কক্সবাজারের মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ আংশিক বেড়েছে। এটা কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।
১৫ দিনের বেশি সময় ধরে দেশে তীব্র গ্যাস–সংকট চলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন চলাচল, গৃহস্থালিসহ নানা খাতে। অধিকাংশ জায়গায় সারা দিন অপেক্ষা করার পর গভীর রাতে বাসাবাড়িতে চুলা জ্বালানো যাচ্ছে, সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে লোডশেডিং কম হলেও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে তীব্রভাবে। গ্যাস–সংকটের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী ভোগান্তি নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে।
তবে গ্যাস–সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন শিল্পমালিকেরা। তৈরি পোশাক, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, বস্ত্রকল, বিস্কুট-কেক ও ভোগ্যপণ্য কারখানায় গড় উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমেছে। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা জানিয়েছেন, কয়েকটি রপ্তানি ক্রয়াদেশের বিপরীতে তৈরি পোশাক নির্ধারিত সময়ে পাঠাতে পারছেন না তাঁরা। এ জন্য ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে। সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের বাজারও খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত বেশ কিছু সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এ পরিস্থিতি নিত্যপণ্যের দাম আরও এক দফা বাড়িয়ে নতুন মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে।
দেশে জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস হওয়ায় এর উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহে যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয়, তাতে বড় ধরনের সংকটে পড়ে অর্থনীতি। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা যেখানে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা যায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ নেমে এসেছিল ২১৫ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েই ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকার কারণে এক খাতে কমিয়ে অন্য খাতে বাড়িয়ে—জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থায় গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি ত্রুটি দেখা দিলেই সংকট মাত্রা ছাড়ায়।
বিগত সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যে আমদানিনির্ভর ও লুণ্ঠনমূলক নীতি, তার খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা অর্থনীতিকেই। জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকায় ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ছে না, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়ছে। পরিস্থিতি এমন যে জ্বালানিসংকট না কাটা পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরির নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কয়েক দশকের ভুল নীতির ফলাফল। এই সংকট থেকে শিগগিরই উত্তরণ সম্ভব নয়, সেটা করতে গেলে নতুন ভুলে ফাঁদে পড়ার শঙ্কাও থেকে যায়। আমরা মনে করি, দেশের শিল্প ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে স্বল্প মেয়াদে সম্ভাব্য বিকল্প উৎসগুলো থেকে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জনভোগান্তি এবং শিল্পমালিক ও উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় উৎস, বিশেষ করে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এলএনজির মজুত সক্ষমতা বাড়াতে সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। তবে জ্বালানি খাতের সংকটের টেকসই সমাধান হলো ধাপে ধাপে জীবাশ্মনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা বাড়ানো।