আবুল খায়ের যে সাদা কাগজে সই দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল, ‘রোগীর নাম রাকিব হাসান, পিতা আবুল খায়ের। আমি এই লাশ নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আইনের আশ্রয় গ্রহণ করিব না এই শর্তে লাশ গ্রহণ করবো।’

রাকিব রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আইটিজেড স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। পরনে নেভি ব্লু টি-শার্ট আর কালো হাফপ্যান্ট। পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ। ৪ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার শরীরে আর কোথাও ছিল না আঘাতের চিহ্ন। এসব তথ্য রাকিবের সুরতহাল প্রতিবেদনের। তাকে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তির সময় যে টিকিট কাটা হয়েছিল, তাতে লেখা ছিল ‘হেড ইনজুরি’। পাশে বন্ধনীর ভেতরে লেখা ‘গ্রেনেড ব্লাস্ট’ বা গ্রেনেড বিস্ফোরণ।
দুই বছর পার হলেও আবুল খায়ের ভুলতে পারেননি সেই ১৯ জুলাইয়ের কথা। চলতি বছরের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ছেলের লাশের পাশে কয়েকজন পুলিশ ছিল। তারা আমাকে দিয়ে সাদা কাগজে সই করায়। সই না করলে আঞ্জুমানরে (আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম) বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেয়।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল ৫-এ বিদ্যুতের লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন আবুল খায়ের। রাকিবকে প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই মোহাম্মদপুরের বাসায় এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছিল আবুল খায়েরের সঙ্গে। প্রথম আলোতে ‘ছেলে হত্যার মামলা কার বিরুদ্ধে করব, বিচার চাইব কার কাছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন আবুল খায়ের কথা বলতেই ভয় পাচ্ছিলেন। একটা করে তথ্য দিয়েই বলছিলেন, ‘দেখবেন, আর কোনো ঝামেলা যেন না হয়।’

১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার আবুল খায়ের জানালেন, এখন জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটে তাঁর ছেলের নাম আছে। ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতাও পাচ্ছেন। ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে গ্রামের বাড়িতে জমি ও দোকান কিনেছেন। দোকান ভাড়া দিয়েছেন। মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ছেলের লাশ দেখার পর আমার তো তখন বেহুঁশের মতো অবস্থা। আমার এক চাচাতো ভাই মামলা করে। মামলা কোন পর্যায়ে আছে, তা জানি না।’
মারা যাওয়ার দিন বিকেল পর্যন্ত ঘরেই ছিল রাকিব। তারপর কোন ফাঁকে প্রতিদিনের মতো বাসার কাছের মাঠে ফুটবল খেলার জন্য বের হয়ে গিয়েছিল, বুঝতে পারেননি আবুল খায়ের। মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখেছেন রক্তাক্ত ছেলে পড়ে আছে, লোকজন ধরাধরি করে রিকশা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত ৮৪৩ জন শহীদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এই শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো ভুলতে পারেননি সন্তান বা ভাই-বোনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখার স্মৃতি। মামলার অগ্রগতি নিয়েও আছে অসন্তোষ। কোনো কোনো মামলার রায় হলেও তা বাস্তবায়ন কবে হবে, তা নিয়েও আছে হতাশা।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ

১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। গুলি মুগ্ধর কপালে লেগে মাথার ডান দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ২৬ বছর বয়সী মুগ্ধ ২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক পাস করেছিলেন। ২০২৪ সালের মার্চে ভর্তি হয়েছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি)। সেখানে তিনি ‘প্রফেশনাল এমবিএ’ করছিলেন। পাশাপাশি বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্রিল্যান্স চুক্তিতে কাজ করতেন।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে কাঁদানে গ্যাসের তীব্র ধোঁয়ায় চোখ খুলে রাখতে পারছিলেন না মুগ্ধ। ছাইরঙা টি-শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যেই হাতে পানির বোতলভর্তি বাক্স নিয়ে বলছিলেন, ‘কারও পানি লাগবে, পানি, পানি…।’ মুগ্ধর মোবাইলে এই ভিডিও করেছিলেন বন্ধু জাকিরুল ইসলাম। মুগ্ধ মারা যাওয়ার পর তাঁর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ এ ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করেন।

মুগ্ধ হত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন তাঁর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত। দাখিলের পর আদালত প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশের গুলিতেই মুগ্ধ নিহত হয়েছে, তাঁরা এটা নিশ্চিত হয়েছেন। এখন কোন পুলিশ সদস্যের গুলিতে মুগ্ধর মৃত্যু হয়েছে, কে বা কারা গুলির নির্দেশ দিয়েছেন, এগুলো বের করার দায়িত্ব সরকারের। তাই লিখিত অভিযোগে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার বিষয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। ২৬ জনকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। এতে সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপি উত্তরা বিভাগের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) কাজী আশরাফুল আজীম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিনসহ ২৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে ছয় মাস ধরে চেষ্টা করে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করে তারপর ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করি। সব তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার পরও এত দিন লাগছে। আমরা ভাই হত্যার ন্যায়বিচার চাই।’

মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ট্রাইব্যুনালে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২ নম্বর অভিযোগে অন্যদের সঙ্গে নাঈমা সুলতানাকে গুলি করে হত্যার বিষয়টি আছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ প্রথম নারী নাঈমা সুলতানা। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা ও আইনুন নাহার দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে নাঈমা ছিল দ্বিতীয়।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সড়কের ১৫ নম্বর বাড়ির নিচে পুলিশ ছাত্র–জনতাকে ধাওয়া দেয়। নাঈমা সুলতানা মেলে দেওয়া কাপড় ঘরে আনার জন্য বারান্দায় যায়। পুলিশের ছোড়া একটি গুলি মাথার বাঁ পাশে লেগে মাথার মগজ বেরিয়ে যায়। ওই বছরের ২৫ জুলাই ১৫ বছরে পা দিত নাঈমা।

উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের দশম শ্রেণিতে পড়ত সে। ১৬ জুলাই ফেসবুকে নাঈমা তার জীবনের শেষ পোস্টে লিখে, ‘আন্দোলন হবে এবার রং তুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক। মেধাবীরা মুক্তি পাক।’
নাঈমার বড় বোন তাসফিয়া সুলতানা, ছোট ভাই আবদুর রহমান এখনো ভুলতে পারছে না বোনের এমন মৃত্যু। নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের গুলি আমার বুক থেকে আমার মেয়েকে কেড়ে নিয়েছে। মেয়ের জন্মদিন আসে, মৃত্যুদিন আসে। আমরা খুব কষ্টে আছি। বড় মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলেটা পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। ওরাও স্বাভাবিক থাকতে পারে না। এভাবে মেয়েকে হারাতে হবে, তা তো কল্পনাও করি নাই। এখন মেয়ে হত্যার বিচারটা চাই।’
মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ

গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় আড়াই মাস পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৯ মাসে জুলাইয়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধকেন্দ্রিক ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়। এর একটি হলো ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে শাহারিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক হত্যাকাণ্ডের মামলা। গত ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক এডিসি শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের, সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় নিহত হয় ১৬ বছর ৯ মাস বয়সী আনাস। সেদিন সকালে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের জন্য একটি চিঠি রেখে গিয়েছিল। আনাস চিঠিতে লিখেছিল, ‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি।…স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না…। একদিন তো মরতেই হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় কোরে স্বার্থপরের মতো ঘরে বোসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেয়…। আমি যদি বেচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।—আনাস।’ গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমিতে বিজ্ঞান বিভাগে দশম শ্রেণিতে পড়ত আনাস। ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল সে।
গত ১৫ জুলাই কথা হয় আনাসের মা সানজিদা খানের সঙ্গে। একমুহূর্তেই হিসাব করে জানালেন, ৭১০ দিন (সেদিন পর্যন্ত) হলো আনাস নেই। কষ্টটা সেই প্রথম দিনের মতো একই আছে। বেলা সোয়া তিনটা বাজলেই মনে হয় এই বুঝি আনাস স্কুল থেকে ফিরল। বললেন, ‘রক্তাক্ত হয়ে সন্তান দুনিয়া থেকে চলে গেছে, আমার এই কষ্টটা আর কেউ বুঝতে পারবেন না, আমি চাইও না আর কোনো মা এই কষ্টটা বুঝতে পারুক।’

যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছে, তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সাজা অল্প হওয়াটা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করে রায়ের পর শুধু আনাসের মা–বাবা নন, শহীদ পরিবারের অন্য সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রায়ের পরের দিন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হয়।
বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া পাঁচ আসামিকে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন বা মুক্তি না দেওয়া, অপেক্ষাকৃত কম সাজা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, সেগুলোর স্থগিতাদেশ চেয়ে ৩০ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। পরে ১ ফেব্রুয়ারি কম সাজাপ্রাপ্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যের সাজা বাড়াতে করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের মুক্তি না দিতে এবং তিন বছরের দণ্ডপ্রাপ্তের বিষয়ে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন আদালত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন রংপুরে আন্দোলনের প্রধান একজন সমন্বয়ক। গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় দেন। রায়ে দুজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বাকি ২৫ জনকে রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এ রায় ঘোষণার পর আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, বড় ভাই রমজান আলী অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ১৬ জুলাই রমজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হইনি। তারপরও দ্রুত রায়টা বাস্তবায়ন হবে, আমরা এটাই চাই।’ আবু সাঈদের ছোট বোন সুমি খাতুন বলেন, ‘বৈষম্য দূর হয় নাই। লাভ তো কিছু দেখতেছি না। ভাই জীবনটাই শুধু দিল। ভাইয়ের মামলার রায়টাও কার্যকর হচ্ছে না। আমার ভাই আলোচনায় ছিল, তার মামলারই এ অবস্থা হলে অন্য শহীদ যারা আলোচনাতেই নেই, তাদের কী অবস্থা, তা তো বোঝাই যাইতেছে। আমরা সব শহীদের মামলার ন্যায়বিচার চাই।’

গত ২৯ মার্চ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মোট আসামি ১১ জন। এর মধ্যে ৯ জন পলাতক। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে তাইম। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশ গুলি করার সময় বন্ধু মো. রাহাত হোসাইন তাইমকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তাইমের বড় ভাই রবিউল আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর থেকে ভাইসহ শহীদদের ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথেই দিন কাটছে তাঁর। মা মন চাইলেই কুমিল্লায় ভাইয়ের কবরের কাছে ছুটছেন, কাজলায় ঘটনাস্থলে গিয়ে বসে থাকছেন। বাবা স্ট্রোক করেছেন। আসামিদের চিহ্নিত করে দেওয়ার পরও ধরতে পারে না। জামিনে ছাড়া পায়। আসলেই বিচার করার মনমানসিকতা থাকলে বিচার করা অবশ্যই সম্ভব। তথ্যপ্রমাণ সবই তো আছে।