সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / করপোরেট ঢঙে ষোলো আনা: সংকটে অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী
করপোরেট ঢঙে ষোলো আনা: সংকটে অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী

করপোরেট ঢঙে ষোলো আনা: সংকটে অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী

বেলা ১১টা। অফিসে ঢুকে মোজাহিদ আহমেদ (ছদ্মনাম) প্রথমেই কম্পিউটার চালু করেন। মনিটরের ওপর ধুলার আস্তরণ দেখে অবশ্য তাঁর মেজাজ বিগড়ে যায়। অফিস সহকারীকে ডেকে বলেন, ‘এত ধুলা কেন?’ অথচ নিজের ল্যাপটপটি পরিষ্কার করার কথা তাঁর মনে পড়ে না। কাজের সরঞ্জামের যত্ন নেওয়া, নিজের জায়গা গুছিয়ে রাখা—এসবকে তিনি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না।

মোজাহিদের এই অভ্যাসকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, কর্মক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে অনেকের ক্ষেত্রেই প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী পেশাদারত্বের প্রাথমিক শৃঙ্খলায় পিছিয়ে।

অর্থাৎ কম্পিউটার চালাতে পারলেই দক্ষ কর্মী হওয়া যায় না। সময়মতো অফিসে আসা, নিজের কাজের দায়িত্ব নেওয়া, সরঞ্জাম ঠিক রাখা—এসবও কাজের অংশ। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় এগুলোই যেন ‘অতিরিক্ত যোগ্যতা’!

যোগ্যতার ঘাটতির আরেকটি চিত্র দেখা যায় চাকরি খোঁজার সময়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ৩৬ শতাংশ চাকরিপ্রত্যাশী আত্মীয় ও বন্ধুদের সহায়তায় চাকরি খোঁজেন। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করেন ২৬ শতাংশ। আর সরাসরি প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেন মাত্র ১২ শতাংশ।

অর্থাৎ চাকরির বাজারে নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি পরিচিতির খাতাটিও বেশ ভারী। চাকরিতে ঢোকার আগে লবিং। ঢোকার পর সেটিই অনেক সময় তোষামোদে রূপ নেয়।

আফরান সাদিক (ছদ্মনাম) এমন পরিবেশের সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন। দেখা হলেই লম্বা সালাম। কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস। ইংরেজিতেও সাবলীল। বস কী শুনতে চান, সেটিও তিনি বেশ ভালো বোঝেন। শুধু নিজের কাজের জায়গায় একটু সমস্যা। প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞানেই ঘাটতি আছে।

অফিসগামী মানুষ

তাই কাজের জটিল জায়গায় আটকে গেলে আফরানের ভরসা দক্ষতার চেয়ে সম্পর্কের ওপর বেশি। বস খুশি থাকলে তাঁর কর্মজীবনও বেশ স্বস্তির। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে সংকট দেখা দিলে সেই স্বস্তি আর খুব কাজে আসে না। তখন সালাম কত লম্বা ছিল, সেটি নয়, কাজটি কে করতে পারেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চাকরির বাজারের পরিসংখ্যানও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিবিএসের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, পরিচিতিও আছে, তবু চাকরির নিশ্চয়তা নেই। বাজার শেষ পর্যন্ত দক্ষতার হিসাবও চাইছে।

তবে এখানেই গল্পের আরেকটি দিক আছে। সব সমস্যার দায় কর্মীর নয়। প্রতিষ্ঠানে সৎ ও দক্ষ কর্মীও আছেন। মালিকপক্ষ তাঁদের চেনে। কে নিয়মিত কাজ করেন, কে দায়িত্ব নেন, কে সংকটে পাশে থাকেন—এসব বোঝার জন্য খুব বড় গবেষণার দরকার হয় না।

কিন্তু সৎ ও দক্ষ কর্মী ধরে রাখার জায়গায় অনেক সময় হিসাবটা একটু অন্য রকম। দক্ষ কর্মী নিজের কাজের মূল্য বুঝতে শুরু করলে একদিন বেতন বাড়ানোর কথাও তুলতে পারেন। আর সেখানেই মালিকের কপালে ভাঁজ পড়ার সম্ভাবনা থাকে!

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাজ ভালো করলে দায়িত্ব বাড়ে। কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে বেতন সব সময় বাড়ে না; বরং বেশি কিছু চাইলে বলা হয়, এখন তো বাজার খারাপ।’

ফলে অদক্ষ কর্মী যেমন প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারেন, তেমনি দক্ষ কর্মীকে যথাযথ মূল্য না দিলে তিনিও একসময় উৎসাহ হারান। কেউ প্রতিষ্ঠান ছাড়েন। কেউ কাজের ন্যূনতমটুকু করে যান। এতে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানেরই।

এ বাস্তবতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের চিত্রও মিলে যায়। ফোর্বসে প্রকাশিত ‘হোয়াট ডাজ জব সিকিউরিটি ইভেন লুক লাইক ইন ২০২৬? ইট স্টার্টস উইথ স্কিলস’ শীর্ষক নিবন্ধে চাকরির নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দক্ষতার কথা বলা হয়েছে।

ফোর্বসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ধারাবাহিক ছাঁটাইয়ের সময়ে শুধু তদবির বা চাটুকারিতা দিয়ে চাকরি টিকিয়ে রাখা কঠিন। কর্মীর এমন দক্ষতা দরকার, যা একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কর্মক্ষেত্রেও কাজে লাগে। সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহার, যোগাযোগ ও প্রতিষ্ঠানের মূল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে কর্মীর দক্ষতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও কম নয়। যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও দক্ষ কর্মীর যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ‘কাজটা পারো তো?’ বললে হবে না, কাজটা ভালো করলে ‘কতটা মূল্য দিচ্ছি?’, সেটিও ভাবতে হবে।

আত্মীয়ের সুপারিশে চাকরি মিলতে পারে। তোষামোদে কিছুদিন সুবিধাও পাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে হয় কাজের জোরেই। চাকরি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া নয়, তাঁদের ধরে রাখাও।

About Editor Todaynews24

Check Also

ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে বড় উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর

সুস্থ, মেধাবী, সুশৃঙ্খল ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলাকে বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বিত বিকাশই বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। খেলাধুলাকে কেবল শরীরচর্চা বা বিনোদন নয়, পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে তা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবিবার (২৭…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *