Home / সকল আপডেট / ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে ‘ঠেলে দেওয়া’ সাহিদার দেশে ফেরার আকুতি
‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে ‘ঠেলে দেওয়া’ সাহিদার দেশে ফেরার আকুতি

‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে ‘ঠেলে দেওয়া’ সাহিদার দেশে ফেরার আকুতি

জন্মসনদ, পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, এমনকি নিজের নামে জমি—সবই রয়েছে ভারতীয় নাগরিক সাহিদা ফকিরের। তবু ভারতে তাঁর ঠাঁই হয়নি। ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে জোর করে তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠিয়েছে (পুশ ইন) দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশে এসে আশ্রয় পেয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার এক কৃষকের বাড়িতে। সেখানে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর।

৩৯ বছর বয়সী সাহিদা ফকির বলছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপনগর থানার বিথারি হাকিমপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। স্বামী–সন্তান নিয়ে থাকতেন মুম্বাইয়ে। ২৪ জুলাই ভারতের আসাম সীমান্ত দিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থাগুলো ঘটনাটিকে ভারতের সংবিধান, আইন ও আদালতের রায়ের পরিপন্থী বলছে।

ভারতের কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অনেক মুসলিম বাঙালিকে ন্যূনতম আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তারা মনে করে, যথাযথ আইনিপ্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ১৬ জুন এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।

সাহিদা ফকিরের ভারতীয় ভোটার পরিচয়পত্র ও প্যান কার্ড (ভারতীয় আয়কর বিভাগের স্থায়ী হিসাব নম্বর)

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চালানো এ ধরনের ২১টি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এই ২১ ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

এদিকে বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিএসএফ ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছিল। তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। তবে গত মে মাস থেকে আবার সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা বাড়তে থাকে।

রাতের খাবার কিনতে বেরিয়ে আটক

কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া এলাকার কৃষক আবুল বাসারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সাহিদা ফকির। তাঁর দাবি, তিনি জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। প্রায় ২০ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে স্বামী জুম্মান ফকিরের সঙ্গে মুম্বাইয়ে যান। সেখানে তিনি গৃহকর্মীর কাজ করতেন এবং তাঁর স্বামী গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করেন। তাঁদের ২৩ ও ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছেন, যাঁরা বর্তমানে ভারতে রয়েছে।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুঠোফোনে সাহিদা ফকির বলেন, ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে বাসার কাছের একটি বাজারে খাবার কিনতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে সাদাপোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাঁকে আটক করেন। তখন তাঁর সঙ্গে রাতের খাবারের জন্য কেনা ছয়টি রুটি ও তরকারি ছিল। বাসায় একা ছিল তাঁর ছোট ছেলে। আটক করার সময় তাঁর মুঠোফোন, আধার কার্ড ও খাবার নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অবৈধ বিদেশি সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের রাখা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

কৃষক আবুল বাসারের পরিবারের সঙ্গে থাকছেন সাহিদা ফকির। গত বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামে

সাহিদা ফকিরের অভিযোগ, কোনো তদন্ত, শুনানি, নোটিশ বা আদালতের আদেশ ছাড়াই তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ ঘোষণা করা হয়। পাঁচ দিন আটকে রাখার পর তাঁকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিমানে করে তাঁকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি এলাকায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে আরও প্রায় ২০ জনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে ঘোরানোর পর একপর্যায়ে সীমান্তের একটি অংশ দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সাহিদা ফকিরের ভাষ্য, পরে তিনি বাংলাদেশের ফেনী এলাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেনাপোল এলাকায় আসেন। সেখানে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা আবুল বাসারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

কৃষক আবুল বাসার প্রথম আলোকে বলেন, গত সোমবার তিনি চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে বেনাপোল গিয়েছিলেন। ফেরার পথে একজন নারীকে কাঁদতে দেখে তিনি এগিয়ে যান। সব শুনে মানবিক কারণে সাহিদাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।

‘এখন আমি নিজের দেশে ফিরতে পারছি না’

সাহিদা ফকির জানান, তাঁর বাবা আমুনউদ্দিন গাজী ও মা মাজিদা বিবি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপনগর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার ছিলেন। তাঁর নিজের ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, আয়কর বিভাগের দেওয়া প্যান কার্ডে স্বরূপনগরের ঠিকানা রয়েছে। ভোটার তালিকার পার্ট নম্বর ৮৯-এর ৫১৪ ও ৫১৫ নম্বরে তাঁদের নাম রয়েছে। এ ছাড়া স্বরূপনগর থানার গুনরাজপুর মৌজায় তাঁর নামে জমিও রয়েছে।

নিজের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন সাহিদা ফকির। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতীয় নাগরিক। সারা জীবন পশ্চিমবঙ্গেই কাটিয়েছি। অথচ আমাকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে। এখন আমি নিজের দেশেও ফিরতে পারছি না।’

কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এমন শাহিন প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি জানার পর সেখানে একজন উপপরিদর্শককে পাঠানো হয়েছিল। ভারত থেকে পুশ ইন করা ওই নারী আবুল বাসারের বাড়িতে রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিজিবির পক্ষ থেকেও ওই নারীর বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

ভারতের সংবিধান ও আইনের ‘পরিপন্থী’

বাংলাদেশে এসে মুঠোফোনে ভারতে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাহিদা ফকির। ঘটনাটি জানতে পেরে তাঁকে দেশে ফেরাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)। সংগঠনের সেক্রেটারি কিরীটী রায় স্বাক্ষরিত চিঠির সঙ্গে সাহিদার পরিচয়পত্র, জন্মসনদ, আধার কার্ডসহ বিভিন্ন নথি যুক্ত করে দেওয়া হয়।

২৯ জুলাই পররাষ্ট্রসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রধান সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, নাগরিকত্বের পক্ষে বিপুল সরকারি নথি থাকা সত্ত্বেও একজন ভারতীয় নাগরিককে কোনো আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিদেশি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং ভারতের সংবিধান, সংসদ প্রণীত আইন ও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের বাধ্যতামূলক রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাঁকে জোরপূর্বক দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিএসএফ ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছিল। তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক।

এ ঘটনা গুরুতর সাংবিধানিক, আইনি, মানবিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে উল্লেখ করে চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ১৯ জুলাই মুম্বাইয়ে সাহিদা ফকিরকে সাদাপোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা আটক করেন। পরে তাঁকে পাঁচ দিনের বেশি সময় আদালতে হাজির না করে আটক রাখা হয়। এরপর বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হয়ে গভীর রাতে আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আইন অনুযায়ী কোনো বহিষ্কারের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।

চিঠিতে সাহিদা ফকিরকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনা, ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, দায়ী পুলিশ, সিআইডি ও বিএসএফ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে কোনো ভারতীয় নাগরিককে যথাযথ আইনিপ্রক্রিয়া ছাড়া বিদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্ত পার না করার জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির আবেদন জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশি সন্দেহে পুশইনের বছরখানেক পরে দেশে ফিরলেন ৪ ভারতীয় নাগরিক

About Editor Todaynews24

Check Also

যেদিন এল গেন্দু মিয়ার বাস

যেদিন এল গেন্দু মিয়ার বাস

‘ইশ্! একনা আগোত আইসলে তো দেইখপার পাইলেন হয়। বাস তো খানেক আগোত গেইল। বইসো, আবার আইসপে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *