্য সরিয়ে দিতে সক্ষম হই। কিন্তু যে আলোকচ্ছটার কথা আগে বলেছি, তার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ওগুলোই ছিল সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সবচেয়ে দুর্বোধ্য অভিজ্ঞতা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি আসলে একধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমাত্র, যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এবং সেই অনুযায়ী চিন্তা ও কাজ করে।
সাধারণত আমি যখন কোনো বিপজ্জনক বা অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম অথবা প্রবল আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়তাম, তখনই এই আলোকচ্ছটাগুলো দেখা দিত। কয়েকবার এমনও হয়েছে, আমার চারপাশের পুরো বাতাস যেন আগুনের শিখায় ভরে উঠেছে বলে মনে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর তীব্রতা কমার বদলে আরও বেড়েছে। আমার বয়স যখন পঁচিশ, তখন তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
১৮৮৩ সালে প্যারিসে থাকাকালে একজন খ্যাতনামা ফরাসি শিল্পপতি আমাকে শিকারে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। আমি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। দীর্ঘদিন কারখানার ভেতরে বন্দী থাকার পর খোলা আকাশের নিচে নির্মল বাতাসে বেরিয়ে পড়া আমার শরীর ও মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেদিন রাতে শহরে ফিরে মনে হলো, যেন আমার মস্তিষ্কে আগুন জ্বলছে। আমি এমন একটি আলো দেখছিলাম, যেন মাথার ভেতরে একটি ছোট সূর্য জ্বলছে। সারা রাত মাথায় বরফ-ঠান্ডা পানির জলপট্টি দিয়ে কাটিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আলোকচ্ছটার তীব্রতা ও ঘনত্ব কমতে শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল। পরে দ্বিতীয়বার যখন আবার আমাকে শিকারে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন আমি দৃঢ়ভাবে না বলেছি।
এই উজ্জ্বল আলোকচ্ছটাগুলো এখনও মাঝে মধ্যে দেখা দেয়। বিশেষ করে যখন এমন কোনো নতুন ধারণা মাথায় আসে, যা আমার সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে এখন আর এগুলো আগের মতো তীব্র বা উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এদের শক্তিও অনেকটা কমে এসেছে।
সারা রাত মাথায় বরফ-ঠান্ডা পানির জলপট্টি দিয়ে কাটিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আলোকচ্ছটার তীব্রতা ও ঘনত্ব কমতে শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।
আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন প্রথমেই একটি গাঢ় নীল রঙের পটভূমি দেখতে পাই। অনেকটা মেঘ ছাড়া তারাবিহীন রাতের আকাশের মতো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই নীল পটভূমি অসংখ্য উজ্জ্বল সবুজ কণায় ভরে ওঠে। কণাগুলো যেন সারি বেঁধে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপর ডান দিকে দুটি সমান্তরাল রেখার একটি মনোরম নকশা ফুটে ওঠে। রেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে। হলুদ-সবুজ ও সোনালি রঙের নানা আভায় ঝলমল করতে থাকে।
এরপর রেখাগুলো ক্রমশ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং পুরো দৃশ্যটি অসংখ্য ঝিকিমিকি আলোর বিন্দুতে ভরে যায়। ধীরে ধীরে এই দৃশ্যটি আমার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করে বাঁ দিকে সরে যায়। প্রায় ১০ সেকেন্ড পর তা মিলিয়ে যায়। এর জায়গায় থেকে যায় একটি নিস্তেজ, প্রাণহীন ধূসর রং। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই ধূসর স্তরটি মেঘে আচ্ছন্ন সমুদ্রের মতো রূপ নেয়। মনে হয় এরা যেন নানা আকৃতি ধারণ করার চেষ্টা করছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই দ্বিতীয় পর্যায়টি শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমি ওই ধূসর পটভূমির ওপর কোনো কল্পিত ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারি না।
প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ার আগে নানা মানুষ ও বস্তুর ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেগুলো দেখা দিলেই বুঝতে পারি, আমি ঘুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আর সেদিন যদি সেগুলো না আসে কিংবা আসতে না চায়, তবে আমি নিশ্চিত বুঝে যাই যে সারা রাত আর আমার ঘুম হবে না।
কণাগুলো যেন সারি বেঁধে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপর ডান দিকে দুটি সমান্তরাল রেখার একটি মনোরম নকশা ফুটে ওঠে। রেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে।
শৈশবে আমার কল্পনাশক্তি কত গভীরভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছিল, তার আরেকটি উদাহরণ দিই। অন্য সব শিশুর মতো আমিও লাফাতে খুব ভালোবাসতাম। ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে থাকার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে জন্ম নেয়। মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ প্রবল বাতাস নেমে আসত। তখন আমার শরীর এত হালকা মনে হতো, যেন কর্কের তৈরি। সেই সময় আমি অনেক উঁচুতে লাফিয়ে দীর্ঘক্ষণ শূন্যে ভেসে আছি বলে অনুভব করতাম। অনুভূতিটি ছিল অপূর্ব। পরে যখন বুঝলাম সেটি কেবলই আমার কল্পনার সৃষ্টি, তখন ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম।
সেই সময়ে আমার মধ্যে নানা রকম অদ্ভুত পছন্দ-অপছন্দ ও অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। এর কিছু আমি বাইরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। আবার কিছু আজও আমার কাছে রহস্যই রয়ে গেছে। নারীদের কানের দুল আমার একেবারেই সহ্য হতো না। তবে অন্য ধরনের অলংকার, বিশেষ করে ব্রেসলেট আমাকে কমবেশি আকৃষ্ট করত। মুক্তা দেখলে আমার প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। অথচ স্ফটিক কিংবা ধারালো প্রান্ত ও মসৃণ পৃষ্ঠবিশিষ্ট চকচকে বস্তু আমাকে অদ্ভুতভাবে টানত।
অন্যের চুলে হাত দিতে হলে আগে যদি আমি রিভলভারের নল স্পর্শ না করতাম, তবে চুলে হাত দিতে পারতাম না। পীচ ফলের দিকে তাকালেই আমার জ্বর আসত। আবার ঘরে কোথাও এক টুকরো কর্পূর থাকলেও তীব্র অস্বস্তি অনুভব করতাম। এখনও এই ধরনের কয়েকটি অনুভূতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
অন্য সব শিশুর মতো আমিও লাফাতে খুব ভালোবাসতাম। ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে থাকার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে জন্ম নেয়। মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ প্রবল বাতাস নেমে আসত।
তরলভর্তি কোনো পাত্রে কাগজের ছোট একটি টুকরো ফেলতে দেখলে আমার মুখে এক অদ্ভুত ও অত্যন্ত অপ্রীতিকর স্বাদ তৈরি হতো। হাঁটার সময় আমি পায়ের প্রতিটি ধাপ গুনতাম। স্যুপের বাটি, কফির কাপ কিংবা খাবারের পরিমাণও হিসাব করতাম। তা না হলে খাওয়ায় যেন কোনো আনন্দই পেতাম না।
আমার প্রতিটি কাজই ৩ সংখ্যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত হতে হতো। কোনো কিছু যদি ৩ দিয়ে বিভাজ্য না হতো, তাহলে অস্বস্তি বোধ করতাম। কখনো ভুল হয়ে গেলে আবার প্রথম থেকে শুরু করতাম। দরকার হলে এতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেত।
আট বছর বয়স পর্যন্ত আমার স্বভাব ছিল দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাহস বা মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমার অনুভূতিগুলো ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। মুহূর্তে মুহূর্তে এক চরম অবস্থা থেকে আরেক চরম অবস্থায় দুলে বেড়াত। আমার আকাঙ্ক্ষাগুলোও ছিল অসংখ্য; যেন হাইড্রার মাথার মতো—একটিকে দমন করলে আরেকটি জন্ম নিত। জীবন ও মৃত্যুর চিন্তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। ধর্মীয় ভয়, কুসংস্কার, শয়তান, ভূতপ্রেত আর অন্ধকারের অজানা শক্তির ভয়ে আমি প্রায় সব সময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকতাম।
তারপর হঠাৎই আমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমার সমগ্র জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল।
আট বছর বয়স পর্যন্ত আমার স্বভাব ছিল দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাহস বা মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমার অনুভূতিগুলো ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
সবকিছুর মধ্যে বইই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। বাবার ছিল সমৃদ্ধ এক গ্রন্থাগার। সুযোগ পেলেই আমি সেখানে গিয়ে বই পড়তাম। কিন্তু বাবা বিষয়টি মোটেই পছন্দ করতেন না। আমাকে পড়তে দেখলেই তিনি রেগে যেতেন। এমনকি আমি লুকিয়ে পড়ি বুঝতে পেরে তিনি মোমবাতিও লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর ভয় ছিল, অতিরিক্ত পড়াশোনায় আমার চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু তাতেও আমি থামিনি। চর্বি জোগাড় করে নিজেই পলতে ও মোম বানিয়ে নিতাম। তারপর রাতে দরজার চাবির ছিদ্র ও ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করে ভোর পর্যন্ত পড়তাম। তখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে থাকত। আর মা তাঁর প্রতিদিনের কঠোর কাজ শুরু করতেন।
এক দিন আমার হাতে আসে হাঙ্গেরীয় লেখক মিকলোস ইয়োসিকার উপন্যাস আবাফি-র সার্বীয় অনুবাদ। বইটি যেন আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অনুশীলন শুরু করলাম। প্রথম দিকে আমার সংকল্পগুলো এপ্রিল মাসের তুষারের মতো দ্রুত গলে যেত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আমি নিজের দুর্বলতাকে জয় করতে শিখলাম। তখন প্রথমবারের মতো এমন এক আনন্দের স্বাদ পেলাম, যা আগে কখনো অনুভব করিনি—নিজের ইচ্ছাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার আনন্দ।
এক দিন আমার হাতে আসে হাঙ্গেরীয় লেখক মিকলোস ইয়োসিকার উপন্যাস আবাফি-র সার্বীয় অনুবাদ। বইটি যেন আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণই আমার স্বভাবে পরিণত হলো। শুরুতে আমাকে নিজের ইচ্ছাগুলোকে দমন করতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ইচ্ছা ও সংকল্প একাকার হয়ে গেল। বছরের পর বছর এই অনুশীলনের ফলে আমি নিজের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলাম, যেসব নেশা অনেক শক্তিশালী মানুষকেও ধ্বংস করে দেয়, সেগুলোর সঙ্গেও আমি অনায়াসে লড়াই করতে পেরেছি।
জীবনের একের পর এক অভ্যাস ও আসক্তিকে আমি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছি। শুধু নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনই রক্ষা করিনি, বরং যে বিষয়গুলোকে অনেকে ত্যাগ বা আত্মসংযম বলে মনে করেন, সেখান থেকেই আমি গভীর তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করেছি।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর আমার একটি সম্পূর্ণ মানসিক বিপর্যয় ঘটে। সেই অসুস্থতার সময় আমি অনেক অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনা লক্ষ করি।