সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / বর্ষার চলনবিল: পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা
বর্ষার চলনবিল: পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা

বর্ষার চলনবিল: পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু…

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্‌ক্তির গূঢ় অর্থ জীবনের কত বড় এক চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে আছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম শ্রাবণের এক সোনাঝরা বিকেলে। আমার জন্মভূমি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় হলেও বর্ষার ভরা মৌসুমে জলমগ্ন চলনবিল স্বচক্ষে দেখার সুযোগ কোনো দিন হয়ে ওঠেনি। অথচ নিজের গ্রামের বাড়ি থেকে এই বিশাল জলরাজ্যের দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। ঘরের কাছের রূপসী প্রকৃতিকে আড়ালে রেখে দূরদূরান্তে সৌন্দর্য খোঁজার একধরনের প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যেই কাজ করে। তবে এবার সেই ভুল ভাঙল।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

কর্মস্থল খুলনা হওয়ার কারণে আমার গ্রামের বাড়িতে একটু কম যাওয়া হয়। তবে এলাকার কিছু শুভাকাক্ষী আমার নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল মাহাতো। গত সপ্তাহে বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই তার উৎফুল্ল ফোন, ‘স্যার, বাড়ি আসছেন শুনলাম? চলনবিল দেখতে যেতে হবে, দারুণ এক জায়গা!’ সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিলেন দৈনিক প্রথম আলোর রায়গঞ্জ-তাড়াশ প্রতিনিধি সাজেদুল আলম এবং কালের কণ্ঠ ও মাই টিভির তাড়াশ প্রতিনিধি সনাতনদা। মূলত তাঁদের আন্তরিক উদ্যোগ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শুক্রবার বেলা ঠিক তিনটায় রায়গঞ্জের নিমগাছি বাজার থেকে রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে আমাদের কাক্ষিত যাত্রা শুরু হলো।

তাড়াশ বাজার থেকে সাংবাদিক সনাতনদাকে সঙ্গী করে সোজা পৌঁছালাম কামারশোন গ্রামে। কামারশোন ঘাট থেকে কুন্দইলের নৌকা ছাড়ে। তখন বিকেল প্রায় চারটা। রাস্তার দুই ধারে থইথই জলরাশি। পিচঢালা পাকা রাস্তাটি এক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে; মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো সমুদ্রের মাঝখানের কাল্পনিক কোনো সড়ক দিয়ে এগিয়ে চলেছি। জলমগ্ন সড়কে স্থানীয় তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর দৃশ্য এক দারুণ রোমাঞ্চকর আবহ তৈরি করেছিল।

কামারশোন থেকে অন্যদের মতো আমরাও দেশীয় ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় চড়ে রওনা হলাম কুন্দইল ব্রিজের উদ্দেশে। পথে দেখা গেল অসংখ্য নৌকাভর্তি মানুষ বিল দেখতে এসেছেন। অনেক নৌকায় ভারী বাদ্যযন্ত্রও চোখে পড়ল। কুন্দইল ব্রিজে পৌঁছে দেখা মিলল হাজারো দর্শনার্থীর এক মুখরিত মিলনমেলা। ঘাটজুড়ে সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ব্যস্ততা ও হাঁকডাক, আর ব্রিজের উঁচু রেলিং থেকে টলমলে পানির বুকে তরুণদের ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্য পুরো এলাকাকে এক বর্ণিল উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলেছে। কেউ মুঠোফোনে প্রিয় মুহূর্তের স্মৃতি বন্দী করছেন, কেউবা রঙিন শাড়ি পরে বিলের জলে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ কেবল শান্ত জলরাশি ও দূর দিগন্তের সবুজের মিতালি দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চলনবিলের রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব। পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ—এই ৩ জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৬২টি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত চলনবিল হলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জলাভূমি। বর্ষাকালে এর আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে রূপ নেয়। জানা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর কুঠিবাড়ি থেকে নওগাঁর পতিসর কুঠিবাড়িতে যাতায়াতের জন্য এই চলনবিলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আত্রাই নদী ব্যবহার করতেন। রূপসী চলনবিলের বুকজুড়ে নৌকায় ভেসে যেতে যেতেই নাকি রচিত হয়েছিল তাঁর কালজয়ী বহু কবিতা ও ছোটগল্প।

ভরা বর্ষায় চলনবিলের এই রূপান্তর শুধু চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন সম্ভাবনা। সম্প্রতি তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়ক অবকাঠামোর অভাবনীয় উন্নতি হওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা বহুগুণ বেড়েছে। বিলপাড় ঘিরে গড়ে উঠেছে শত শত অস্থায়ী ভাজাপোড়া, চা-বিস্কুট, স্থানীয় চাটনি ও মিষ্টি-ফলমূলের দোকান। আষাঢ় থেকে আশ্বিন এই চার মাস চলনবিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাঝি, চালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকায় আসে নতুন গতিশীলতা।

বর্ষার পানি নামলেই চলনবিল যেন তার চিরচেনা রূপ বদলে এক সুবিশাল জলসাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষের প্রকৃতির সান্নিধ্যে ফেরার এই ব্যাকুলতা প্রমাণ করে, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে চলনবিল হতে পারে সমগ্র উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র। ঘরের কাছের এই অপরূপ সৌন্দর্যকে নতুন করে দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে শেখাল আনন্দ ও রূপ খোঁজার জন্য দূর দিগন্তে ছোটাই শেষ কথা নয়, কখনো কখনো নিজের দৃষ্টির সীমানার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হৃদয়ের পরম প্রশান্তি।

লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা

About Editor Todaynews24

Check Also

গণতন্ত্র রাজপথে নয়, সংসদে হওয়া উচিত: তথ্যমন্ত্রী

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে রাজপথে না নিয়ে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন। বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে বরিশাল নগরীর আমতলার মোড় এলাকায় জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *