সকালে রান্নাঘরে গিয়ে কেন এসেছেন, মুহূর্তেই ভুলে গেলেন? কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কথার মাঝেই থেমে গেল চিন্তা? এমন মানসিক ঝাপসা অবস্থাই হতে পারে ব্রেন ফগ। কেন হয়, কীভাবে কমানো যায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি, জানুন বিস্তারিত।
সকালের ব্যস্ততায় রান্নাঘরে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, এখানে কেন এসেছিলেন? অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎই ভুলে গেলেন পরের বাক্যটি। পরিচিত কারও নাম মনে করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়লেন। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। এক-দুদিন নয়, কখনো কখনো টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন অবস্থা চলতে পারে।

অনেকেই এটিকে সাধারণ ভুলে যাওয়া বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই মানসিক ঝাপসা অবস্থাকে বলা হয় ব্রেন ফগ। এটি কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়। বরং এমন কিছু লক্ষণের সমষ্টি, যা মনোযোগ কমিয়ে দেয়, স্মৃতিকে দুর্বল করে এবং চিন্তাভাবনাকে ধীর করে ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যস্ত জীবন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি কিংবা দীর্ঘদিনের কিছু শারীরিক সমস্যার কারণেও ব্রেন ফগ দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা পেরিমেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও এমনটি হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদি কোভিড বা লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগেও এই সমস্যা দেখা যায়। তবে সুসংবাদ হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিছু ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই এই মানসিক কুয়াশা অনেকটাই দূর করা সম্ভব।
নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হোন

আমরা নিজের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করি। কাজের চাপের মধ্যে মনোযোগ কমে গেলে বা কিছু ভুলে গেলে নিজেকেই দোষ দিতে শুরু করি। অথচ চিকিৎসকদের মতে, ব্রেন ফগ কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার লক্ষণ নয়।
এটি মস্তিষ্কের এক ধরণের সংকেত। যেন সে জানিয়ে দিচ্ছে, সে ক্লান্ত, বিশ্রাম চায় কিংবা একসঙ্গে খুব বেশি চাপ সামলাতে পারছে না। তাই নিজেকে দোষারোপ না করে কিছুটা ধীর হোন। প্রয়োজনে কাজ ভাগ করে দিন, সাহায্য নিন এবং নিজেকে একটু বিশ্রামের সুযোগ দিন।
প্রতিদিনের জন্য একটি ছন্দ তৈরি করুন

প্রতিদিন কী করবেন, কীভাবে দিন শুরু হবে কিংবা কোন কাজটি কখন করবেন, এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে। তাই প্রতিদিনের জন্য একটি সহজ রুটিন তৈরি করুন। সকালে কী পোশাক পরবেন, নাশতায় কী খাবেন বা অফিসের ব্যাগ আগের রাতেই গুছিয়ে রাখুন। ছোট ছোট এই প্রস্তুতি দিনের শুরুটাকে সহজ করে এবং অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ কমায়।
ব্যস্ততার মাঝেও বিরতি নিন

একটি কাজ শেষ করেই আরেকটি কাজ শুরু করার অভ্যাস এখন অনেকেরই। অফিসের মিটিং শেষ হতে না হতেই ফোন, তারপর বাজার, এরপর পরিবারের দায়িত্ব। দিন শেষে মনে হয়, নিজের জন্য পাঁচ মিনিটও সময় পাওয়া যায়নি।
এই নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততা মস্তিষ্ককে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেয় না।
প্রতি কয়েক ঘণ্টা পর মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটের একটি বিরতি নিন। একটু হাঁটুন, পানি পান করুন, জানালার পাশে দাঁড়ান কিংবা কয়েক মিনিট নীরবে বসে থাকুন। এই ছোট্ট বিরতিগুলোই মস্তিষ্ককে নতুন করে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
সবকিছু মনে রাখার দায়িত্ব মস্তিষ্ককে দেবেন না

আজকের দিনে ফোনই হতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় সহকারী। অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বিল পরিশোধ, ওষুধ খাওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ক্যালেন্ডার ও রিমাইন্ডার ব্যবহার করুন। এতে মস্তিষ্ককে সবকিছু মনে রাখার অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না। মানসিক শক্তি তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা যায়।
পাঁচটি অভ্যাসে বাড়তে পারে মনোযোগ

অকফোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. থারাকা ব্রেন ফগ কমাতে সোয়ান্স ( SWANS ) নামে একটি সহজ সূত্র অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ঘুম: প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে রাখে এবং নিজেকে পুনর্গঠন করে।
পানি: শরীরে পানির ঘাটতি হলে মনোযোগ কমে যেতে পারে। তাই দিনের বিভিন্ন সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
শারীরিক সক্রিয়তা: প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ায়। এতে চিন্তা আরও পরিষ্কার হয়।
পুষ্টিকর খাবার: ডিম, মাছ, বাদাম, শাকসবজি ও অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ খাবার মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। বিশেষ করে কোলিনসমৃদ্ধ খাবার স্মৃতি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
চাপ নিয়ন্ত্রণ: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা চিন্তাভাবনাকে ঝাপসা করে দিতে পারে। তাই ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, বই পড়া বা পছন্দের কোনো শখের জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় রাখুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

কখনো কখনো ব্রেন ফগের পেছনে অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে। যদি দীর্ঘদিন ধরে মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তির অবনতি হয় বা দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আমরা যেমন শরীরের ক্লান্তিকে গুরুত্ব দিই, তেমনি মস্তিষ্কের ক্লান্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ সব সময় আরও দ্রুত ছুটে চলাই সমাধান নয়। কখনো কখনো একটু থেমে যাওয়া, একটু বিশ্রাম নেওয়া আর নিজের প্রতি একটু যত্নশীল হওয়াই মস্তিষ্ককে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারে।
সূত্র: বিবিসি হেলথ
ছবি: এআই