রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ফ্ল্যামেঙ্গো কিংবা লা টোমাটিনা—এসবের মধ্য দিয়েই আমরা অনেকেই স্পেনকে চিনি। কিন্তু আমার কাছে স্পেনের পরিচয় আরও বিস্তৃত। এটি এমন এক দেশ, যেখানে প্রতিবার গিয়ে মনে হয়েছে আমি শুধু নতুন কোনো শহর দেখছি না, বরং প্রবেশ করছি নতুন এক গল্পের ভেতর।
স্পেনে প্রথম পা রাখি ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি। লন্ডন থেকে মাদ্রিদে নেমেই বিমানবন্দরের বিশাল পর্দায় চোখে পড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটি সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা। মুহূর্তেই মনে হয়েছিল, একটি দেশকে শুধু তার স্থাপত্য, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তি দিয়ে চেনা যায় না; তার মানবিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাদ্রিদ আমাকে প্রথমেই শিখিয়েছিল, ইতিহাসকে কীভাবে জীবন্ত রাখা যায়।

রাজপ্রাসাদ, প্লাজা মেয়র, পুয়ের্তা দেল সোল, প্রাডো মিউজিয়াম কিংবা কলম্বাস স্কয়ার—প্রতিটি স্থাপত্য যেন শতাব্দীর পর শতাব্দীর গল্প বহন করে চলেছে। স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, নতুন পৃথিবীর আবিষ্কার, শিল্পকলার বিকাশ—সবকিছুর ছাপ যেন শহরের অলিগলিতেও ছড়িয়ে আছে।
তবে মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তার মানুষ। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের আন্তরিকতা আমাকে কখনোই বিদেশে একা অনুভব করতে দেয়নি। পথ দেখিয়ে দেওয়া, ধৈর্য ধরে বোঝানোর চেষ্টা কিংবা ছোট্ট একটি হাসি—এসব সৌজন্য দিয়েই ধীরে ধীরে স্পেনকে চিনতে শুরু করি।
মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনার পথে একসময় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যায় পড়েছিলাম। স্প্যানিশ ভাষা না জানায় বেশ অসহায় লাগছিল। কিন্তু কয়েকজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের আন্তরিক সহায়তায় শেষ পর্যন্ত ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যাই। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, পৃথিবীকে সুন্দর রাখে এখনো কিছু নিঃস্বার্থ মানুষ।

বার্সেলোনা যেন একেবারেই অন্য এক জগৎ। ভূমধ্যসাগরের নীল জল, তালগাছে ঘেরা সমুদ্রতট আর আন্তোনি গাউদির বিস্ময়কর স্থাপত্য—সাগ্রাদা ফামিলিয়া, কাসা বাত্লো, পার্ক গুয়েল—সব মিলিয়ে শহরটি যেন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা একটি জীবন্ত চিত্র।
অনেক শহর ঘুরেছি, কিন্তু খুব কম শহরই আছে, যেখানে প্রতিদিনের জীবন এত গভীরভাবে শিল্পের সঙ্গে মিশে আছে। বার্সেলোনা সেই বিরল শহরগুলোর একটি।
ফুটবলপ্রেমী হিসেবে ক্যাম্প ন্যুতে দাঁড়ানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অন্যদিকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ঘুরে উপলব্ধি করেছিলাম, স্পেনে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কয়েক বছর পর আবার স্পেনে ফিরি বিশ্বের বিখ্যাত লা টোমাটিনা উৎসবে অংশ নিতে। হাঙ্গেরি থেকে ভ্যালেন্সিয়ায় পৌঁছে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আমেরিকান বন্ধু জাস্টিন। গ্রীষ্মের স্পেনকে তখন যেন নতুন করে আবিষ্কার করলাম।

ভ্যালেন্সিয়ার রাস্তাগুলো ছিল প্রাণবন্ত। সাগরের বাতাস, মানুষের হাসি, ছোট ছোট ক্যাফে আর বিখ্যাত পায়েয়ার স্বাদ—সব মিলিয়ে শহরটি আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এরপর বুনিয়োলে হাজারো মানুষের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলাম লা টোমাটিনায়। ভাষা, ধর্ম কিংবা জাতীয়তার বিভেদ ভুলে সবাই তখন এক আনন্দের উৎসবে মেতে উঠেছে। পৃথিবীতে এমন আয়োজন খুব কমই আছে, যেখানে অপরিচিত মানুষও মুহূর্তেই আপন হয়ে যায়।
এরপর শুরু হলো আমার আন্দালুসিয়া অধ্যায়।
কর্ডোভার মেজকিতায় প্রবেশ করেই মনে হয়েছিল, ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। একই স্থাপনার ভেতরে ইসলামি ও খ্রিষ্টীয় সভ্যতার সহাবস্থান শুধু স্থাপত্যের বিস্ময় নয়, মানবসভ্যতারও এক অনন্য দলিল।

গ্রানাডার আলহাম্বরা আমাকে বাক্রুদ্ধ করে দিয়েছিল। সূক্ষ্ম আরবেস্ক অলংকরণ, জলের ফোয়ারা, জেনারালাইফের বাগান আর দূরের সিয়েরা নেভাদা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে অপূর্ব প্রাসাদগুলোর একটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েক ঘণ্টা ঘুরেও মনে হয়েছিল, এই বিস্ময়কে অনুভব করার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
তারপর সেভিয়া।
আমার কাছে স্পেনের আত্মা যদি কোথাও বাস করে, তবে তা সেভিয়াতেই। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরটি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। ফ্ল্যামেঙ্গোর তাল, গিটারের সুর, কমলালেবুর সুবাসে ভরা রাস্তা, প্লাজা দে এস্পানিয়ার অপার্থিব সৌন্দর্য আর রয়্যাল আলকাজারের বাগান—সব মিলিয়ে সেভিয়া যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।


তারিফা ছিল ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। ইউরোপের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দূরে আফ্রিকার মরক্কোকে দেখা—সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যেখানে আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগর একে অন্যকে আলিঙ্গন করেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর মানচিত্র যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
মালাগা আমাকে চিনিয়েছে পাবলো পিকাসোর জন্মশহরকে। বিলবাও দেখিয়েছে, কীভাবে একটি শিল্পনগর আধুনিক স্থাপত্যের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। আর সান সেবাস্তিয়ান শিখিয়েছে, সমুদ্রের সৌন্দর্য শুধু সৈকতে নয়, মানুষের জীবনযাপনেও ছড়িয়ে থাকে।
ছবি: লেখক