সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / মানুষের চোখে সাদা অংশ কেন থাকে
মানুষের চোখে সাদা অংশ কেন থাকে

মানুষের চোখে সাদা অংশ কেন থাকে

কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রথমে কোথায় চোখ যায়? অনেকেই বলবেন, চোখে। নীল, সবুজ, বাদামি কিংবা চোখের কালো রং সহজেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু চোখের আরও একটি অংশ আছে, যেটিকে আমরা প্রায় খেয়ালই করি না। সেটি হলো চোখের সাদা অংশ। অথচ এই সাধারণ সাদা অংশই মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ধরুন, কেউ আপনার পাশ দিয়ে হঠাৎ তাকাল। আপনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেললেন, তিনি কোন দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো আপনিও সেই দিকে তাকালেন। এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাদের জীবনে এতটাই স্বাভাবিক যে এর পেছনের কারণ নিয়ে আমরা ভাবিই না।

১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী শিরো কোশিমা বিভিন্ন প্রাইমেটের চোখ তুলনা করে একটি বিষয় লক্ষ করেন। তিনি দেখেন, মানুষের চোখের সাদা অংশ অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। তাঁর ধারণা ছিল, এই সাদা অংশের কারণে খুব সহজেই বোঝা যায়, একজন মানুষ ঠিক কোথায় তাকিয়ে আছেন। সাদা অংশ বা স্ক্লেরা এং কালো মণির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য থাকায় চোখের দিক নির্ণয় করা সহজ হয়ে যায়। আমাদের চোখের আকৃতিও তুলনামূলকভাবে লম্বাটে, যা এই কাজকে আরও সহজ করে।

গবেষক শুধু চোখ দিয়ে ওপরের দিকে তাকালেই তারা প্রায় তিন গুণ বেশি ছাদের দিকে তাকাচ্ছিল। অন্যদিকে গরিলা ও শিম্পাঞ্জিরা চোখের চেয়ে মাথার নড়াচড়ার ওপর বেশি ভরসা করেছিল।

পরে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মাইকেল তোমাসেলো এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করা, একে অন্যের মনোযোগ বোঝা কিংবা কোনো একটি বিষয়ের দিকে সবাইকে দৃষ্টি ফেরাতে চোখের সাদা অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই ধারণা পরীক্ষা করার জন্য গবেষকেরা একটি মজার পরীক্ষা চালান। সেখানে ছিল ছোট্ট মানবশিশু, গরিলা ও শিম্পাঞ্জি। একজন গবেষক কখনো শুধু চোখ দিয়ে ছাদের দিকে তাকালেন, আবার কখনো শুধু মাথা উঁচু করলেন, কিন্তু চোখ বন্ধ রাখলেন।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। মানবশিশুরা মূলত চোখের দিক অনুসরণ করল। গবেষক শুধু চোখ দিয়ে ওপরের দিকে তাকালেই তারা প্রায় তিন গুণ বেশি ছাদের দিকে তাকাচ্ছিল। অন্যদিকে গরিলা ও শিম্পাঞ্জিরা চোখের চেয়ে মাথার নড়াচড়ার ওপর বেশি ভরসা করেছিল। অর্থাৎ ওরা বুঝতে চেষ্টা করেছে, মাথা কোন দিকে ঘুরেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গরিলা চোখের চেয়ে মাথার নড়াচড়ার ওপর বেশি ভরসা করে

চোখের এই ক্ষমতা মানুষের জীবনে খুব ছোটবেলা থেকেই কাজ করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নবজাতক সেই মুখের দিকে বেশি সময় তাকিয়ে থাকে, যে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুই থেকে চার মাস বয়সের মধ্যে শিশুরা অন্যের দৃষ্টির দিক অনুসরণ করতে শেখে। প্রায় আট মাস বয়সে এটি তাদের নিয়মিত আচরণে পরিণত হয়।

মাইকেল তোমাসেলোর মতে, মানুষের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করা, একে অন্যের মনোযোগ বোঝা কিংবা কোনো একটি বিষয়ের দিকে সবাইকে দৃষ্টি ফেরাতে চোখের সাদা অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এর একটি বড় সুবিধা হলো ভাষা শেখা। ধরুন, আপনি একটি শিশুর সামনে একটি বলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা বল।’ শিশুটি আপনার চোখ অনুসরণ করে বলটির দিকে তাকাবে। এরপর ধীরে ধীরে সে বস্তুটির নাম শিখে ফেলবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু অন্যের চোখের দৃষ্টি বেশি অনুসরণ করে, তাদের শব্দভান্ডারও তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে।

তবে সব গবেষকই যে শুধু চোখের সাদা অংশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তা নয়। ইউনিভার্সিটি অব লাস পালমাস দে গ্রান কানারিয়ার গবেষক হুয়ান পেরেয়া-গার্সিয়া বলেন, শুধু সাদা রং নয়, বরং চোখের মণি ও স্ক্লেরার মধ্যে বৈপরীত্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সব মানুষের স্ক্লেরা একেবারে একই রকম সাদা নয়। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক মানুষের স্ক্লেরায় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা গাঢ় ভাব দেখা যায়।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের চোখের সাদা অংশ বেশি দৃশ্যমান হওয়ায় চোখের পুরো আকৃতি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। গবেষকেরা শিম্পাঞ্জির চোখের ছবি ডিজিটালভাবে পরিবর্তন করে স্ক্লেরা সাদা করে দেন। দেখা যায়, তখন তাদের দৃষ্টির দিক বোঝাও অনেক সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ শুধু মণির রং নয়, চোখের পুরো গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিভার্সিটি অব লাস পালমাস দে গ্রান কানারিয়ার গবেষক হুয়ান পেরেয়া-গার্সিয়া বলেন, শুধু সাদা রং নয়, বরং চোখের মণি ও স্ক্লেরার মধ্যে বৈপরীত্যও গুরুত্বপূর্ণ।

চোখের সাদা অংশ আমাদের শরীর সম্পর্কেও অনেক তথ্য দেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে কিছুটা হলদে বা লালচে হতে পারে। আবার হঠাৎ স্ক্লেরা খুব বেশি হলুদ হয়ে গেলে তা হতে পারে জন্ডিসের লক্ষণ। অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেলে চোখের সংক্রমণের ইঙ্গিতও দিতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যাদের চোখের সাদা অংশ পরিষ্কার ও উজ্জ্বল, অন্যরা তাঁদের তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্থ ও কম বয়সী বলে মনে করেন।

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য মানুষের চোখের দিকে তাকাই। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে বুঝে ফেলি, তারা কী দেখছে বা কিসে মনোযোগ দিচ্ছে। এত সাধারণ একটি কাজের পেছনে যে চোখের সাদা অংশ এত বড় ভূমিকা রাখে, তা হয়তো আমরা আগে কখনো ভাবিনি। ছোট্ট এই সাদা অংশটি নীরবে আমাদের যোগাযোগকে আরও সহজ, দ্রুত ও অর্থবহ করে তুলছে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

About Editor Todaynews24

Check Also

যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন করছে রুশ বাহিনী

উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মোতায়েন শুরু হয়েছে। এই ইউনিটে ৬টি উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে। সেগুলো দিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে মস্কো। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানান। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে এ যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার তৈরি ব্যালিস্টিক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *