অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শন—বলিউডে কমেডির অন্যতম সফল জুটিগুলোর একটি। ‘হেরা ফেরি’, ‘গরম মাসালা’, ‘ভাগম ভাগ’, ‘ভুলভুলাইয়া’—একটা সময় একের পর এক জনপ্রিয় ছবি উপহার দিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভুলভুলাইয়া’ সিনেমাটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বলিউডে হরর-কমেডি ঘরানারও নতুন এক মানদণ্ড তৈরি করেছিল। তাই প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় পর এই জুটির সিনেমা ‘ভূত বাংলা’ ঘিরে দর্শকের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।
একনজরেসিনেমা: ‘ভূত বাংলা’ধরন: হরর-কমেডিপরিচালনা: প্রিয়দর্শনঅভিনয়: অক্ষয় কুমার, টাবু, ওয়ামিকা গাব্বি, মিথিলা পালকার, যীশু সেনগুপ্ত, রাজপাল যাদব, পরেশ রাওয়াল, আসরানিস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সরানটাইম: ২ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট
চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘ভূত বাংলা’। প্রায় ১২০ কোটি রুপি বাজেটের ছবিটি বিশ্বব্যাপী আয় করে ২৪০ কোটির বেশি (প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা)। ফলে বক্স অফিসে সেমি হিটের তকমা দখল করে নেয় এই সিনেমা। গত ১২ জুন নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় সিনেমাটি। বক্স অফিসে যা–ই করুক, ওটিটিতে আসার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সিনেমাটি এখনো রয়েছে নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশ থেকে সিনেমার তালিকার ৩ নম্বরে। সে হিসাবে বলা যায়, বাংলাদেশেও হিট সিনেমাটি। কেমন হলো প্রিয়দর্শন-অক্ষয় কুমার জুটির সিনেমাটি?
‘ভূত বাংলা’র শুরুটা পরিচিত আবহে। মঙ্গলপুর গ্রাম। এ গ্রামে বহু বছর ধরে কোনো বিয়ে হয় না। কারণ, গ্রামজুড়ে প্রচলিত আছে এক ভয়ংকর কিংবদন্তি। গ্রামবাসী বিশ্বাস করে, ‘বধূসুর’ নামে এক অশুভ শক্তি বিয়ের রাতেই নববধূদের তুলে নিয়ে যায়। এদিকে লন্ডনে থাকে অর্জুন (অক্ষয় কুমার) ও তার বোন মীরা (মিথিলা পালকার)। মীরার বিয়ের কথা চলছে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন একটি নির্দিষ্ট দিনেই তাকে বিয়ের তারিখ দেয়।
মীরা ও অর্জুন দেশে এসে বিয়ে করার ভেন্যু খুঁজছিল। এর মধ্যে তারা জানতে পারে, তাদের দাদা তাদের জন্য মঙ্গলপুরে রেখে গেছে একটি বিশাল প্রাসাদ।বিয়ের ভেন্যু নিয়ে বিপাকে পড়ে অর্জুন সিদ্ধান্ত নেয়, বোনের বিয়ে হবে সেই প্রাসাদেই। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। একদিকে তাকে সতর্ক করতে থাকে স্থানীয় ব্যক্তিরা, অন্যদিকে প্রাসাদে ঘটতে থাকে একের পর এক রহস্যময় ঘটনা। ‘বধূসুর’ ঘিরে প্রচলিত কিংবদন্তি ধীরে ধীরে অর্জুনকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা ছিল তার কল্পনারও বাইরে।
‘ভূত বাংলা’ অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর একঝাঁক জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। এ সিনেমায় অক্ষয় কুমার আবারও তাঁর পরিচিত কমেডি ঘরানায় ফিরেছেন। হাস্যরসে ভরপুর সংলাপ বলার ভঙ্গি সেই চিরচেনা অক্ষয়কে মনে করিয়ে দেয়। তবে দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে তাঁর অভিনয় পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। তাঁর চরিত্রটি বয়সের সঙ্গেও তেমন মানানসই ছিল না। রাজপাল যাদব বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য; তাঁর উপস্থিতিতেই ছবির বেশির ভাগ হাসির মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। পরেশ রাওয়ালও তাঁর স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন, যদিও চরিত্রটি খুব বেশি গভীরতা পায়নি।

অন্যদিকে টাবুর মতো শক্তিশালী অভিনেত্রীকে খুব সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে। যীশু সেনগুপ্ত নিজের চরিত্রে আন্তরিক হলেও অক্ষয় কুমারের বাবার চরিত্রে তাঁর কাস্টিং যথাযথ হয়নি। মিথিলা পালকার ও ওয়ামিকা গাব্বির চরিত্রেও আরও কাজ করার সুযোগ ছিল। তবে প্রয়াত আসরানি অল্প সময়ের জন্য পর্দায় এসেও দর্শকের মনে আলাদা ছাপ রেখে গেছেন।
‘ভূত বাংলা’ সিনেমার প্রথমার্ধ মন্দ নয়। রহস্যময় পরিবেশ, হালকা হাস্যরস এবং পরিচিত মুখগুলোর উপস্থিতি দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে পুরোদমে। তবে বিরতির পর থেকেই সিনেমাটি গতি হারাতে শুরু করে। প্রথম দিকের হরর-কমেডির জায়গা দখল করে নেয় দীর্ঘ অতিপ্রাকৃত শক্তির ব্যাখ্যা। সেই সঙ্গে যোগ হয় লোককথা আর একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাক।
গল্পের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা চিত্রনাট্যকে দুর্বল করে তোলে। নতুন নতুন তথ্য আসতে থাকে, কিন্তু এর পেছনে গল্পের যোগটা ঠিক কোথায়, তা সব সময় বোঝা যায় না। ফলে তা রহস্য তৈরির বদলে সৃষ্টি করে বিভ্রান্তি। যে টুইস্টগুলো দর্শককে বিস্মিত করার কথা, সেগুলোর অনেকটাই আগেভাগেই অনুমান করা যায়।
প্রাচীন অভিশাপ, ঋষি-মুনি, দানব, অলৌকিক আচার, রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণী—সব মিলিয়ে গল্প এমনভাবে জট পাকাতে থাকে যে শেষ ঘণ্টায় মনে হয় যেন একসঙ্গে ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’, পৌরাণিক ফ্যান্টাসি আর সাম্প্রতিক রহস্যধর্মী ওয়েব সিরিজের উপাদান মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কমেডির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা চোখে পড়ে। প্রথমার্ধে যে সহজাত হাস্যরস ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে তা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে ওঠে; বরং দ্বিতীয়ার্ধে একই ধরনের কমেডির পুনরাবৃত্তি বিরক্তি ধরায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও সিনেমাটিতে যত্নের অভাব চোখে পরে। প্রাসাদের সেট, আলোকসজ্জা ও ভৌতিক পরিবেশ যতটা যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, ক্লাইম্যাক্সে সিজিআই সেই পরিবেশ ধরে রাখতে পারে না; বরং অতিরঞ্জিত ভিজ্যুয়ালের কারণে গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হয়ে যায়।

‘ভূত বাংলা’ সিনেমার সবচেয়ে বড় সমস্যা অতীতের ছায়া। এ সিনেমায় ‘ভুলভুলাইয়া’র স্মৃতি এতটাই বেশি যে এর সঙ্গে তুলনাটা এড়ানো যায় না। এ সিনেমায় কমেডি ও নস্টালজিয়ার স্বাদ দর্শক অবশ্যই পাবেন। কিন্তু শক্তিশালী চিত্রনাট্য, নতুনত্ব ও ধারাবাহিকতার অভাবে ছবিটি শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশার উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এর অতি দৈর্ঘ্য। যেখানে গল্প এগোনোর কথা, সেখানে বারবার অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য এসে গতি থামিয়ে দেয়।
প্রিয়দর্শনের আগের কাজের স্মৃতি নিয়ে ‘ভূত বাংলা’ দেখতে গেলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ছবিটি একসঙ্গে অনেক কিছু হতে চেয়েছে—কমেডি, হরর, পৌরাণিক ফ্যান্টাসি, অ্যাডভেঞ্চার—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ধারাতেই পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। যাঁরা অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শনের পুরোনো জুটিকে আবার একসঙ্গে দেখতে চান, তাঁরা সিনেমাটি একবার দেখতে পারেন। তবে নতুন প্রজন্মের হরর-কমেডির সঙ্গে এ সিনেমা যে পাল্লা দিতে পারেনি, তা বলাই বাহুল্য।
