সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / জুলাই নিয়ে কার্টুন: তর্ক–বিতর্ক, শিল্পের স্বাধীনতা ও রাজনীতি
জুলাই নিয়ে কার্টুন: তর্ক–বিতর্ক, শিল্পের স্বাধীনতা ও রাজনীতি

জুলাই নিয়ে কার্টুন: তর্ক–বিতর্ক, শিল্পের স্বাধীনতা ও রাজনীতি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে নানা আলোচনা চলছে। জুলাইয়ের আশা–আকাঙ্খা, প্রত্যাশা, সফলতা, ব্যর্থতার বিষয়গুলো সেখানে উঠে আসছে। এর মধ্যে কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা কয়েকটি কার্টুন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে–বিপক্ষে নানা আলোচনা–সমালোচনা দেখা গেছে। কার্টুনের রাজনৈতিক অবস্থান এবং শিল্পীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিতর্কমূলক দুটি লেখা লিখেছেন জাহিদ জামিলমোহাম্মদ জাহিদুল হক

জুলাইকে নয়, জুলাইকে যারা অপকর্মের ঢাল বানাচ্ছে তাদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে

জাহিদ জামিল

সাধারণত রাজনৈতিক কার্টুন/ইলাস্ট্রেশন আঁকা হয় কোনো রাজনৈতিক ঘটনা বা পরিস্থিতিকে দর্শক-পাঠকদের কাছে সহজে উপস্থাপন করার জন্য। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে খোদ রাজনৈতিক কার্টুনকেই লিখে-বলে বোঝাতে হচ্ছে, তাহলে তার সম্ভাব্য দুটি কারণ থাকতে পারে। এক, অত্যন্ত জটিল ও দুর্বোধ্য ভাবে আঁকা। দুই, সমালোচকদের কোনো পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে না বোঝার ভান করা।

কার্টুনিস্ট মেহেদী হক অত্যন্ত সহজ ভাষায় কার্টুন আঁকেন। তাঁর কার্টুনের বিবরণ যে কেউই বুঝবেন। কিন্তু গেল সপ্তাহজুড়ে আমরা দেখলাম সমালোচনার নামে মেহেদী হকের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করতে।

এমনটা নতুন নয়, মেহেদী হক এবং সমসাময়িক আরও অনেক কার্টুনিস্ট বা সৃজনশীল ধারার লোকেরা এমন হেনস্তার শিকার হয়ে চলছেন বহু বছর ধরেই। হাসিনার আমলেও প্রতিনিয়ত এমন সব ক্ষুরধার কার্টুন এঁকে গেছেন মেহেদী হক। বহুজন তাঁর আঁকা কার্টুন ফেসবুকে শেয়ার দিতেও ভয় পেতেন। সেই মেহেদী হককেই এখন আওয়ামী লীগের দালাল বলে গালি দেওয়া হচ্ছে।

মূল কথা কার্টুনিস্টদের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক সব সময় খারাপ থাকবেই। তা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত এমনকি বামপন্থীরাও কেউ যদি ক্ষমতাকাঠামোয় যায়, তখনো।

যে কার্টুন নিয়ে মেহেদী হকের বিরুদ্ধে এনসিপি ও দলটির সমর্থকদের আক্রমণ শুরু হয়েছিল, সেটা হচ্ছে পেটে জুলাই লেখা একজনের কার্টুন। ধরেই নেওয়া হয়েছে যে এটা নাহিদ ইসলামের রূপ, যার পেটে জুলাই লেখা।

কিন্তু পেটে কেন জুলাই? গতানুগতিকভাবে আমরা দেখি দুর্নীতিগ্রস্ত বোঝাতেই পেট মোটা দেখানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিপির অনেকের নামে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলেও, ব্যক্তি নাহিদ ইসলামের নামে তেমন কিছু শোনা যায়নি।

কিন্তু একটা অভিযোগ যা জুলাইকে ম্লান করে তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ এনসিপি বা নাহিদ ইসলামের নেই, সেটা হচ্ছে একাত্তরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত দলের সঙ্গে জোট করা। এই নৈতিক বিচ্যুতির কারণে নির্বাচনের সময়ই পদত্যাগ করেছেন দলটির গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ নেত্রী তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং আরও অনেকে। সামান্তা শারমিন এবং এমন আরও অনেক এনসিপি নেতা নির্বাচনের সময় থেকেই অনেকটা নিষ্ক্রিয় এবং ১১–দলীয় জোটে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা।

আমরা তো চেয়েছিলাম তরুণেরা নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন করুক, ধীরেই করুক, কিন্তু গণহত্যায় জড়িত কোনো দলকে সুযোগ করে দেওয়ার চুক্তির মাধ্যমে এমপি হয়ে না। এটা কি জুলাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন এনসিপি তথা নাহিদ ইসলামের নৈতিক স্খলন নয়?

১৯৭১ কিংবা ২০২৪—যেকোনো আন্দোলন বা শহীদের প্রতীককে ক্ষমতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এবং তার সমালোচনার অতীত কাল্ট তৈরির অপচেষ্টা সব সময় বিপরীত ফল দেয়। শহীদদের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয়, তবে তাঁদের নাম ভাঙিয়ে জীবিত রাজনৈতিক অংশীজনদের অনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমালোচনা থেকে মুক্ত রাখা যায় না।

এনসিপি সমর্থকদের দাবি, বিরোধী দলে থাকা একটি তরুণ দলকে নিয়ে কার্টুন আঁকা শিল্পকলা বা সাংবাদিকতার নীতিতে ‘পাঞ্চিং ডাউন’ বা দুর্বলকে আক্রমণ করার শামিল। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রে এই তত্ত্ব খাটে না। জনগণের ভোটে এমপি হয়ে, সংসদের কাঠামোগত পরিপূরক—বিরোধী দলের অন্যতম সদস্য হয়ে, একটা রাষ্ট্রক্ষমতা বদলে দেওয়া আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে, দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়া কেউ ‘পাঞ্চ ডাউন’ কাতারে থাকে না।

আর এসবের মাঝে কেউ যদি ‘আগেই ভালো ছিলাম’ প্রতিধ্বনি শুনতে পান, এবং যুক্তি নির্মাণে ফরাসি, জার্মান কিংবা ইরানি বিপ্লবের ইতিহাস সামনে আনেন, তাহলে আপনি ভুল দিকে হাঁটছেন।

পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা চেয়ে এই ভূখণ্ডের জনগণ ইংরেজ শাসনে ফিরে যেতে চায়নি, তারা নিজেদের স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে অভাব-অনটন, নানা সমস্যায় থেকেও জনগণ পাকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় একীভূত হতে চায়নি, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে, বারবার। সুতরাং কেউ বর্তমানের সমস্যা নিয়ে কথা বলা, কার্টুন আঁকা মানেই সে পতিত ফ্যাসিবাদী শাসককে ফিরিয়ে আনতে চায় এমন না।

মেহেদী হকের দ্বিতীয় যে কার্টুন নিয়ে বিতর্ক চলছে তা হলো, শহীদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আইকনিক ছবির আদলে আঁকা একটি কার্টুন।

আমার, আমাদের বা মেহেদী হকের কারোরই কোনো গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কোনো দলকে ফেরানোর নিয়ত না ছিল, না আছে। সেটা একাত্তরের জামায়াতই হোক, বা চব্বিশের আওয়ামী লীগই হোক।

মেহেদী হকের দ্বিতীয় যে কার্টুন নিয়ে বিতর্ক চলছে তা হলো, শহীদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আইকনিক ছবির আদলে আঁকা একটি কার্টুন, যেখানে মেহেদী হক কোনোভাবেই আবু সাঈদকে ছোট না করলেও তাঁর বিরোধীপক্ষ জোরপূর্বক বোঝাতে উঠে পড়ে লেগেছেন যে এখানে আবু সাঈদকে বিদ্রূপ করা হয়েছে।

এমন প্রতীকের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত শ্রদ্ধার ‘ছলনা’ আমরা এর আগেও দেখেছি: একাত্তর নিয়ে, মুজিবকে নিয়ে। একই কাজে আরেক গোষ্ঠী যোগ করতে চাইছে জুলাই এবং আবু সাঈদকে। জুলাই দিয়ে কেউই আখের গোছায়নি, এমনটা শক্তভাবে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব না। একাত্তর দিয়েও যেমন অনেকে আখের গুছিয়েছিল, চব্বিশ দিয়েও অনেকে আখের গুছিয়েছে। কোনো ক্ষেত্রেই দায় একাত্তর বা চব্বিশের নয়।

১৯৭১ কিংবা ২০২৪—যেকোনো আন্দোলন বা শহীদের প্রতীককে ক্ষমতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এবং তার সমালোচনার অতীত কাল্ট তৈরির অপচেষ্টা সব সময় বিপরীত ফল দেয়। শহীদদের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয়, তবে তাঁদের নাম ভাঙিয়ে জীবিত রাজনৈতিক অংশীজনদের অনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমালোচনা থেকে মুক্ত রাখা যায় না।

এই কার্টুন দিয়ে কোনোভাবেই শহীদদের আত্মত্যাগকে ছোট করা হয় না। কেবল বর্তমানের জীবিতদের চাপ দেওয়া হয় নৈতিকতা রক্ষা করে চলতে, জনকল্যাণের কথা ভাবতে। আর সেই জন-আকাঙ্ক্ষা ও হতাশাকে চিত্রিত করা মেহেদী হকদের মতো কার্টুনিস্টদের কাজ।

  • জাহিদ জামিল কার্টুনিস্ট ও শিক্ষার্থী, প্যান্থিয়ন সরবোন ইউনিভার্সিটি, ফ্রান্স।

শিল্পীর স্বাধীনতা ও ‘জুলাই’-এর কার্টুন-রাজনীতি

মোহাম্মদ জাহিদুল হক

শিল্প ও তার সৃষ্টির অনাক্রম্যতার (ইমিউনিটি) ধারণা পাশ্চাত্য আধুনিকতার এক জটিল ফসল। কান্টের নান্দনিক স্বায়ত্তশাসন, রোমান্টিসিজমের শিল্পী-প্রতিভার ধারণা এবং ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই অনাক্রম্যতা বিংশ শতাব্দীতে চরম রূপ পায়। সাধারণ অর্থে এই ধারণার মূল বার্তা হলো: শিল্প একটি স্বায়ত্তশাসিত পরিমণ্ডল, যা সমাজের প্রচলিত নৈতিকতা, রাজনৈতিক উপযোগিতা বা ধর্মীয় অনুশাসনের ঊর্ধ্বে।

তবে শিল্পতত্ত্বের সব ঘরানা এই অনাক্রম্যতার ধারণায় ঐকমত্য পোষণ করেছে—এমন নয়। সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও সাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এটি উপলব্ধি করা সম্ভব যে পলিটিক্যাল স্যাটায়ার বা রাজনৈতিক কার্টুন উপর্যুক্ত তাত্ত্বিক আলোচনার একটি ব্যতিক্রমী ও জটিল ক্ষেত্র। এটি নিছক ‘শিল্প’ নয়, বরং ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গশিল্প বা স্যাটায়ার, ক্যারিকেচার ও রাজনৈতিক মন্তব্যের এক সংকর বা হাইব্রিড মাধ্যম। এর অন্তর্নিহিত কাজই হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর ওপর সমালোচনা তৈরি করা। ফলে, এটি কখনোই পুরোপুরি ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদের অন্ধ অনুসারী ছিল না। ফলে এই মাধ্যমে ‘শিল্পীর ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তির দাবিটি আরও স্পর্শকাতর ও শর্তাধীন হয়ে ওঠে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে মেহেদী হকের কার্টুন।

২০১৫ সালে ফরাসি ব্যঙ্গ-সাপ্তাহিক ‘শার্লি এবদো’র ওপর মর্মান্তিক হামলা শিল্পীর ইনডেমনিটি বিষয়ক বিতর্ককে একটি বৈশ্বিক মাত্রা প্রদান করে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা চিন্তাধারায় সুস্পষ্ট কয়েকটি ধারা দৃশ্যমান হয়। একদিকে উদারনৈতিক নিরঙ্কুশতাবাদীরা মনে করেন শিল্পী ও সাংবাদিকের অনাক্রম্যতা পরম ও সম্পূর্ণ শর্তহীন। অন্যদিকে, উদারনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রবক্তারা দাবি করেন যে এই অনাক্রম্যতা নিঃশর্ত হতে পারে না। ক্ষমতার সমালোচনা করা সাহসিকতা হলেও কোনো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস বা দুর্বলতার জায়গায় আঘাত হানা একধরনের দায়িত্বহীনতা।

এ ছাড়া উত্তর-উপনিবেশবাদী ও কাঠামোবাদী সমালোচকেরা বিষয়টিকে আরও ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁদের মতে, শার্লি এবদোর কার্টুনশিল্পের পেছনের এই ইনডেমনিটির দাবি মূলত শ্বেতাঙ্গ, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাবেক-ঔপনিবেশিক শক্তির সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখারই একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক হাতিয়ার।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রথিতযশা কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে উপজীব্য করে আঁকা কয়েকটি কার্টুন নিয়ে আমাদের দেশের প্রগতিশীলদের একাংশের অবস্থান মোটাদাগে প্রথম ধারা, অর্থাৎ ‘উদারনৈতিক নিরঙ্কুশতাবাদীদের’ মতামতেরই প্রতিফলন। কিন্তু মেহেদী হকের আঁকা জুলাইয়ের কার্টুনগুলোকে আমরা স্রেফ স্বায়ত্তশাসিত ‘শিল্প’ হিসেবে দেখব, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আখ্যানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করব—সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে শিল্পের নীতিশাস্ত্র, ক্ষমতার রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সম্পর্কটি তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রথমেই আসা যাক সাম্প্রতিক একটি কার্টুনের প্রসঙ্গে, যেখানে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নাহিদ ইসলামের অবয়বকে বিশাল মেদবহুল ও নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্যাটায়ারের সর্বজনীন রীতি অনুযায়ী একজন স্যাটায়ারিস্টকে সব সময় ক্ষমতার ভারসাম্য (পাঞ্চিং আপ বনাম পাঞ্চিং ডাউন) মাথায় রাখতে হয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ (পাঞ্চিং আপ) করাই স্যাটায়ারের মূল শক্তি।

জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদকে রূপক করে আঁকা ব্যঙ্গচিত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি বিপ্লব বা অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনিশ্চয়তার কালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভ্রান্ত ও দোলাচলময় আচরণের একটি দৃষ্টান্ত।

এ ছাড়া কার্টুনকে নির্দিষ্ট সময়ের প্রধান নীতিগত বা সামাজিক বিতর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হয় এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে নীতিগত সমালোচনাকে প্রাধান্য দিতে হয়। শেখ হাসিনাকে নিয়ে তাঁর শাসনামলে কার্টুন করা কিংবা দায়িত্বে থাকাকালে সরকারের নীতিনির্ধারণী চরিত্রদের নিয়ে কার্টুন করা ‘পাঞ্চিং আপ’-এর সংজ্ঞায় পড়ে।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীতিগত কোনো দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ বা প্রাসঙ্গিক সংবাদের তোয়াক্কা না করে কোনো ব্যক্তিত্বকে কেবল স্থূল ও পেটমোটা হিসেবে চিত্রিত করা নীতিগত সমালোচনার বদলে ব্যক্তিগত কটাক্ষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এতে পলিসির সমালোচনার চেয়ে ব্যক্তির পূর্বতন সংগ্রামী ও ত্যাগী ইমেজকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়, যা বিষয়ের চেয়ে ‘অ্যাটিটিউড’ নির্মাণের ঝোঁককে স্পষ্ট করে তোলে।

১৪ জুলাই মেহেদী হকের আঁকা অপর একটি কার্টুনে দুটি ভিন্ন সময়কে—‘জুলাই ২০২৪’ এবং ‘জুলাই ২০২৬’—তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ফ্রেমে দেখা যায়, ২০২৪-এর আন্দোলনে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ পোশাকধারী তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে রাজপথে সোচ্চার। তবে দ্বিতীয় ফ্রেমে দেখা যায়, একটি ইরেজার বা রাবার দিয়ে আন্দোলনকারী ধর্মনিরপেক্ষ অংশটিকে আংশিক মুছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রধানত মুসলিম পরিচয়ের তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন মত, পথ, লিঙ্গ ও শ্রেণির মানুষের এক বহুত্ববাদী ও যৌথ আন্দোলন—যেখানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ বিদ্যমান ছিল।

কার্টুনটিতে রূপক ইরেজার ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট অংশকে বাদ দেওয়ার যে চিত্রায়ণ, তা আন্দোলনের বহুত্ববাদী রূপটির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার বৈচিত্র্যকে একপেশেভাবে উপস্থাপনের এই প্রবণতাকে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ‘প্রতীকী স্থানচ্যুতি’ বা একধরনের সাংস্কৃতিক রূপক হিসেবে দেখা হয়।

ইতিহাসের পঠন-পাঠনে দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক লেখক উইলিয়াম হান্টারের মতো তাত্ত্বিকেরা যেভাবে এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজকে নির্দিষ্ট কিছু ছাঁচে ফেলে একপেশেভাবে উপস্থাপন করতেন, এ ধরনের শিল্পভাষায় অজান্তেই সেই পুরোনো কাঠামোর একটি ঝোঁক চলে আসে।

কার্টুনটি মুসলিম তরুণদের অতি ধর্মকেন্দ্রিক বা অন্যের ভূমিকা ম্লানকারী হিসেবে তুলে ধরে, যা শিল্পীর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনে রচিত একটি ‘বায়াস-কনফর্মিক’ ব্যঙ্গচিত্রের উদাহরণ হতে পারে। এর ফলে ঐতিহাসিক ঘটনার যে জটিল ও বহুস্তরীয় বাস্তবতা, তা স্রেফ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আখ্যানের ফ্রেমে বন্দী হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একইভাবে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদকে রূপক করে আঁকা ব্যঙ্গচিত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি বিপ্লব বা অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনিশ্চয়তার কালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভ্রান্ত ও দোলাচলময় আচরণের একটি দৃষ্টান্ত।

ইতিহাসের বিভিন্ন গণ-অভ্যুত্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত ‘আইনশৃঙ্খলা’ ও ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা’র স্বার্থে পুরোনো বা নিরাপদ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পছন্দ করে। মেহেদী হকের কার্টুনে মধ্যবিত্তের এই স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা ও হতাশারই প্রতিফলন ঘটেছে।

অতএব, শিল্পের অনাক্রম্যতার দোহাই দিয়ে স্যাটায়ারকে সম্পূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়মুক্ত ভাবার সুযোগ নেই। কার্টুনগুলোর আড়ালে বিদ্যমান এজেন্ডা, সিম্বলিক ভায়োলেন্স বা রাজনৈতিক বয়ান তৈরির প্রচেষ্টা খতিয়ে দেখা একটি বৈধ তাত্ত্বিক চর্চা।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় ঠিকই, কিন্তু তা সামাজিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। শার্লি এবদো-পরবর্তী বিশ্বে শিল্পীর স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে যে গভীর আন্তর্জাতিক সংলাপ শুরু হয়েছে, আমাদের দেশেও কার্টুন ও স্যাটায়ারের নীতিশাস্ত্র নিয়ে সে রকম গঠনমূলক ও তাত্ত্বিক সংলাপ বা ‘ক্রিটিক্যাল পাবলিক পেডাগজি’ গড়ে ওঠা প্রয়োজন।

  • মোহাম্মদ জাহিদুল হক সহকারী অধ্যাপক, ত্রিমাত্রিক শিল্প ও নকশা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

About Editor Todaynews24

Check Also

হরমুজের পর এবার বাব আল-মানদেব: জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি কীভাবে কাটবে

হরমুজের পর এবার বাব আল-মানদেব: জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি কীভাবে কাটবে

একটি ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কারণে বাব আল-মানদেবের পানি এখন রক্তে লাল হচ্ছে। আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদেব একই সঙ্গে লাগাতার আক্রমণের মুখে পড়েছে। এটি কেবল একটি সংকট নয়, এটি যুদ্ধ–পরবর্তী সামুদ্রিক সমঝোতার অবসান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *