হাঁস-মুরগির সম্পূর্ণ নতুন এক ভাইরাস আবিষ্কার করে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় কনিষ্ঠতম গবেষক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশি তরুণী মারজানা আক্তার। জাতিসংঘের ফেলোশিপ পাওয়া এই বিজ্ঞানীর বৈপ্লবিক গবেষণা, জীবনের কঠিন লড়াই জয় করার গল্প এবং কিশোর-তরুণদের বিজ্ঞানী হওয়ার অনুপ্রেরণাদায়ক পরামর্শ নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের মূল অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সুমনকুমার দাশ।
এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় নিজের নাম দেখে কেমন লাগছে?
মারজানা আক্তার: এটি আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের এবং একই সঙ্গে অনেক বড় দায়িত্বের একটি মুহূর্ত। একজন তরুণ বাংলাদেশি গবেষক হিসেবে এই স্বীকৃতি আমাকে আনন্দিত করেছে, তবে তার চেয়েও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরও একটি স্বীকৃতি। এ অর্জনের পেছনে আমার শিক্ষক, গবেষণা সহকর্মী, পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবদান রয়েছে।
আপনার গবেষণা সম্পর্কে পাঠকদের জন্য সহজভাবে বলুন।
মারজানা আক্তার: আমার গবেষণার মূল বিষয় সংক্রামক রোগ, ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও বায়োসিকিউরিটি। সহজভাবে বলতে গেলে, আমরা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, নতুন নতুন ধরন কীভাবে তৈরি হয় এবং সেগুলো কীভাবে দ্রুত শনাক্ত করা যায়—এসব নিয়ে কাজ করি। পাশাপাশি গবেষণাগারে নিরাপদভাবে জীবাণু নিয়ে কাজ করা এবং ভবিষ্যতের সংক্রামক রোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও আমার আগ্রহ রয়েছে।
এই গবেষণা বাংলাদেশকে কীভাবে উপকৃত করবে?

মারজানা আক্তার: বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণার মাধ্যমে যদি আমরা রোগজীবাণুর পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে পারি, তাহলে রোগনিয়ন্ত্রণ, টিকা উন্নয়ন, রোগের নজরদারি এবং কার্যকর নীতি গ্রহণ অনেক সহজ হবে। আবার শক্তিশালী বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মারজানা আক্তার: আমি সংক্রামক রোগ, জিনোমিকস এবং বায়োসিকিউরিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা চালিয়ে যেতে চাই। পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের দক্ষতা উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই। আমার লক্ষ্য এমন গবেষণা করা, যা শুধু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাড়াবে না; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ও নীতিনির্ধারণেও বাস্তব ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যতে কেউ বিজ্ঞানী হতে চাইলে তাঁর কীভাবে এগোনো উচিত?
মারজানা আক্তার: প্রথমত, কৌতূহলী হতে হবে এবং প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। বিজ্ঞানে সফল হওয়ার জন্য শুধু ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়; ধৈর্য, নিয়মিত শেখার আগ্রহ এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট গবেষণার সুযোগ, বই পড়া, বৈজ্ঞানিক লেখা অনুসরণ করা এবং ভালো মেন্টরের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
কেউ আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে গবেষণা করতে চাইলে তাঁকে কী করতে হবে?
মারজানা আক্তার: আমি সব সময় শিখতে আগ্রহী এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিই। যাঁরা সংক্রামক রোগ, মাইক্রোবায়োলজি, জিনোমিকস বা বায়োসিকিউরিটি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাঁরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। গবেষণার সুযোগ ও প্রকল্প অনুযায়ী আমরা ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর ও তরুণ। তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

মারজানা আক্তার: আমার একটিই কথা—কৌতূহলকে কখনো হারিয়ে ফেলো না। বড় আবিষ্কার অনেক সময় খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়। বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে বুঝতে শেখায়। তাই স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না, প্রশ্ন করতে দ্বিধা কোরো না এবং শেখার আনন্দ ধরে রাখো। আজকের কৌতূহলী একজন শিক্ষার্থীই আগামী দিনের একজন বিজ্ঞানী হতে পারে।