সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / মানুষ কেন বাঁহাতি হয়
মানুষ কেন বাঁহাতি হয়

মানুষ কেন বাঁহাতি হয়

আপনি যখন প্রথম লেখা শিখছিলেন, তখন কি অক্ষরগুলো ডান থেকে বাঁয়ে, ঠিক আয়নার প্রতিবিম্বের মতো উল্টো করে লিখতেন? বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ তাঁরা তাঁদের ডানহাতি শিক্ষকদের হাতের চলন অনুকরণ করার চেষ্টা করেন। বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো জিনিয়াসও কিন্তু তাঁর ডায়েরিতে এভাবেই লিখতেন!

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ বাঁহাতি। তবে সংখ্যায় কম হলেও, ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বিখ্যাত শিল্পী, সুরকার বা শীর্ষ অ্যাথলেটদের মধ্যে বাঁহাতিদের একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়। তবে এত অর্জন সত্ত্বেও, ঐতিহাসিকভাবে এই ভিন্নতাকে সব সময় ভালো চোখে দেখা হয়নি।

১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বিশ্বের অনেক দেশেই শিশুদের জোর করে ডানহাতি বানানোর রেওয়াজ ছিল। আমাদের ভাষায়ও এই বৈষম্য লুকিয়ে আছে। ইংরেজি ‘Left’ শব্দটি এসেছে প্রাচীন ইংরেজি শব্দ ‘lyft’ থেকে, যার অর্থ দুর্বল, বোকা বা মূল্যহীন। অন্যদিকে ‘Right’ মানে সঠিক বা যুৎসই। ঘানার মতো আফ্রিকার অনেক দেশে আজও বাঁহাতিদের বাঁকা চোখে দেখা হয়। কারণ সামাজিকভাবে মনে করা হয় ডান হাত সামাজিক কাজের জন্য এবং বাঁ হাত পরিচ্ছন্নতার মতো ‘নোংরা’ কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

তবে আমাদের মস্তিষ্ক ভীষণ নমনীয়। অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা সহজেই ডান হাতে কাজ করা শিখতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি দুই হাত দিয়েই কাজ চালানো সম্ভব হয়, তবে মানুষ কেন নির্দিষ্ট একটি হাতের প্রতি নির্ভরশীল হয়? কেন পৃথিবীর ৯০ শতাংশ মানুষ ডানহাতি?

বাঁহাতি হওয়ার পেছনে সরাসরি কোনো একক জিন নেই। যদি বাবা-মা দুজনেই বাঁহাতি হন, তবুও তাঁদের সন্তানের বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন মনে করতেন, ডান বা বাঁহাতি হওয়ার বিষয়টি সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। আমাদের হাতই নাকি মস্তিষ্কের অসমতা তৈরি করে! আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাতৃগর্ভে মাত্র ১০ সপ্তাহ বয়সী ভ্রূণ একটি নির্দিষ্ট হাত বেশি নাড়াচাড়া করতে শুরু করে। এই নাড়াচাড়া থেকেই বোঝা যায় শিশুটি ভবিষ্যতে কোন হাতি হবে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে মস্তিষ্কের সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংযোগ স্থাপিত হওয়ারও আগে!

২০১৭ সালে ইলাইফ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, এই অসমতার শুরু হয় স্পাইনাল কর্ডে। গর্ভধারণের ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে স্পাইনাল কর্ডের ডান ও বাঁ পাশে জিন এক্সপ্রেশনের বিশাল পার্থক্য দেখা যায়। জিন এক্সপ্রেশন মানে জেনেটিক নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রোটিন তৈরি করা।

বাঁহাতি হওয়ার পেছনে সরাসরি কোনো একক জিন নেই। যদি বাবা-মা দুজনেই বাঁহাতি হন, তবুও তাঁদের সন্তানের বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ। আবার যমজ ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও একজনের বাঁহাতি হলে অপরজনের বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনা ২০-৩০ শতাংশের বেশি নয়।

আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাতৃগর্ভে মাত্র ১০ সপ্তাহ বয়সী ভ্রূণ একটি নির্দিষ্ট হাত বেশি নাড়াচাড়া করতে শুরু করে। এই নাড়াচাড়া থেকেই বোঝা যায় শিশুটি ভবিষ্যতে কোন হাতি হবে।

তবে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪০টি জিন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করেছেন, যা বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০২৫ সালের থ্রেডস ইন জেনেটিকস জার্নালের একটি রিভিউ পেপার অনুযায়ী, এর মধ্যে বেশির ভাগই হলো টিউবুলিন জিন, যা কোষের কাঠামোগত উপাদান তৈরি করে। এই একই জিনগুলো স্কিজোফ্রেনিয়া, ডিসলেক্সিয়া এবং অটিজমের মতো স্নায়বিক অবস্থার সঙ্গেও যুক্ত।

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও নির্দিষ্ট হাত বা পা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়, কিন্তু সেখানে ডান বা বাঁয়ের অনুপাত থাকে প্রায় সমান। শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই এই অনুপাত ৯:১। কিন্তু এই পরিবর্তনের ইতিহাসে কেন ডানহাতিরা বেশি সুবিধা পেল?

২০২৬ সালের এপ্রিলে পিএলওএস বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় অক্সফোর্ড এবং রিডিং ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, হাত ব্যবহারের এই নির্দিষ্ট প্রবণতা শুরু হয়েছিল প্রায় ৭০ লাখ বছর আগে, যখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিল এবং তাদের মস্তিষ্ক আকারে বড় হচ্ছিল। তবে হোমো গণের উদ্ভবের পর, আজ থেকে প্রায় ২৮ লাখ বছর আগে বাঁ হাতের চেয়ে ডান হাতকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। এর পেছনে সবচেয়ে জোরালো তত্ত্বটি হলো মানুষের সহিংসতা।

২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছুরিকাঘাতের ঘটনায় মানুষ সবচেয়ে বেশি আঘাত পায় শরীরের বাঁ পাশে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়।

মডিফাইড ফাইটিং হাইপোথিসিস তত্ত্ব অনুযায়ী, ডানহাতিদের টিকে থাকার একটি বড় সুবিধা ছিল তাদের হৃৎপিণ্ডের অবস্থান। হৃৎপিণ্ড শরীরের বাঁ দিকে থাকে। ডান হাতে অস্ত্র ধরলে সহজেই প্রতিপক্ষের বাঁ দিকের হৃৎপিণ্ড বরাবর প্রাণঘাতী আঘাত হানা যায়। আর নিজের ডান পাশ দিয়ে শরীরের বাঁ দিকের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো রক্ষা করা সহজ হয়।

২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছুরিকাঘাতের ঘটনায় মানুষ সবচেয়ে বেশি আঘাত পায় শরীরের বাঁ পাশে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়। তবে বাঁহাতিরাও টিকে আছে তাদের চমকে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে। হাতাহাতি লড়াইয়ে বাঁহাতিদের আক্রমণ ডানহাতিদের জন্য সব সময়ই অপ্রত্যাশিত থাকে।

সাংস্কৃতিক কারণও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। ডান হাতে খাওয়া এবং বাঁ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার যে সামাজিক নিয়ম, সেটি হয়তো প্রাচীনকালে মানুষকে মারাত্মক সব জীবাণুর সংক্রমণ থেকে বাঁচিয়েছিল এবং অগণিত জীবন রক্ষা করেছিল।

মোদ্দাকথা, আপনি ডানহাতি হোন বা বাঁহাতি, এই বৈশিষ্ট্যটি নিছক কোনো অভ্যাস নয়। এটি আমাদের ভ্রূণতত্ত্ব, জেনেটিক্স এবং হাজার বছরের সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

সূত্র: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

About Editor Todaynews24

Check Also

হুথিদের সতর্কবার্তার পর সৌদি বন্দর এড়িয়ে চলছে অনেক জাহাজ

সৌদি বন্দরগুলো ব্যবহার না করতে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সতর্কবার্তার পর বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে বলে জানা গেছে। শিপ ট্র্যাকিংয়ের ডেটা অনুযায়ী, লোহিত সাগর দিয়ে চারটি তেলবাহী ট্যাংকার তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *