সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প এবং ১৪টি সমস্যা: কেন নতুন সমীক্ষা জরুরি
পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প এবং ১৪টি সমস্যা: কেন নতুন সমীক্ষা জরুরি

পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প এবং ১৪টি সমস্যা: কেন নতুন সমীক্ষা জরুরি

২০১২ সালে ৫৬৩ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত ফিজিবিলিটি রিপোর্ট জমা পড়েছিল। সেখানে হাইড্রোলজি, মরফোলজি, পরিবেশ, অর্থনীতি, সামাজিক প্রভাব ও প্রকৌশল নকশা সব ছিল। কিন্তু রিপোর্টটি ছিল ২০১২ সালের পদ্মার জন্য, ২০১২ সালের জলবায়ুর জন্য। এখন ২০২৬ সাল। রিপোর্টটির বয়স ১৪ বছর। এই ১৪ বছরে নদী, জলবায়ু, কূটনীতি ও প্রযুক্তি সব বদলে গেছে। অথচ সেই পুরোনো সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

সমস্যা এক: পানির মূল হিসাবটাই প্রশ্নবিদ্ধ

রিপোর্টে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের পুরো হিসাব দাঁড়িয়ে আছে দুটো অনুমানের ওপর। প্রথমত, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি বহাল থাকবে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের প্রবাহের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দুটো অনুমানই এখন ভেঙে পড়েছে।

গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হয়ে গেছে। নতুন চুক্তির কোনো নিশানা নেই। ফারাক্কা-পূর্ব যুগে পাংশায় শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ ছিল ২,০৩১ কিউমেক। চুক্তি-পরবর্তী সময়ে সেটা নেমে আসে ৫৭৬ কিউমেকে, কোনো কোনো বছর আরও কম। চুক্তি ছাড়া এটা আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি। তার ওপর উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহার প্রতি দশকে বাড়ছে। ২০১০ সালের পরের ১৬ বছরের প্রবাহ তথ্য এই রিপোর্টে নেই।

সমস্যা দুই: পলির হিসাবে ফারাক্কার শিক্ষা নেই

রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, পাংশায় ব্যারাজ হলে ৬০ বছরে নদীর তলদেশ মাত্র ৩ দশমিক ২৮ ফুট উঁচু হবে। ফারাক্কার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেখানে মাত্র ৫২ বছরে নদীতল প্রায় ২০ ফুট উঁচু হয়ে গেছে। একই ধরনের নদীতে একই ধরনের কাঠামো দিয়ে এত বড় পার্থক্য হওয়া মানে মডেলিংয়ের মূল দর্শনেই সমস্যা আছে।

পাংশায় গঙ্গা বছরে আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে। রিপোর্টে ১৮টি আন্ডারস্লুইসের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু মোট ব্যারাজ দৈর্ঘ্যের তুলনায় এই স্লুইসগুলোর মোট প্রস্থ মাত্র এক-অষ্টমাংশ। পলিবহুল এই নদীতে এগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং পানির নিচে থাকায় পরিষ্কার করাও কঠিন। কখন স্লুইস খুলবে, কতটুকু খুলবে, কোন মৌসুমে কী কৌশল নেওয়া হবে, সেই বৈজ্ঞানিক পরিচালনা নির্দেশিকা রিপোর্টে নেই।

রিপোর্টে পলিসংক্রান্ত গাণিতিক মডেলিং করা হয়েছিল ২০০৮ সালের তথ্য দিয়ে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পদ্মার নদী খাত, পলির ধরন ও পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো মডেল দিয়ে পলির হিসাব করা মানে ভুল উত্তর নিশ্চিত করা।

সমস্যা তিন: লোকেশনের প্রশ্নটা বন্ধ করা হয়েছে

২০১২ সালে পাংশা পয়েন্ট নির্বাচন করা হয়েছিল তৎকালীন নদীর রূপতত্ত্বের ভিত্তিতে। ২০১৭ সালে সেই নকশা বাতিল করা হয়েছিল নকশায় ত্রুটি এবং উজানে পলি, জলাবদ্ধতা ও পাড়ভাঙনের আশঙ্কার কারণে। নয় বছর পরে সেই একই পাংশা পয়েন্টে পুনরায় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ২০১৭ সালের সমস্যাগুলোর কারিগরি সমাধান জনসমক্ষে স্পষ্ট করা হয়নি।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পাংশাই একমাত্র বিকল্প কি না, সেটা কখনো বহুমানদণ্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। হাইড্রোলিক কার্যকারিতা, পলির বোঝা, জমি অধিগ্রহণের মাত্রা, নৌচলাচল, খরচ এবং জলবায়ু–সহনশীলতা, এই ছয়টি মানদণ্ডে একাধিক পয়েন্টের তুলনামূলক মূল্যায়ন না করে যেকোনো লোকেশন বেছে নেওয়া মানে অনুমানের ওপর হাজার কোটি টাকার বাজি ধরা। পদ্মার গতিপথ ২০১২ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। চর জেগেছে, তীর ভেঙেছে, প্রবাহের মূল ধারা সরে গেছে। নতুন জরিপ ছাড়া নিশ্চিত করা যাবে না পাংশা এখনো সেরা পয়েন্ট কি না।

ফারাক্কা বাঁধ

সমস্যা চার: ভাটির মানুষদের কথা হিসাবেই নেই

পাংশার ভাটিতে গোয়ালন্দ পর্যন্ত আরও ২০ থেকে ২৩ কিলোমিটার নদী। পাংশায় পানি আটকে রাখা হলে এই অংশে প্রবাহ কমবে। উজানে ফারাক্কা আটকায়, ভাটিতে পাংশা আটকায়, মাঝখানে নদী নিঃশেষ। এই ‘ডাবল ফারাক্কা’ পরিস্থিতির প্রভাব আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও গড়াই অঞ্চলে কেমন হবে, সেটার কোনো বিশ্লেষণ রিপোর্টে নেই।

গড়াইতে শুষ্ক মৌসুমে ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যত কোনো প্রাকৃতিক প্রবাহ নেই। এর ফলে খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্বিগুণ এবং বরদিয়া পয়েন্টে সর্বোচ্চ লবণাক্ততা আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য লবণাক্ততা কমানো, কিন্তু ভাটির প্রবাহের ওপর প্রভাব না জেনে এটা উল্টো ফল দিতে পারে। এই ঝুঁকির মূল্যায়ন রিপোর্টে অনুপস্থিত।

সমস্যা পাঁচ: জীববৈচিত্র্যের কোনো আধুনিক মূল্যায়ন নেই

রিপোর্টে দুটো ফিশ পাসের (মাছের চলাচল পথ) উল্লেখ আছে, কিন্তু এটুকুই। ফারাক্কার ফিশ পাসও ছিল। কিন্তু ফারাক্কার কারণে উজানে ইলিশের উৎপাদন ৯২ শতাংশ কমেছিল। শুধু ফিশ পাসের সংখ্যা লিখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন ধরনের ডিজাইনের, কোন প্রজাতির জন্য কার্যকর, কীভাবে পরিচালিত ও পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেটার কোনো বিশ্লেষণ নেই।

বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন দুই বছরে ইতিমধ্যে ৭১ হাজার টনের বেশি কমেছে। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র এই নদীতে। সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রধান উৎস গড়াই।

ব্যারাজের কারণে বন্যার সময় প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ বাধাগ্রস্ত হলে জলাভূমি-নির্ভর হাজারো প্রজাতির আবাস ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হবে। শুষ্ক মৌসুমে ভাটিতে প্রবাহ কমলে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়বে। এই পরিবেশগত প্রভাবের কোনো পরিমাণগত মডেলিং ২০১২ সালের রিপোর্টে নেই। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী এই মূল্যায়ন ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনই প্রশ্নবিদ্ধ।

সমস্যা ছয়: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসাবেই নেই

রিপোর্টের পুরো হাইড্রোলজিক্যাল বিশ্লেষণ ১৯৬৫ থেকে ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। হিমালয়ের হিমবাহ গলার হার, বর্ষার প্যাটার্ন ও শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের চরিত্র এখনকার চেয়ে অনেক আলাদা ছিল সেই সময়। আইপিসিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ২০৫০ নাগাদ বর্ষার সর্বোচ্চ প্রবাহ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে।

রিপোর্টে যে সংখ্যায় ১০০ বছরের বন্যার হিসাব করা হয়েছে, সেটা এই নতুন বাস্তবতায় কম ধরা হয়েছে কি না যাচাই করা হয়নি। রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি ছোট অধ্যায় আছে, কিন্তু সেটা মূল নকশায় প্রতিফলিত হয়নি। ২০৫০ ও ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রবাহের প্রক্ষেপণ ছাড়া এই ব্যারাজ কতটুকু জলবায়ু-সহনশীল হবে, সেটা জানার উপায় নেই।

পদ্মা নদীতে ভাঙন। বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। দৌলতপুর উপজেলায়

সমস্যা সাত: কাঠামোর নিরাপত্তা পুনরায় যাচাই দরকার

রিপোর্টে বাঁধের ভিত্তি ও কাঠামোগত নকশা তৈরি হয়েছিল ২০১২ সালের ভূতাত্ত্বিক জরিপের ওপর ভিত্তি করে। পদ্মার তলদেশের মাটির গঠন গতিশীল, পলি সঞ্চয় ও ক্ষয়ের কারণে প্রতিবছর বদলায়।

নতুন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ছাড়া ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এর বাইরে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বন্যা, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং কাঠামোগত নির্ভরযোগ্যতার হিসাব আন্তর্জাতিক বড় বাঁধ কমিশনের বর্তমান মানদণ্ড অনুযায়ী নতুন করে যাচাই করা হয়নি। একটি ব্যারাজ ব্যর্থ হলে ভাটির কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। সেই ঝুঁকির মূল্যায়ন ১৪ বছর পুরোনো তথ্যে করা অগ্রহণযোগ্য।

সমস্যা আট: নৌ–চলাচলের ভবিষ্যৎ অবিশ্লেষিত

রিপোর্টে একটি নেভিগেশন লকের কথা আছে। কিন্তু ব্যারাজ হলে পাংশার ওপরে ও নিচে নৌপথের গভীরতা, পানির স্তর ও জাহাজ চলাচলের ধরন কেমন বদলাবে, সেটার কোনো বিস্তারিত মডেলিং নেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নৌ–বাণিজ্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। নৌ–চলাচলের ওপর প্রভাব না জেনে নেভিগেশন লকের আকার ও ধরন নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

সমস্যা নয়: পরিচালনা নির্দেশিকা নেই

একটি ব্যারাজ একবার নির্মাণ হলে সেটি ৫০ থেকে ১০০ বছর চলবে। কিন্তু কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটাই নির্ধারণ করবে প্রকল্পটি সুবিধা দেবে নাকি ক্ষতি করবে। বর্ষার শুরুতে পলি ব্যবস্থাপনা মোড, বর্ষার শেষে মজুত মোড, শীতকালে পরিবেশগত প্রবাহ মোড, চরম খরায় জরুরি মোড এবং অতিবন্যায় পানি পারাপার মোড, এই পাঁচটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে গেটগুলো কীভাবে চলবে, কে সিদ্ধান্ত নেবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নেবে, সেই বৈজ্ঞানিক পরিচালনা নির্দেশিকা রিপোর্টে নেই। পরিচালনা নির্দেশিকা ছাড়া একটি ব্যারাজ মানে হাতিয়ার আছে, কিন্তু ব্যবহারের নিয়ম নেই।

সমস্যা দশ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে শুধু সুবিধা আছে, ঝুঁকি নেই

রিপোর্টে কৃষি, সেচ, জলবিদ্যুৎ ও নৌপরিবহনের সুবিধার হিসাব আছে। কিন্তু পলি জমার ফলে উজানে দীর্ঘমেয়াদি খনন ব্যয়, বন্যার ক্ষতিপূরণ, পাড়ভাঙনের ক্ষতি এবং পরিবেশ ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্যের কোনো হিসাব নেই। একটি পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ মূল্যায়নে সুবিধা ও ঝুঁকি দুটোই থাকে। যে মূল্যায়নে কেবল সুবিধা আছে, সেটা বিশ্লেষণ নয়, প্রচার। ২০১২ সালে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩১,৪১৪ কোটি টাকা। এখন সেটা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মূল খরচ ৬০ শতাংশ বাড়লে সুবিধার হিসাবও নতুন করে করতে হয়। সেটা হয়নি।

সমস্যা এগারো: পুনর্বাসন পরিকল্পনা ১৩ বছর পুরোনো

রিপোর্টে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের একটি পরিকল্পনা আছে। কিন্তু পদ্মার গতিপথ ও তীরবর্তী জনবসতি ২০১২ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। পুরোনো জরিপ অনুযায়ী যে জমিগুলো নদীগর্ভে ছিল, সেগুলোতে এখন চর জেগে বসতি হয়েছে। আবার যেখানে বসতি ছিল, নদীভাঙনে সেটা নদীতে চলে গেছে। ১৩ বছর পুরোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনায় নির্মাণ শুরু করলে জমি বিরোধ ও সামাজিক সংঘাত অনিবার্য।

সমস্যা বারো: অর্থায়নের উৎস এখনো অস্পষ্ট

৫০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প অভ্যন্তরীণ বাজেট থেকে হবে, বিদেশি ঋণে হবে, নাকি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে হবে, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। ২০১৩ সালে চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। অর্থায়নের উৎস নির্ধারিত না হলে ঋণের শর্ত, সুদের হার ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝার হিসাব করা যাবে না। অর্থায়ন অনিশ্চিত রেখে নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া মানে প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করা।

সমস্যা তেরো: কূটনৈতিক ঝুঁকির কোনো বিশ্লেষণ নেই

এটি ২০১২ সালের রিপোর্টের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি। রিপোর্টে ধরে নেওয়া হয়েছে পানি আসবে, চুক্তি থাকবে। কিন্তু গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ ভারতের সঙ্গে নতুন গঙ্গা চুক্তি আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করবে কি শক্তিশালী করবে, সেটার কোনো বিশ্লেষণ নেই। ১৯৯৭ সালের ইউএন ওয়াটারকোর্সেস কনভেনশন রেটিফাই করা যে আমাদের যেকোনো কিছুর জন্যই অবশ্যই করা উচিত, তা নিয়ে কিছু লেখা নাই।

সমস্যা চৌদ্দ: এটি একটি ব্যারাজ প্রকল্প, অববাহিকা পরিকল্পনা নয়

এটিই হয়তো সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা, যেটা নিয়ে সবচেয়ে কম কথা হচ্ছে। ২০১২ সালের রিপোর্টটি মূলত একটি প্রকৌশল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, একটি কাঠামো কীভাবে বানানো যায় তার হিসাব। কিন্তু পদ্মার সংকট কেবল একটি ব্যারাজ বানালেই সমাধান হবে না। এই নদীর পানির সংকট, পলির সংকট, লবণাক্ততার সংকট, জীববৈচিত্র্যের সংকট সবকিছু পরস্পর সংযুক্ত এবং পুরো গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত।

ব্যারাজকে কেন্দ্র করে পুরো অববাহিকার পানি, পলি, পরিবেশ, নৌপরিবহন ও জলবায়ু অভিযোজনকে একসঙ্গে পরিকল্পনায় না আনলে ব্যারাজটি হয়তো নির্মিত হবে, কিন্তু যে সমস্যার সমাধানের জন্য এটি তৈরি হচ্ছে সেই সমস্যা থেকে যাবে।

বাংলাদেশের ২১০০ সালের বদ্বীপ পরিকল্পনায় এই অববাহিকা ব্যবস্থাপনার কথা আছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সঙ্গে এই প্রকল্পের কোনো সংযোগ স্থাপন করা হয়নি। একটি বিচ্ছিন্ন ব্যারাজ নির্মাণ সেই বড় পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেবে নাকি জটিল করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর না জেনেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

২০১২ সালের রিপোর্টটি তার সময়ের জন্য হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু চৌদ্দটি মৌলিক সমস্যার প্রতিটিতে ২০২৬ সালের নতুন তথ্য, নতুন বাস্তবতা ও নতুন প্রশ্ন এসে গেছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিও অনেক বদলেছে। তাই চৌদ্দটি প্রশ্নের উত্তর না জেনে এবং আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে না এসে ৫০ হাজার কোটি টাকার নির্মাণ শুরু করা মানে অনিশ্চয়তার ওর বিশাল বাজি ধরা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাত কোটি মানুষ পানির জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁর অপেক্ষা দীর্ঘ হোক, তবু যে প্রকল্পটি হবে সেটা যেন তাঁদের সত্যিকার উপকার করে। পুরোনো ভিত্তিতে তাড়াহুড়া করে নির্মাণ করে আরেকটি ফারাক্কার পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।

  • সুবাইল বিন আলম প্রকৌশলী, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেন্টার ফর সায়েন্স টেক এবং পলিসি ডিপ্লোমেসি এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক।

মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই

অনেকেই বলেন, পশ্চিম বা ব্রিকস প্লাস আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসল বিষয় হলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তাদের মতে, এই দুই শক্তিধর দেশ যেদিকে যাবে, বাকিরা সেদিকেই অনুসরণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *