সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা রূপান্তর: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা রূপান্তর: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা রূপান্তর: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

ধরুন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাধারণ পরিবারের কথা। পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করেন না।

তারা নিয়মিত তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (প্রাইমারি) চিকিৎসকের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান, রোগ প্রতিরোধমূলক স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য যান।

পরিবারের কারও যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ধরা পড়ে, তাহলে একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলো-আপ চলতে থাকে।

প্রয়োজন হলে সেই চিকিৎসকই রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠান, চিকিৎসার সমন্বয় করেন এবং রোগীর সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য তথ্য ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ডে সংরক্ষণ করেন। ফলে চিকিৎসা হয় ধারাবাহিক, সমন্বিত এবং রোগীকেন্দ্রিক।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।

এখানে পারিবারিক চিকিৎসক, ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, নার্স প্র্যাকটিশনার, ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা একটি সমন্বিত দল হিসেবে কাজ করেন।

ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর), টেলিমেডিসিন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সুসংগঠিত রেফারেল ব্যবস্থা রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন কমায় এবং চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, রোগীরা উন্নত মানের চিকিৎসা পান এবং মানুষের গড় আয়ু ও জীবনমান বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশও গত কয়েক দশকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশেষ করে মাতৃ-স্বাস্থ্য, শিশুর টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধির কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, ক্যানসার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ দ্রুত বাড়ছে।

কিন্তু আমাদের বর্তমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখনো মূলত রোগ দেখা দিলে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

অধিকাংশ মানুষের নির্দিষ্ট পারিবারিক চিকিৎসক নেই, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ডের ব্যবহার সীমিত, বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল এবং গ্রামীণ এলাকায় দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে।

ফলে অনেক রোগী জটিলতা তৈরি হওয়ার পর হাসপাতালে আসেন, যা বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সফল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূল নীতিগুলো গ্রহণ করে এবং দেশের শক্তিশালী কমিউনিটি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে একটি আধুনিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ধীরে ধীরে সমন্বিত ফ্যামিলি হেলথ সেন্টারে রূপান্তর করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং টেলিমেডিসিন একসঙ্গে প্রদান করা হবে।

একই সঙ্গে একটি জাতীয় ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) ব্যবস্থা চালু করলে রোগীর স্বাস্থ্য তথ্য দেশের যেকোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সহজেই ব্যবহার করা যাবে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে হুবহু অনুসরণ করা নয়, বরং তাদের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, ধারাবাহিক রোগী সেবা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার সফল মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

পরিবারভিত্তিক চিকিৎসক, নার্স এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করবে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে হুবহু অনুসরণ করা নয়, বরং তাদের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, ধারাবাহিক রোগী সেবা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার সফল মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

দেশের বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিক নেটওয়ার্ক এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর সঙ্গে এই নীতিগুলোর সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং টেকসই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • ডা. নীল এন টিংকু প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মেডিকেল ডিরেক্টর, প্রাইম হেলথ, নিউ ইয়র্ক সিটি , যুক্তরাষ্ট্র এবং সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা।

About Editor Todaynews24

Check Also

উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’

উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হলেও এই বন নিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনগত অবস্থান অস্পষ্ট। বেশির ভাগ গবেষণা ও প্রকল্প সুন্দরবনকে দেখেছে ঔপনিবেশিক আয়নায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *