সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / ইসরায়েল ও ইউরোপের ডানপন্থীদের নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ
ইসরায়েল ও ইউরোপের ডানপন্থীদের নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

ইসরায়েল ও ইউরোপের ডানপন্থীদের নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

সেউতার দৃশ্যগুলো ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। হাজার হাজার অসহায় মানুষ মরক্কো থেকে স্পেনের ওই ছিটমহলে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে বেশ কয়েকজন মারা যান এবং ইউরোপের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক আলোচনাটি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে এই সংকটের মানবিক দিকটি স্পষ্ট হওয়ার আগেই তা অন্য এক ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে যায় ‘ইসলামি আগ্রাসনে’র সতর্কবার্তায়। চরম ডানপন্থী নেটওয়ার্কগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে #স্টপইসলাম হ্যাশট্যাগ। দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসা রাজনীতিবিদেরা এই ঘটনাকে লুফে নেন।

তাঁরা দাবি করতে শুরু করেন যে ইউরোপের সামনে আসা এই চ্যালেঞ্জটি কেবল সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং এটি তাদের সভ্যতার ওপর আঘাত। দ্রুতই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার দাবি ওঠে। ইতালি এমনকি স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্ত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা আবারও চালুর ঘোষণা দেয়।

এই পরিবর্তনের দ্রুততাই সম্ভবত এই সংকটের সবচেয়ে বড় সত্য প্রকাশ করে দেয়।

সীমান্ত পার হওয়ার পেছনের মূল কারণ তদন্তকারী দলগুলো জানার আগেই এবং যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের অনেকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও অনলাইন প্রচারকারীরা বিষয়টি নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত মতামত তৈরি করে ফেলেছিলেন। ট্র্যাজেডিটি যতটা বিশ্লেষণের দাবি রাখে, এই তাড়াহুড়াও ঠিক ততটাই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তাই এই মুহূর্তে মূল প্রশ্নটি হলো—সেউতার ঘটনাকে যেভাবে সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হলো, তা থেকে আসলে কে লাভবান হলো?

কারা সুবিধা পেয়েছে, তা দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে যায়। ইউরোপের জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীরা অভিবাসন ও ইসলাম নিয়ে তাদের পুরোনো হুঁশিয়ারিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার নতুন রসদ পেয়ে যায়। ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকারীরা মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরার আরও একটি সুযোগ পায়।

একই সময়ে ঘটনাটি ইসরায়েল সরকার এবং ইউরোপে তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের ছড়ানো একটি বড় প্রচারণাকে জোরদার করে। সেই প্রচারণাটি হলো—মুসলিম অভিবাসন, ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো নাকি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

লড়াইটি এখন বৈধতার। লড়াইটি হলো—কার কণ্ঠস্বর বিশ্বাসযোগ্য বলে গণ্য হবে, কার দুর্ভোগ স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য এবং কোন রাজনৈতিক দাবিটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতিকে যদি গাজার ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ হিসেবে না দেখে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখানো হয়, তবে সবার মনোযোগ রাষ্ট্রের অপরাধ থেকে সরে গিয়ে প্রতিবাদকারীদের পরিচয়ের ওপর গিয়ে পড়ে।

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই ধরনের বক্তব্য আরও জোরদার হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার বিরুদ্ধে ইউরোপজুড়ে যখন জনক্ষোভ তুঙ্গে, তখন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার দাবি করছেন যে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে নয়, বরং ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার কারণেই নাকি ইউরোপীয়দের মানসিকতায় এমন পরিবর্তন আসছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেও এই দলে আছেন। বিভিন্ন বক্তৃতা ও বক্তব্যে তিনি ইসরায়েল ও ইউরোপকে উগ্র ইসলাম, গণ-অভিবাসন এবং তথাকথিত পশ্চিমা সভ্যতার সংকট মোকাবেলায় এক যৌথ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই ভাষ্যমতে, ইসরায়েল কেবল নিজেকে রক্ষা করছে না, তারা আসলে পুরো ইউরোপকেই রক্ষা করছে।

রাজনৈতিকভাবে এই প্রচারণার পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

এটি আলোচনাকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার দিক থেকে সরিয়ে যারা সমালোচনা করছে তাদের পরিচয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ইসরায়েলের নীতির বিরোধিতা তখন আর মানবিক বিপর্যয়, দখলদারত্ব বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয় না। এর বদলে এটিকে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক প্রভাবের ফল হিসেবে জাহির করা হয়। অথচ বাস্তব সত্য হলো, ইউরোপীয় দেশগুলোতে শতকরা ৭৮ ভাগ পর্যন্ত মানুষ ইসরায়েলকে পছন্দ করে না—যে দেশগুলোতে মুসলিমদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের চেয়েও কম।

তা সত্ত্বেও ভিকতর ওরবান, গিয়ার্ট ভিল্ডার্স এবং মারিন লঁ পেনের মতো রাজনৈতিক নেতারা এই একই বক্তব্য আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁরা একদিকে ইসরায়েলের প্রতি শক্ত সমর্থন জানাচ্ছেন, অন্যদিকে কঠোর অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।

যুক্তরাজ্যের টমি রবিনসনের মতো চরিত্রগুলো একইভাবে ইসরায়েলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক সভ্যতার লড়াইয়ের অগ্রভাগ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ক্রমেই ইসরায়েলের প্রতি এই সমর্থনটি অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং ইসলামবিরোধিতার একটি বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।

এই যে রাজনৈতিক স্বার্থের মেলবন্ধন, তা সত্যিই অভাবনীয়।

ইউরোপের ডানপন্থীদের একাংশের জন্য ইসরায়েলকে সমর্থন করাটা নিজেদের ইহুদি সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে জাহির করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা তাদের মুসলিম সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের জন্য এই আন্দোলনগুলো কূটনৈতিক সমর্থনের একটি বড় নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি করে। সেই সঙ্গে এটি প্রচার করতে সাহায্য করে যে ইসরায়েলের সমালোচনা মানেই তা অভিবাসন ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। উভয়ের রাজনৈতিক লক্ষ্য আলাদা হতে পারে, তবে তারা একে অপরকে সাহায্য করছে।

এর প্রভাব কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই।

ইউরোপজুড়ে ফিলিস্তিন–সংক্রান্ত আলোচনাগুলোকে এখন ক্রমে নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখা হচ্ছে। গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা বিক্ষোভগুলোকে রাজনৈতিক ভিন্নমত হিসেবে না দেখে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। মুসলিম সংগঠনগুলোকে দেখা হচ্ছে চরমপন্থা দমনের দৃষ্টিকোণ থেকে।

ফিলিস্তিনিদের অধিকারের আন্দোলনগুলোকে মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক আইনের আন্দোলন হিসেবে না দেখে, কিছু কিছু জায়গায় সেগুলোকে আমদানি করা ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এর কোনো কিছুই ইহুদিবিদ্বেষের আসল সত্যকে ছোট করে না। ইহুদিবিদ্বেষ একটি গুরুতর ও চলমান বর্ণবাদ, সেটাও প্রতিরোধ করতে হবে।

কিন্তু প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করা আর ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ হিসেবে তকমা দেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য যখন ঝাপসা হয়ে যায়, তখন যুক্তিসংগত আলোচনার সুযোগ কমে আসে। এর ফলে রাজনৈতিকীকরণের কারণে আসল ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারটিও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সেউতার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ সীমান্ত বা অভিবাসনের গল্প থাকে না।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্লেষক ও অ্যাকটিভিস্টরা যেভাবে অতি দ্রুত একই ধরনের তত্ত্বে একমত হলেন, তা থেকে বোঝা যায় যে এসব ঘটনাকে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করার রাজনৈতিক অবকাঠামো আগে থেকেই তৈরি ছিল।

এটি পরিকল্পিত হোক বা পুরোপুরি কাকতালীয়, রাজনৈতিক প্রভাব কিন্তু একই। একটি প্রচারণা অন্যটিকে সমর্থন জোগায়। অভিবাসন ভীতি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ায়। আর মুসলমানদের প্রতি এই ঘৃণা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করাকেও সন্দেহজনক করে তোলে।

ফিলিস্তিনের অধিকারের দাবিকে যখন মানবিক বা রাজনৈতিক বিষয়ের বদলে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখানো হয়, তখন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে সহজেই উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখন লড়াইটা কেবল সীমান্ত রক্ষা নিয়ে নয়।

লড়াইটি এখন বৈধতার। লড়াইটি হলো—কার কণ্ঠস্বর বিশ্বাসযোগ্য বলে গণ্য হবে, কার দুর্ভোগ স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য এবং কোন রাজনৈতিক দাবিটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতিকে যদি গাজার ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ হিসেবে না দেখে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখানো হয়, তবে সবার মনোযোগ রাষ্ট্রের অপরাধ থেকে সরে গিয়ে প্রতিবাদকারীদের পরিচয়ের ওপর গিয়ে পড়ে।

সেউতার ঘটনাকে প্রথম এবং প্রধানত একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে স্মরণ করা উচিত ছিল। অথচ তা না হয়ে, এটি ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজনীতির লড়াইয়ের আরেকটি অধ্যায়ে পরিণত হলো।

  • আহমেদ নাজার একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাট্যকার

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

About Editor Todaynews24

Check Also

জিডি তদন্তে আদালতের অনুমতি, জনভোগান্তি কমল নাকি বাড়ল

জিডি তদন্তে আদালতের অনুমতি, জনভোগান্তি কমল নাকি বাড়ল

এই বিধান বর্তমান বাস্তবতায় কতটা কার্যকর? বিচারিক তদারকির স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেও কি নাগরিককে আরও দ্রুত ও কার্যকর সেবা দেওয়ার কোনো পথ নেই?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *