পাকিস্তানের ব্রড পিকে সাম্প্রতিক তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন বিশ্বের কয়েকজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। কিন্তু এই দুর্ঘটনা শুধু একটি ট্র্যাজেডি নয়; এটি আবারও সামনে এনেছে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক হুমকি—তুষারধস। কেন হয় এই বিপর্যয়, কতটা পূর্বাভাস দেওয়া যায়, আর কেন অভিজ্ঞতার পরও তা এড়ানো কঠিন—সেই ব্যাখ্যা এই লেখায়।
সম্প্রতি পাকিস্তানের ব্রড পিকে হওয়া একটি ভয়ানক তুষারধস পুরো পর্বতারোহণ মহলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। অবশ্য পর্বতারোহণ মহলের বাইরেও সাধারণ্যের কাছে এটি বড় খবর হয়ে দাঁড়ায় নিমস দাই নামে বহুল পরিচিত নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুর্জার কারণে। পুর্জা ২০১৯ সালে বৈপ্লবিক উচ্চাশা নিয়ে একটি আপাত অসাধ্য মিশনে নামেন। বিশ্বে ৮০০০ মিটার (২৬,২৪৬ ফুট) বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে সাকল্যে ১৪টি। ছয় মাসের চেয়ে অল্প বেশি সময় নিয়ে সব কটি পাহাড় আরোহণ করেন নিমস দাই। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ আরোহণ নিয়ে নির্মিত হয় ‘ফরটিন পিকস’ নামে নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারি। সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘বিয়ন্ড পসিবল’ নামে একটি বইও প্রকাশিত হয়। এই দুটিই দুনিয়াজোড়া খ্যাতি এনে দেয় তাঁকে। ৩০ জুলাইয়ের তুষারধসে পুর্জাসহ ১০ জন পর্বতারোহী প্রাণ হারান ব্রড পিকের ঢালে।
কী হয়েছিল সেদিন

১৪টি ৮ হাজার মিটার পর্বতের মধ্যে ব্রড পিককে তুলনামূলক সহজ হিসেবেই গণ্য করা হয়। এখানে বলা রাখা ভালো, নির্দিষ্ট ক্ষণ আর পরিস্থিতিতে কোনো পর্বতই সহজ কিংবা নিরাপদ নয়। সহজ কিংবা নিরাপদ—এই শব্দযুগল পর্বতের পরিপ্রেক্ষিতে সব সময়ই খুবই আপেক্ষিক। হিমালয়ের কারাকোরাম রেঞ্জে অবস্থিত পাঁচটি আট হাজার মিটারি চূড়ার মধ্যে কাঠিন্য আর পর্বতে প্রাণহানির বিচারেও বেশ নিরাপদ অবস্থানে আছে ৮,০৫১ মিটার উচ্চতার বিশ্বের দ্বাদশ সর্বোচ্চ পর্বত ব্রড পিক।
গত ৩০ জুলাই ক্যাম্প-২ থেকে ক্যাম্প-৩–এর দিকে উঠছিলেন বিভিন্ন দলের ১০ জন পর্বতারোহী। ক্যাম্পগুলো সাধারণত পর্বতের নিরাপদ স্থানেই করা হয়। তাঁবুর নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে পর্বতারোহীরা এগোচ্ছিলেন পরবর্তী ক্যাম্পের দিকে। পাকিস্তানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আনুমানিক ৬৬০০ মিটার উচ্চতায় তুষারধস আঘাত হানে ১০ জনের দলটিকে। তুষারধস আঘাত হানার পর থেকেই দলটির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।

এখানে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সম্পর্কে বলে রাখা দরকার। ওয়্যারলেস রেডিও সেট দিয়ে সাধারণত পর্বতের এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে খবর আদান–প্রদান করা হয়। আর বহির্বিবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই সেদিন পর্যন্তও ভরসা ছিল স্যাটেলাইট মোবাইল ফোন। তবে এর ব্যবহার ও কার্যপদ্ধতি বেশ জটিল। কয়েক বছর ধরে স্যাটেলাইট ফোনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে একধরনের ট্র্যাকার। ডিভাইস হিসেবে যে ট্র্যাকারগুলো ব্যবহৃত হয়, এর মধ্যে গার্মিন ব্র্যান্ডের ইনরিচ মিনি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই ডিভাইসের সাহায্যে পর্বতারোহীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন স্বজনেরা। কতটুকু আরোহণ করলেন, কোন ক্যাম্পে আছেন—এই ধরনের তথ্য ট্র্যাকারের সাহায্যে সহজেই পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আছে জরুরি পরিস্থিতিতে SOS পাঠানোর সুবিধা। খুদে বার্তা আদান–প্রদান ও পেইড আবহাওয়ার পূর্বানুমানও পাওয়া সম্ভব ছোট্ট এই ডিভাইসের মাধ্যমে।
১০ জনের দলের বেশ কয়েকজন সদস্য ব্যবহার করছিলেন এই ট্র্যাকার। ট্র্যাকারের অস্বাভাবিক অবস্থান থেকেই প্রাথমিকভাবে আঁচ করা যায় কিছু একটা গোলমাল হয়েছে ১০ জনের এই দলের সঙ্গে। অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, প্রত্যাশিত অবস্থানের সঙ্গে কারও অবস্থান মিলছে না। ক্যাম্প-২ থেকে ক্যাম্প-৩–এ আরোহণের বদলে সবার অবস্থান দুর্ঘটনার স্থান থেকে কয়েক শ মিটার নিচে দেখাচ্ছিল। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে অবস্থানের এমন পরিবর্তন রীতিমতো অস্বাভাবিক।

তুষারধসের বীভৎসতা বোঝানোর জন্য কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই অবস্থানের পার্থক্যই যথেষ্ট। ব্রড পিকের বেজক্যাম্প থেকে ধারণকৃত এক ভিডিও দেখার পর মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল যেন। এমন মাপের তুষারধসের সামনে পর্বতারোহীরা তীব্র স্রোতের সামনে খড়কুটোর মতোই। শত শত টন বরফ আর তুষার যখন নিচের দিকে গড়াতে থাকে, তখন যাত্রাপথে আরও তুষার আর বরফের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর আকার আর শক্তি বৃদ্ধি হয়। যাত্রাপথের সবকিছুকে উপড়ে ফেলে দিয়ে তবেই থামে এই প্রলয়। উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার পর ওমানের প্রথম নারী এভারেস্ট আরোহীকে পাওয়া যায় বেজক্যাম্পের অদূরে। এতই তুষারধস-উদ্ভূত ভয়াবহ পতন সম্পর্কে আঁচ করা যায়। দুর্ঘটনার পরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছিল নানা খবর। সেগুলোর সত্যতা যাচাই করাটা অনেক ক্ষেত্রেই মুশকিল। কেউ কেউ বলছিলেন ট্র্যাকারের নড়াচড়ার কথা। তখন পর্বতারোহীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন অনেকে। তবে বিশাল একটা পতনের পরে ট্র্যাকারের এমন কৌশলগত ত্রুটি হতেই পারে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। ভারতের হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত ছয় হাজার মিটারের এক পর্বতের ১ নম্বর ক্যাম্প করেছিলাম পাঁচ হাজার মিটারের কিছুটা বেশি উচ্চতায়। টানা চার দিন ভয়াবহ তুষারপাতের কারণে তাঁবুর ভেতর আটকে থাকার পর পঞ্চম দিন সকালে ঝলমলে সূর্য দেখা দিল। তাঁবু থেকে বেরোনোর মিনিট দশেকের মধ্যেই ওপর থেকে বিকট এক আওয়াজ। শব্দ শুনে মনে হলো পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ছে! মনে হচ্ছিল ছয়-সাতটা বোয়িং বিমানের ইঞ্জিন আমার কানের ঠিক পাশে গর্জন করছে। ধেয়ে এল বিশাল এক তুষারধস। যাত্রাপথের সবকিছুকে সমূলে উৎপাটন করার লক্ষ্যে প্রবল আক্রোশে নিচে নামছে তুষারের এই প্রকাণ্ড গোলা। আমাদের তাঁবুর ঠিক ২০ ফুট দূর ঘেঁষে বেরিয়ে গেল কয়েক শ টন বরফ। এর যাত্রাপথের সামনে পড়লে টর্নেডোর সামনে পড়া পাখির পালকের মতো উড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। সেদিন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি স্রেফ।
পর্বতের বিপদসমূহ

পর্বতে পর্বতারোহীদের বিপদ মোটাদাগে দুই ধরনের। একটি হলো সাবজেকটিভ হ্যাজার্ড বা মানবসৃষ্ট বিপত্তি; আর অন্যটি অবজেকটিভ হ্যাজার্ড বা প্রাকৃতিক বিপদ। সাবজেকটিভ হ্যাজার্ড মূলত নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের ওপর। পর্বতারোহণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি, দুর্বল পরিকল্পনা, সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদক্ষতা, ক্লান্তি, তাড়াহুড়ো করা, সঠিক সরঞ্জাম না নিয়ে আসা কিংবা সরঞ্জামের ব্যবহার না জানা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, লম্বা সময় নিষ্ক্রিয় থাকা ইত্যাদি সাবজেকটিভ হ্যাজার্ডের আওতাধীন। এসব হ্যাজার্ডে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সঠিক প্রস্তুতি আর পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব ঘাটতি অনেকাংশেই পুষিয়ে নেওয়া যায়।
অন্যদিকে অবজেকটিভ হ্যাজার্ড মূলত প্রাকৃতিক কারণে হয়। তুষারধস, তুষারফাটল, পাথরধস, তুষারঝড়, বজ্রপাত, আবহাওয়া, হঠাৎ করে প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন, তীব্র বাতাস, ঝিরিতে পানি বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি অবজেক্টিভ হ্যাজার্ড বা প্রাকৃতিক বিপদের আওতাধীন। এই ধরনের বিপদগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণেই হয়। চারপাশের পরিবেশ এবং প্রকৃতিই এই ধরনের বিপদের কারণ। পর্বতারোহী হিসেবে আপনি যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন, এই প্রাকৃতিক বিপদগুলো থেকে কারও মুক্তি নেই।
তুষারধস কেন হয়?

তুষারধস বা অ্যাভালাঞ্চ হয় অনেকগুলো কারণে। তুষারধসের মূল কারণ অতিরিক্ত তুষারপাত। অল্প সময়ে অতিরিক্ত তুষারপাত হলে হিমবাহের নিচের স্তরের ওপর চাপ পড়ে। তখন তুষারধসের সম্ভাবনা বাড়ে। এ ছাড়া পাহাড়ের ঢালের ওপরও নির্ভর করে তুষারধসের প্রবণতা। পাহাড়ের ঢাল বেশি খাড়া হলে তুষার জমতে পারে না। ৪৫ ডিগ্রির বেশি খাড়া ঢালে সাধারণত তুষার পড়ার পরে সুস্থিত থাকে না। পড়ার পরপরই নিচের দিকে গড়িয়ে যায় বলে পরে এমন ঢালে বড় কোনো তুষারধসের সম্ভাবনা কমে যায়। তবে পর্বতের ঢাল ৩০-৪৫ ডিগ্রি হলেই সাধারণত ওই স্থানে তুষার জমতে থাকে। ফলে বাড়ে তুষারধসের ঝুঁকি।
আবার ভূমিকম্পের সময়ে তুষারধসের ঝুঁকি বাড়ে বহুগুণ। ২০১৫ সালে নেপালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের সময়ে এভারেস্ট আর ল্যাংটাং–এর পার্বত্য অঞ্চল কেঁপে উঠেছিল মুহুর্মুহু তুষারধসে। অনেক সময় পর্বতের ঢালে পর্বতারোহী বা স্কিয়ারদের চলাচলের কারণে তুষারধস হতে পারে। তবে এ ধরনের তুষারধস আকৃতিতে ছোট হয় এবং এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম থাকে। এ ছাড়া তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে স্বল্প সময়ে প্রচুর পরিমাণ তুষার বা বরফ গলে গিয়ে তুষারধস হতে পারে। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহের অবিন্যস্ত নড়াচড়া এখন বেশ সাধারণ ঘটনা। এর ফলেও সৃষ্টি হতে পারে তুষারধসের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়। হিমালয় বিশ্বের উচ্চতম পর্বতমালা হলেও এটি তরুণতম পর্বতমালাও বটে। এর অভ্যন্তরে টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালন আজও চলমান। এর ফলে হিমবাহের অবিন্যস্ত ও অনিয়মিত নড়াচড়ার ফলে তুষারধসের ঝুঁকিও এখানে বেশি।
তুষারধসের পূর্বানুমান কি সম্ভব

বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বলতে গেলে তুষারধসের পূর্বানুমান সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্ভুল অনুমান অসম্ভব। এ ধরনের পূর্বানুমান মূলত করা হয় ইউরোপের আল্পস পর্বতমালায়। তুষারপাতের ফলে ঝুঁকির পরিমাণ, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য ঢাল ইত্যাদি তথ্য নানা তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে আল্পসে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে আল্পসের নানা ঢালে অনেকগুলো ওয়েদার স্টেশন তৈরি করা আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো স্টেশনকে ইতিমধ্যে মনুষ্যবিহীন স্বয়ংক্রিয়ও করে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া আল্পসজুড়ে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও মাউন্টেন গাইডদের প্রশিক্ষিত দল আছে। তারা হিমবাহে নির্দিষ্ট বিরতিতে তুষারের গর্ত খুঁড়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে পূর্বানুমানে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য করে।
তবে এ ধরনের পূর্বানুমান আল্পসে করা সম্ভব হলেও হিমালয়ে সেটা আপাত অসম্ভব। এর পেছনে ১ নম্বর কারণ হলো হিমালয় পর্বতমালার অধিক উচ্চতা। আল্পসের সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর উচ্চতা চার হাজার মিটারের কাছাকাছি; আর এই পর্বতমালার গড় উচ্চতা আড়াই হাজার মিটারের মতো। অন্যদিকে হিমালয়ে সাত-আট হাজার মিটারের অনেকগুলো পর্বত আছে। সাথে যুক্ত হয়েছে হিমালয়ের দুর্গমতা। হিমালয়ের অতি উচ্চতার রুক্ষ আবহাওয়ায় মনুষ্যবিহীন স্বয়ংক্রিয় ওয়েদার স্টেশনগুলো টিকে থাকার সম্ভাবনাও শূন্য। এ ছাড়া হিমালয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের ওয়েদার স্টেশন তৈরির জন্য যে প্রয়োজনীয় রসদ ও অর্থ দরকার, সেগুলো জোগাড় করাও বিশাল চ্যালেঞ্জ।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়

দুর্ঘটনার ধরন এবং এখন অবধি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, এই দুর্ঘটনা পুরোপুরি একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো পর্বতারোহী কিংবা সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর কোনো দায় এতে নেই। এই দলে দারুণ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্বতারোহীরা যেমন ছিলেন, তেমনি অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সেভেন সামিট ট্রেকস, ইমাজিন নেপাল কিংবা এলিট এক্সপেড—পর্বতারোহণ জগতে এসব সংস্থার বেশ সুনাম আছে। লম্বা সময় ধরে সফলতার সঙ্গেই নেপাল ছাড়াও পাকিস্তান, তিব্বত, কিরগিজস্তান, পাতাগোনিয়ায় সফল অভিযান পরিচালনা করে আসছে তারা। এজেন্সিগুলোর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতাও পূর্ব পরীক্ষিত। নেপালি এজেন্সি ছাড়া এই দলে ছিলেন পাকিস্তানের পর্বতারোহী সোহেল সাখি। তিনি এই অভিযানের আগেই পাকিস্তানের পাঁচটি আট হাজার মিটার পর্বতই কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া আরোহণ করেছেন। তুষারধসের শিকার হওয়া পর্বতারোহীদের দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতার কমতি কোনো অংশেই ছিল না। নিজেদের হোমওয়ার্কটুকু পুরোপুরি সম্পন্ন করেই পর্বতে এসেছিলেন তাঁরা।

এবার আসে আবহাওয়ার কথা। অনেকের মনেই প্রশ্ন, আরোহণের জন্য এই সময়টাই কি আদর্শ? নিঃসন্দেহে কারাকোরাম হিমালয়ে জুন-জুলাই হলো ক্লাইম্বিংয়ের জন্য আদর্শ সময়। এ ছাড়া পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যেসব এজেন্সির আরোহীরা এই দুর্ঘটনায় পড়েছেন, তাঁরা সবাই পাহাড়ের আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানকারী নানা ওয়েবসাইটের পেইড সংস্করণ ব্যবহার করেন। পর্বতের আবহাওয়া বিশ্লেষণের জন্য এই সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞ ও বেতনভুক্ত আবহাওয়াবিদ আছেন ইউরোপের নানা দেশে।
দুর্ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর শুরু হয় উদ্ধারকার্যের তোড়জোড়। এই দেরিটুকু নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে। মনে রাখতে হবে, পর্বতে উদ্ধারকাজ সমতলের মতো সহজ নয়। পর্বতের নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আর আমলে নিয়েই এখানে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আবহাওয়া। সাধারণত দুপুরের পর থেকে পর্বতের আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে বলে এই সময় উদ্ধারকার্য চালানো রীতিমতো কষ্টসাধ্য।

এত সব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পরও মানুষ তার উচ্চাশা পূরণের জন্য পর্বতগুলোর কাছে বারবার ফিরে আসবেই। পর্বতও স্বমহিমায় থাকবে। মানুষ পর্বতে আসুক বা না আসুক, পর্বতে নিয়মিত বিরতিতে তুষারধস হবে, তুষারঝড় উঠবে, ওপর থেকে পাথর খসে পড়বে। এসব প্রাকৃতিক ঘটনায় মানুষ কিছুই করতে পারবে না। পর্বতারোহণে ঝুঁকি থাকবেই। ঝুঁকি এবং এ সম্পর্কিত বিপদগুলো মাথায় নিয়েই পর্বতারোহীরা পর্বত চড়তে যান। দিন শেষে পাহাড় থেকে কে বাড়ি ফিরবে, সেটা এখনো পাহাড়ই নির্ধারণ করে!
লেখক: এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী
ছবি: উইকিপিডিয়া ও ইনস্টাগ্রাম