সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / হজরত আসিয়া যেভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন
হজরত আসিয়া যেভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন

হজরত আসিয়া যেভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন

যুগে যুগে এমন কিছু সুমহান আত্মার আগমন ঘটেছে, যারা প্রমত্ত রাজপ্রাসাদের ছাদের নিচে দাঁড়িয়েও সমস্ত বৈষয়িক প্রলোভনকে ধূলিসাৎ করে সত্যকে সমুন্নত রেখেছেন। মিসরের অত্যাচারী ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে থাকা নারী আসিয়া বিনতে মুজাহিম ছিলেন এমনই এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

মহাগ্রন্থ কোরআনে তাঁর ইমানি স্থৈর্য ও ত্যাগের ঘটনাকে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত মুমিন নর-নারীর জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নারীর নৈতিক স্বাধীনতা

প্রাচীন ইতিহাসে ধরে নেওয়া হতো যে নারী মূলত তার সামাজিক পরিবেশ, পিতা কিংবা স্বামীর ধর্ম ও মতাদর্শের দ্বারা পরিচালিত সত্তা। কিন্তু পবিত্র কোরআন আসিয়া বিনতে মুজাহিমের জীবনের মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে খণ্ডন করেছে।

সত্য গ্রহণে নারী কোনো পুরুষের অনুগামী নয়; বরং তার রয়েছে সম্পূর্ণ স্বাধীন চিন্তা, নিজস্ব ইমানি চেতনা এবং আল্লাহর দরবারে একক জবাবদিহি। ইসলামি জীবনদর্শনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মানুষের পাপ বা পুণ্যের দায় সম্পূর্ণ তার নিজের। কোরআন বলে, “কোনো বহনকারীই অন্যের অপরাধের বোঝা বহন করবে না।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩৮)

ফলে ফেরাউন যখন নিজেকে খোদা দাবি করছিল এবং পুরো মিসরজুড়ে তার জুলুমের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখন তারই স্ত্রী আসিয়া ইমানের আলো দেখতে পেয়েছিলেন। স্বামীর খোদাদ্রোহিতা আসিয়ার ইমানকে স্পর্শ করতে পারেনি।

আসিয়া বিনতে মুজাহিম প্রমাণ করেছেন যে স্বামী যদি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অত্যাচারীও হয়, তবুও একজন নারী নিজের ইমানি ও নৈতিক সত্তাকে রক্ষা করতে পারেন। আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনে কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা পরিবেশের কলুষতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

আসমানি নিরাপত্তার ছায়া

নবী মুসা (আ.) সে সময় ইমানের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছিলেন। তাঁর দাওয়াত আসিয়ার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করল। তিনি নিজের বিশ্বাসকে আর গোপন রাখেননি। মিসরের রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখানুভূতি চ্যালেঞ্জ করে তিনি এক আল্লাহর ওপর ইমান আনার ঘোষণা দিলেন।

ফেরাউন তাঁর এই পরিবর্তনের কথা জানতে পেরে রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠল। প্রথমে তাঁকে রাজকীয় ক্ষমতার লোভ, ধনসম্পদের প্রলোভন ও রানির মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু যখন দেখা গেল আসিয়ার কাছে সমস্ত পার্থিব লোভ তুচ্ছ, তখন শুরু হলো অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন।

মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর তাঁকে শুইয়ে রেখে চার হাত-পায়ে পেরেক ঠুকে দেওয়া হতো। প্রখর রোদের তাপে শরীর ঝলসে যেত। তবু তিনি আল্লাহর একত্ববাদে অবিচল ছিলেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, আসিয়ার ওপর আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়েছিল। সূর্যতাপের নিচে ফেরাউনের জল্লাদরা আসিয়ার ওপর শাস্তি প্রদান শেষ করে সরে গেলে আসমানের ফেরেশতারা নিজেদের ডানা মেলে তাঁকে ছায়া দান করতেন এবং তিনি বেহেশতে তাঁর নির্মিত শুভ্র প্রাসাদ প্রত্যক্ষ করতেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৮/১৬৯, দারুত তাইয়িবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)

এই আত্মত্যাগের কারণেই আল্লাহর রাসুল (সা.) বিশ্বজগতের চার শ্রেষ্ঠ নারীর তালিকায় আসিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, “উত্তম নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন চারজন: মারইয়াম বিনতে ইমরান, আসিয়া বিনতে মুজাহিম, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৮৯৬)

আসিয়ার প্রার্থনার বৈশিষ্ট্য

কোরআনে আসিয়ার ত্যাগের গল্প শুধু একটি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে আসেনি; বরং তাঁর দোয়ার শব্দচয়ন ও ব্যাকরণগত বিন্যাসটি মুমিনদের দোয়ার সংস্কৃতিতে এক অনন্য আধ্যাত্মিক অধ্যায় যুক্ত করেছে।

আসিয়ার সেই আকুল প্রার্থনার দৃশ্যটি আল্লাহ তুলে ধরেছেন এভাবে, “আল্লাহ মুমিনদের জন্য ফেরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করছেন; যখন সে বলেছিল—হে আমার প্রতিপালক, আপনার সান্নিধ্যে বেহেশতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে রক্ষা করুন, আর আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে উদ্ধার করুন।” (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১১)

এই দোয়ার ব্যাকরণিক বুননটি পর্যবেক্ষণ করলে এক আত্মিক প্রজ্ঞা ফুটে ওঠে। আয়াতে আসিয়া বলেছেন, ‘রব্বিবনি লি ইনদাকা বাইতান ফিল জান্নাহ’ (আমার প্রতিপালক, আপনার সান্নিধ্যে বেহেশতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন)।

এখানে তিনি ‘বাইতান’ (ঘর) আগে না বলে ‘ইনদাকা’ (আপনার কাছে) আগে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, তিনি বেহেশতের বস্তুগত সুখের চেয়েও পরম স্রষ্টার সান্নিধ্যকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আলেমগণ এ প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত নীতির উল্লেখ করেন, ‘আল-জারু কবলা আদ-দার’ (বাড়ির আগে প্রতিবেশীকে বেছে নেওয়া)।

আসিয়া জান্নাতে একটি ঘর চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই ঘরের চেয়েও বড় আকুতি ছিল তিনি যেন প্রতিপালকের একদম কাছাকাছি থাকতে পারেন।

সিরাত গবেষক আলি মুহাম্মদ আস-সাল্লাবি লিখেছেন, “আসিয়া বিনতে মুজাহিম শুধু ফেরাউনের রাজপ্রাসাদ ও পৃথিবীর ভোগবিলাসই প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং তিনি বেহেশতের চাওয়াতেও নিজের আত্মাকে এত উঁচুতে তুলে নিয়েছিলেন যে সেখানে বস্তুর চেয়ে প্রতিপালকের সান্নিধ্যই ছিল তাঁর প্রধান কাম্য। তিনি ফেরাউনের অত্যাচারী ক্ষমতার মুখোমুখি হয়ে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে পরম সত্যের সামনে পার্থিব কোনো শক্তি টিকতে পারে না।” (আস-সাল্লাবি, কাসাসুল কুরআন, ২/৩১০, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, ২০০৪)

সিক বর্ণনায় এসেছে, আসিয়ার ওপর আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়েছিল। সূর্যতাপের নিচে ফেরাউনের জল্লাদরা আসিয়ার ওপর শাস্তি প্রদান শেষ করে সরে গেলে আসমানের ফেরেশতারা নিজেদের ডানা মেলে তাঁকে ছায়া দান করতেন

তাফসিরবিদ সাইয়িদ কুতুব লিখেছেন, সোনা যেমন আগুনে পুড়ে নিজের ভেতরের সমস্ত ময়লা দূর করে নিখাদ সোনা হিসেবে বেরিয়ে আসে, তেমনি ফেরাউনের সেই অমানুষিক নির্যাতন আসিয়ার আত্মাকে দুনিয়ার সমস্ত ধূলিবালি থেকে মুক্ত করে এক আসমানি জ্যোতিতে রূপান্তর করেছিল। (সাইয়িদ কুতুব, ফি জিলালিল কুরআন, ৬/৩৫৯০, দারুশ শুরুক, কায়রো, ১৯৮৬)

আসিয়ার প্রার্থনার মূল কথা

সুরা তাহরিমে বর্ণিত দোয়াতে আসিয়া তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন:

১. ফেরাউনের ব্যক্তি সত্তা ও তার অত্যাচার থেকে।

২. ফেরাউনের পাপ কাজ ও খোদাদ্রোহী সামাজিক সংস্কৃতি থেকে।

৩. পুরো জালেম শাসনব্যবস্থা ও অনুসারীদের থেকে।

এই দোয়ার মাধ্যমে আসিয়া মূলত তৎকালীন মিসরীয় সমাজের সমস্ত কুসংস্কার, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে পুরোপুরি বর্জন বা ‘বারাআত’ প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সত্যের সন্ধানে থাকা মানুষের জন্য কোনো পদবি বা রাজকীয় পরিচয় স্থায়ী হতে পারে না, যদি সেখানে স্রষ্টার বিধানকে অস্বীকার করা হয়।

About Editor Todaynews24

Check Also

দুবাইয়ের চাকরি ছেড়ে যে সিদ্ধান্ত বদলে দিল দুলকার সালমানের জীবন

দুবাইয়ের চাকরি ছেড়ে যে সিদ্ধান্ত বদলে দিল দুলকার সালমানের জীবন

ভিন্নধর্মী গল্প, বাস্তবধর্মী চরিত্র এবং ভাষার সীমা অতিক্রম করে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুমাত্রিক অভিনেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *