সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / লিসবনের মঞ্চে জেমস: গানে গানে ফিরল বাংলাদেশ
লিসবনের মঞ্চে জেমস: গানে গানে ফিরল বাংলাদেশ

লিসবনের মঞ্চে জেমস: গানে গানে ফিরল বাংলাদেশ

জীবন্ত কিংবদন্তি জেমস লিসবনে লাইভ কনসার্ট করতে আসবেন—এই ঘোষণা আসার পর থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল অন্য রকম এক ভালো লাগা। ভিনদেশে বসবাসরত প্রবাসীরা সব সময় দেশীয় সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। তাই নগরবাউল জেমসের গান লিসবনের ‘লিসবোয়া আউ ভিভোতে’ সরাসরি উপভোগ করার সুযোগটি অনেকের কাছেই ছিল স্বপ্নের মতো।

২৬ জুলাই সন্ধ্যায় সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত আসে। বিকেল থেকেই ভেন্যুর সামনে দর্শকদের দীর্ঘ অপেক্ষা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল সামনের সারিতে জায়গা করে নেওয়া, যেন প্রিয় শিল্পীকে কাছ থেকে গান গাইতে দেখা যায়। তাঁরা অপেক্ষা করছে শিল্পীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বহুদিনের প্রিয় গানগুলো গাওয়ার । সময় যত গড়ায়, ভেন্যুর চারপাশে উৎসবের আমেজ ততই বাড়তে থাকে।

মূল আকর্ষণ জেমসের কনসার্ট হলেও প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজনটি ভিন্নভাবে সাজানো হয়। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত হন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অভিনেতা জায়েদ খান। জেমস মঞ্চে ওঠার আগে পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশি মিউজিক্যাল ব্যান্ডের সদস্য, নৃত্যশিল্পী ও অন্য শিল্পীরা বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

দর্শকসারিতেও দেখা যায় বয়সের বৈচিত্র্য। ২৫ বছরের তরুণ থেকে শুরু করে ৬০ বছরের প্রবীণকেও মাথা দুলিয়ে গান গাইতে দেখা যাচ্ছে । উপস্থিত আছে প্রবাসে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশু-কিশোরেরাও। ভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে বড় হলেও তারা বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তির গান লাইভে শুনতে এসেছে।

সব আয়োজন শেষে এল বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। নগরবাউল জেমস মঞ্চে উঠতেই দর্শকদের চিৎকার ও উল্লাসে কেঁপে ওঠে পুরো ভেন্যু। দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে জেমস বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি বাংলাদেশে আছি। ধন্যবাদ।’ গান শুরু করতেই হাজারো দর্শক তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

নগরবাউল জেমস বরাবরই মঞ্চে মিতভাষী। গানের কথা দিয়েই তিনি যেন সব বলতে চান। একের পর এক গান গেয়ে গেলেন তিনি, আর শ্রোতারাও তাঁর সঙ্গে গলা মেলাতে থাকলেন। ‘দুষ্টু ছেলের দল’ গানে দর্শকেরা দুলে দুলে নেচেছেন। আবার ‘কবিতা’ গান শুনে অনেকে ফিরে গেছেন নিজেদের অতীতের স্মৃতিতে। কোনো গান মনে করিয়ে দিয়েছে তারুণ্যের দিন, কোনো গান পুরোনো বন্ধুত্ব কিংবা হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের কথা।

কনসার্টের একপর্যায়ে জেমস গেয়ে উঠলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় পুরো ভেন্যুর পরিবেশ। হঠাৎ সবাই যেন নিজের দেশকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পারলেন। গানের কথার মতোই তাঁরা যেন নিজেদের চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

একই আবেগ ছড়িয়ে পড়ে ‘মা’ গানের সময়। অনেকের চোখ ছল ছল করে উঠে। কেউ হয়তো দূরে থাকা মায়ের মুখ মনে করছে, কেউ ফিরে যাচ্ছে শৈশবের স্মৃতিতে। প্রবাসজীবনে ‘মা’ গানটা যেন পরিবার, দেশ ও শিকড়ের প্রতীক হয়ে উঠল।

একের পর এক গান চলতে থাকে। প্রতিটি গানেরই ছিল নিজস্ব আবেগ। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এ যেন নিজের অনুভূতিগুলোকে নতুন করে উপলব্ধি করার একটি সুযোগ। যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য মুহূর্ত।

সুরের মূর্ছনা আর দর্শকদের ভালোবাসায় শিল্পীও ছিলেন সিক্ত। তাই কখন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে, কেউ যেন বুঝতেই পারেননি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জেমসের গান শোনার পরও দর্শকদের মনে ছিল আরও গান শোনার আকাঙ্ক্ষা।

একসময় রক সম্রাট জেমস বললেন, ‘তোমরা আজ আছ বলে আমিও আছি। তোমরা ছাড়া আমিও নেই। ভালো থাকবে। একসঙ্গে থাকবে।’ এটুকু বলেই তিনি গেয়ে উঠলেন তাঁর বিখ্যাত গান ‘হামারি আধুরি কাহানি’। তখন সবাই বুঝতে পারলেন, স্মরণীয় রাতটি শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গানটির সুরে প্রত্যেক প্রবাসী যেন নিজের অসমাপ্ত গল্প, ফেলে আসা দেশ ও স্মৃতিকে নতুন করে খুঁজে পেলেন।

এই আয়োজন শুধু একটি কনসার্ট ছিল না। এটি ছিল প্রবাসের মাটিতে নিজের পরিচয়, সংস্কৃতি ও শিকড়কে নতুন করে অনুভব করার এক আবেগঘন রাত। জেমস সেদিন শুধু গান শোনাননি; তিনি কয়েক ঘণ্টার জন্য লিসবনের বুকে তৈরি করেছিলেন একটুকরা বাংলাদেশ।

কনসার্টের আয়োজক কমিটি ‘কাজা দো বাংলাদেশ’ ও ‘নোটিসিয়াস বাংলা’র যৌথ উদ্যোগের উদ্দেশ্যও হয়তো ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন একটি স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়া এবং একই সঙ্গে পর্তুগালের মানুষের কাছে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির শক্তি তুলে ধরা।

About Editor Todaynews24

Check Also

কুরা কাটনী মসজিদ— ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন

কুরা কাটনী মসজিদ— ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন

পটিয়ার হরিণখাইনের কুরা কাটনী মসজিদ বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। ১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ আজও তার আদি কাঠামো, কারুকাজ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং চট্টগ্রামের ইতিহাস, সুফি সংস্কৃতি, লোককথা এবং মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত দলিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *