ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস এখন আর ধান, সবজি বা অন্য মৌসুমি ফসল নয়; বরং গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগি পালন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, একজন ক্ষুদ্র কৃষক বছরে গড়ে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে যে আয় করেন, তা ধান সবজির মতো অস্থায়ী ফসল থেকে পাওয়া আয়ের প্রায় ছয় গুণ।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাবেক মহাপরিচালক মো. শহজাহান কবীর প্রথম আলোকে বলেন, কৃষকের আয় এখনো খুবই কম। এ কারণে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক ধীরে ধীরে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, কৃষকেরা কৃষি থেকে সরে গেলেও সেই জায়গা নিচ্ছেন এক শ্রেণির বড় বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ী, যাঁদের মূল লক্ষ্য কৃষিকে জীবিকা হিসেবে নয়, ব্যবসা হিসেবে দেখা। ফলে ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রোডিউসার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে। দেশের আট বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বিবিএসের টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্প। গতকাল মঙ্গলবার জরিপটি প্রকাশ করে বিবিএস।
জরিপে জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং বছরে কৃষি থেকে আয়ের ভিত্তিতে দেশের সব কৃষককে তুলনা করা হয়েছে। এ তিনটি সূচকেই যাঁরা সবচেয়ে নিচের ৪০ শতাংশের মধ্যে পড়েছেন, তাঁদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে ধরা হয়েছে।
কৃষি থেকে কৃষকের কম আয়ের বিষয়টি নতুন নয়। বাজারব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য পান না। সম্প্রতি এক সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আলুচাষির উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেশে টানা দুই বছর এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদন হলেও চাষিরা উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে থাকা অতিরিক্ত খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকের আয় কমে যাচ্ছে।
একই চিত্র উঠে এসেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও একই চাল ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদার ঘুরে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। অর্থাৎ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ কৃষকের হাতে যায় না।
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র কৃষক বছরে গড়ে আয় করেন ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। দেশে মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর অর্ধেকের বেশি (৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ) এই ক্ষুদ্র কৃষক। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি থেকে ক্ষুদ্র কৃষকের গড় আয় হয় ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। অন্যদিকে ধান, সবজি ও অন্যান্য অস্থায়ী ফসল থেকে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। ফলদ ও স্থায়ী ফসল থেকে আয় আরও কম—২ হাজার ৩৩১ টাকা। তবে বনজ সম্পদ থেকে আয় আবার কিছুটা বেশি, ১০ হাজার ৮৯২ টাকা। আর মাছ চাষ থেকে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা।
বিভাগভেদে আয়ের পার্থক্য
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় আয়ে রাজশাহী বিভাগ শীর্ষে। সেখানে গড় আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে খুলনা বিভাগ, যেখানে গড় আয় ৪৪ হাজার ২৮ টাকা। উভয় বিভাগের আয়ই জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে কম আয় সিলেট বিভাগে, যেখানে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের গড় বার্ষিক আয় ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। জরিপে এই আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে খুলনা অঞ্চলে হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খাতের বিস্তার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উন্নত জাতের পশুতে আয় অনেক বেশি
বিবিএসের জরিপে জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং বছরে কৃষি থেকে আয়ে যাঁরা ৪০ শতাংশের ওপরে রয়েছেন, তাঁদের বলা হয়েছে বৃহৎ উৎপাদক। একজন বৃহৎ উৎপাদকের গড় আয় বছরে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। আর সব কৃষক মিলিয়ে গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা।
জরিপে দেখা গেছে, কৃষকের আয়ের ক্ষেত্রে পশুর জাতও বড় ভূমিকা রাখছে। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু থেকে বছরে গড় আয় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ টাকা। জার্সি বা ব্রাহমা জাতের গরু থেকে গড়ে ২ লাখ ২ হাজার টাকা আয় হয়। অথচ দেশি গরু থেকে গড় আয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশি ছাগল থেকে বছরে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৯০২ টাকা।
মুরগির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সোনালি জাতের মুরগি থেকে বছরে গড় আয় ৩৬ হাজার ৬৩৩ টাকা, যেখানে ব্রয়লার থেকে আয় ২৫ হাজার ৮৫৯ টাকা। এই পরিসংখ্যান প্রশ্ন তুলছে, উন্নত জাতের গবাদিপশু কেনার মতো পুঁজি বা সহজ ঋণসুবিধা ক্ষুদ্র কৃষকদের কতটা রয়েছে। যাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, তাঁদের আয়ও তুলনামূলকভাবে কম রয়ে যাচ্ছে।
নারীর শ্রম আছে, নেতৃত্ব নেই
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা ও দুধ দোহনের মতো কাজে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত। জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী।