সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / হাকিকতের মানদণ্ড : ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সত্যতত্ত্ব
হাকিকতের মানদণ্ড : ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সত্যতত্ত্ব

হাকিকতের মানদণ্ড : ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সত্যতত্ত্ব

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্ব যখন বলে, সত্যের উৎস এক এবং সব সহি জ্ঞান অবশেষে একই হাকিকতের দিকে অগ্রসর হয়, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে।

কোন জ্ঞানকে সত্য বলা হবে? শুধু কোনো বক্তব্যের জনপ্রিয়তা, কার্যকারিতা কিংবা পরীক্ষাগারভিত্তিক পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা কি সত্যের জন্য যথেষ্ট? নাকি সত্যের এমন কোনো গভীরতর মিজান (মানদণ্ড) রয়েছে, যা বাস্তবতার বিভিন্ন স্তরকে একত্রে বিচার করে? এই প্রশ্নের উত্তর ব্যতীত জ্ঞানের ঐক্যের দাবিও অপূর্ণ থেকে যায়।

জ্ঞান ও সত্যে তফাত আছে। সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি। জ্ঞান হলো সেই সত্যকে উপলব্ধি করার মানবিক কুশেশ। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্যকে শুধু তথ্যের যথার্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় না। তথ্য সত্যের একটি স্তর হতে পারে, কিন্তু সত্যের কামাল নয়। সত্য হলো এমন জ্ঞান, যা অস্তিত্বের প্রকৃত নেজামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অর্থাৎ কোনো বক্তব্য তখনই সত্য, যখন তা সৃষ্টিগত বাস্তবতার সঙ্গে, মানব-ফিতরাতের সঙ্গে, নৈতিক ইনসাফের সঙ্গে এবং অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে না। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্য কোনো বিচ্ছিন্ন তথ্য নয়; বরং একটি সমগ্র সামঞ্জস্য (ইনসিজাম)।

এই সামঞ্জস্য যত প্রগাঢ় ও বিস্তৃত হয়, জ্ঞানের সত্যতাও তত গভীর হয়। মিথ্যা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে; সত্য সংযোগ সৃষ্টি করে। সত্যের বৈশিষ্ট্যই হলো বাস্তবতার বিচ্ছিন্ন স্তরকে একটি অর্থপূর্ণ নেজামে সংযুক্ত করা।

সত্য এক হলেও তার উপলব্ধির স্তর এক নয়। কোনো জ্ঞান সত্যের আংশিক দিককে ধারণ করতে পারে, আবার কোনো জ্ঞান সেই সত্যকে অধিকতর সমগ্রভাবে প্রকাশ করতে পারে। অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্যের নিকটবর্তিতা ও দূরবর্তিতারও একটি স্তরক্রম রয়েছে। যে জ্ঞান যত অধিক বাস্তবতা, ফিতরাত, নৈতিকতা ও ওহিগত মিজানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে তত অধিক সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

ওহি এমন এক দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, যা সৃষ্টির সামগ্রিক নেজামকে একই সঙ্গে অবলোকন করে। ফলে সত্য নির্ণয় কোনো একক পরীক্ষার ফল নয়, বরং বহুস্তরীয় শাহাদতের মজমা।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা সত্যকে একাধিক স্তরে যাচাই করে।

ক. বাস্তবতার সাক্ষ্য। কোনো জ্ঞানকে অবশ্যই সৃষ্টিজগতের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পরীক্ষায় কামিয়াব হতে হবে।

খ. ফিতরাতের সাক্ষ্য। মানুষের সুস্থ ও বিকৃতিমুক্ত অন্তঃপ্রকৃতি যদি দায়েমিভাবে কোনো বিষয়কে অন্যায়, অমানবিক বা ভারসাম্যবিরোধী বলে অনুভব করে, তবে সেই জ্ঞানকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

গ. নৈতিক সাক্ষ্য। যে জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে জুলুম, ধ্বংস ও আমানতভঙ্গের দিকে নিয়ে যায়, সে জ্ঞান আংশিকভাবে কার্যকর হলেও পূর্ণ সত্যের মর্যাদা লাভ করতে পারে না।

ঘ. ওহিগত সাক্ষ্য। কারণ, ওহি এখানে প্রতিযোগী জ্ঞান নয়, বরং অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাগত মিজান। কারণ, মানুষের অভিজ্ঞতা আংশিক, যুক্তি সীমাবদ্ধ এবং পর্যবেক্ষণ পরিবর্তনশীল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা অস্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানধারী।

অতএব ওহি এমন এক দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, যা সৃষ্টির সামগ্রিক নেজামকে একই সঙ্গে অবলোকন করে। ফলে সত্য নির্ণয় কোনো একক পরীক্ষার ফল নয়, বরং বহুস্তরীয় শাহাদতের মজমা।

এ কারণে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা উপযোগবাদী সত্যতত্ত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে। কোনো ধারণা শুধু কার্যকর হলেই সত্য হয়ে যায় না। ইতিহাসে বহু অন্যায় ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী কার্যকর ছিল; কিন্তু কার্যকারিতা তাদের ন্যায়সংগত করেনি। একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনও সত্যের একিন নয়। কারণ, সত্য ভোটের ফল নয়; সত্য বাস্তবতার সঙ্গে সংগতির নতিজা।

আবার শুধু যুক্তিগত সামঞ্জস্যও যথেষ্ট নয়। একটি ধারণা অন্তর্গতভাবে সুশৃঙ্খল হলেও যদি তা মানবমর্যাদা, প্রকৃতির ভারসাম্য কিংবা অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করে, তবে তা পূর্ণ সত্যের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না।

কোনো নতুন জ্ঞান সত্যকে বদলাতে পারে না। সে সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক ও বোধকে পারে আলোকিত করতে। সত্য নিজে অপরিবর্তনীয়, কিন্তু সত্য সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি ক্রমাগত পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। এ কারণে নতুন আবিষ্কার সত্যের দুশমন নয়, বরং সত্যের অধিকতর উন্মোচনের সম্ভাবনা।

যখন কোনো নতুন জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত সত্যের সঙ্গে আপাতবিরোধ সৃষ্টি করে, তখন ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা প্রথমেই সত্যকে নয়, বরং মানুষের ব্যাখ্যা, পদ্ধতি ও উপলব্ধিকে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানায়।

সত্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার তাওহিদি চরিত্র। সত্য অস্তিত্বকে যথার্থ সম্পর্ক, উদ্দেশ্য ও আমানতের ভেতরে স্থাপন করে। ফলে সত্যের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর বাতিলের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের বিচ্ছেদ।

সত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার ফলপ্রসূতা। তবে এই ফলপ্রসূতা সৃষ্টিগত মিজানের সংরক্ষণের অর্থে, তাৎক্ষণিক সাফল্যের অর্থে নয়। যে জ্ঞান মানুষকে আমানতদার বানায়, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ককে ন্যায়ভিত্তিক করে, সমাজে ইনসাফ কায়েম করে এবং মানুষের অন্তরকে ফিতরাতের দিকে রুজু করায়, সেই জ্ঞান সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী।

কারণ, সত্য শুধু জানার বিষয় নয়, সত্য অস্তিত্বকে তার যথার্থ স্থানে কায়েম করার শক্তিও। অপর দিকে বাতিল হলো এমন জ্ঞান, যা নেজামের ভেতর বিচ্ছিন্নতা, জুলুম, ফিতরাতবিরোধিতা ও উদ্দেশ্যহীনতা পয়দা করে।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্য কোনো একক তথ্য, বিচ্ছিন্ন যুক্তি কিংবা সাময়িক কার্যকারিতার নাম নয়। সত্য হলো এমন এক সমন্বিত হাকিকত, যেখানে বাস্তবতা, ফিতরাত, নৈতিকতা, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও ওহি একই নেজামে এসে পরস্পরকে সাক্ষ্য দেয়। এই সাক্ষ্যগুলোর মধ্যে যত গভীর ইনসিজাম (সামঞ্জস্য) প্রতিষ্ঠিত হয়, সত্য তত অধিক উন্মোচিত হয়।

সত্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার তাওহিদি চরিত্র। সত্য অস্তিত্বকে যথার্থ সম্পর্ক, উদ্দেশ্য ও আমানতের ভেতরে স্থাপন করে। ফলে সত্যের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর বাতিলের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের বিচ্ছেদ।

কাজেই শুধু একটি বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করলেই সত্যকে জানা হয়ে যায় না, বরং সত্য জানা মানে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন, যা মানুষ, প্রকৃতি ও সৃষ্টির সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অস্তিত্বকে তার যথার্থ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। সত্য তাই শুধু জ্ঞানের গন্তব্য নয়; সত্যই নেজামের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কুদরত।

অতএব সত্য কোনো মানুষের মালিকানাধীন সম্পদ নয়; মানুষ সত্যের তলবকারী মাত্র। সত্যকে অধিকার করার মধ্যে নয়, বরং সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্যেই জ্ঞানের সাবালকত্ব নিহিত।

  • মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

About Editor Todaynews24

Check Also

রাশিয়ায় এক নারীর বহন করা বোমায় নিহত ৩, আহত ২১

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর কেন্দ্রস্থলে একটি অভিজাত রেস্তোরাঁর কাছে এক নারীর বহন করা ঘরে তৈরি বোমা বিস্ফোরণে তিনজন নিহত ও অন্তত ২১ জন আহত হয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *