কিছু ভ্রমণগল্প গন্তব্যের নয়, মানুষের। কিছু প্রেমের গল্প আবার ফুল বা চিঠি দিয়ে নয়, শুরু হয় একটি পাহাড়ি পথ, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর অচেনা দুই পথিকের কথোপকথন দিয়ে। নিউজিল্যান্ডের ম্যান্ডি ও যুক্তরাজ্যের লি গ্রিনের গল্প তেমনই—যা ত্রিশ বছর ধরে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হেঁটে চলেছে।
পর্ব–১
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, যাদের সঙ্গে প্রথম আলাপেই মনে হয়—পরিচয়টা যেন বহুদিনের। কথার পর কথা জমতে থাকে। সময় কখন যে নিঃশব্দে পেরিয়ে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। বরং বিদায়ের মুহূর্তে মনে হয়, যদি আরেক কাপ চা থাকত! যদি আরও কিছুক্ষণ গল্প করা যেত!
নিউজিল্যান্ডের ম্যান্ডি হেলসে আর যুক্তরাজ্যের লি গ্রিনের সঙ্গে পরিচয়ের পর আমার অনুভূতিটা ছিল ঠিক এমনই।

প্রথম দেখায় তাদের পরিচয় দেওয়া খুব সহজ। তাঁরা ভ্রমণ করেন।
কিন্তু কয়েক মিনিট কথা বললেই বোঝা যায়, তাঁরা শুধু দেশ ঘুরে বেড়ান না; তাঁরা মানুষের কাছে যান। মানুষের গল্প শোনেন। মানুষের ভেতরের পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করেন। তারপর সেই গল্পগুলোই আবার পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
পেরিয়ে আসা ত্রিশ বছরে তাঁরা ঘুরেছেন ১২৬টি দেশ। বাংলাদেশ তাঁদের ১২৭তম গন্তব্য। তাই কৌতূহলবশত জানতে চেয়েছিলাম, ‘বাংলাদেশ কেন?’
মনে মনে ভেবেছিলাম, হয়তো বলবেন সুন্দরবন, কক্সবাজার, পাহাড় কিংবা বাংলার নদীর কথা। কিন্তু লির উত্তর ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম।
স্মিত হেসে লি যা বললেন, তা আমাকে নির্বাক করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

লি বললেন, ‘আমার জন্মদিন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস একই দিনে—২৬ মার্চ। ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম, যে দেশের জন্মদিন আর আমার জন্মদিন একই দিনে, একদিন সেই দেশটায় অবশ্যই যাব।’
কেউ ভ্রমণে বের হন প্রকৃতির টানে, কেউ ইতিহাসের খোঁজে, কেউ আবার ছবি তুলতে। কিন্তু একটি দেশের সঙ্গে নিজের জন্মদিনের এমন অদ্ভুত মিল খুঁজে নিয়ে বছরের পর বছর সেই দেশটিকে দেখার স্বপ্ন লালন করা—এমন কারণ আগে কখনো শুনিনি।
সেদিন মনে হয়েছিল, কিছু মানুষ শুধু পৃথিবী ভ্রমণ করেন না; তাঁরা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
আর সেই সম্পর্কের শুরু হয়েছিল আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে, নেপালের অন্নপূর্ণা সার্কিটের এক পাহাড়ি পথে।
যে পথে হাঁটতে হাঁটতেই শুরু হয়েছিল এক ভালোবাসার গল্প।
১৯৯৬ সালের পৃথিবী আজকের পৃথিবীর মতো ছিল না। সামাজিক মাধ্যম ছিল না, স্মার্টফোন ছিল না, গুগল ম্যাপ ছিল না। ভিডিও কলে মুহূর্তেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার সুযোগও ছিল না।
তখন ভ্রমণ মানেই ছিল সত্যিকার অর্থে অজানার পথে বেরিয়ে পড়া। কেউ জানত না, পরের মোড়ে কী অপেক্ষা করছে।
সেই সময় নিউজিল্যান্ড থেকে একা ব্যাকপ্যাক কাঁধে নেপালে এসেছিলেন ম্যান্ডি। অন্যদিকে ইংল্যান্ড থেকে বন্ধুদের নিয়ে সাইকেলে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন লি।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো কখনোই পরিকল্পনা মেনে এগোয় না।
ইংল্যান্ডে ভারী তুষারপাতে তাঁদের সাইকেলযাত্রা ভেস্তে যায়। হিচহাইকিং করার চেষ্টা করেও সফল হননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বিমানে ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে ম্যান্ডিরও নেপালে আসার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তিনি ইংল্যান্ডে এক বন্ধুর কাছে যাচ্ছিলেন। ট্রাভেল এজেন্ট বলেছিলেন, নেপাল হয়ে ভারত ঘুরে গেলে খরচ কম পড়বে।
হেসে ম্যান্ডি বলছিলেন, ‘তখন তো ঠিকমতো জানতামই না, নেপাল পৃথিবীর কোথায়!’
জীবনের কিছু সিদ্ধান্ত আমরা নিই। আবার কিছু সিদ্ধান্ত যেন আমাদের জন্য আগেই লেখা থাকে।
অন্নপূর্ণার একটি ছোট্ট টি-হাউসে সেদিন ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল।
দুই ভিন্ন দেশের দুই অভিযাত্রীর দেখা হলো। দুই দলের গন্তব্যও ছিল এক। তাই পথও এক হয়ে গেল।
তারপর শুরু হলো পাশাপাশি হাঁটা। কখনো বরফগলা নদীর পাশ দিয়ে, কখনো দুলতে থাকা ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে, কখনো পাহাড়ের বুক চিরে ওঠা সরু পথ ধরে। দূরে ইয়াকের ঘণ্টার শব্দ, কাছের চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, আর মাথার ওপরে নীল আকাশ।
পাহাড়ে হাঁটার একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। একই পথ ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হাঁটতে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরটাও খুলে দেয়।
তাঁদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল ঠিক তাই।
প্রথম দিন শুধু পরিচয়।
দ্বিতীয় দিন গল্প।
তারপর গল্পের বিষয় বদলাতে লাগল।
নিজের দেশ, পরিবার, স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ—ঘুরেফিরে আসতে থাকল নানা বিষয়।
লিকে থাই ভাষার কিছু শব্দ শেখাচ্ছিলেন ম্যান্ডি। অন্যদিকে ম্যান্ডিকে স্প্যানিশ শেখাচ্ছিলেন লি। অথচ কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা বলেননি। প্রয়োজনও পড়েনি।
আসলে কিছু অনুভূতি শব্দ ছাড়াই জন্ম নেয়।
পূর্ণিমার আলোয় তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল ভ্যালেন্টাইনস ডেতে। আর কয়েক দিন পর তাতোপানির প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে, পূর্ণিমার আলোয়, পাহাড় আর নদীকে সাক্ষী রেখে তাঁরা প্রথমবার একে অপরকে চুমু খেয়েছিলেন।
লি স্মৃতিটা বলার সময়, ত্রিশ বছর পরও তাঁর চোখে সেই আলো ছিল।
ম্যান্ডি হেসে বললেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা দুজনই একই সময়ে প্রেমে পড়েছিলাম।’

তাঁদের মুখের সেই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, কিছু স্মৃতি সময়কে বুড়ো হতে দেয় না।
বারোটি চিঠি আর অচেনা ডাকপিয়নেরা
ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা এসেছিল খুব দ্রুত।
ম্যান্ডির পাসপোর্ট হারিয়ে গেল। নতুন পাসপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে কাঠমান্ডুতে অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে লি রওনা দিলেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পথে।
আজ হলে হয়তো একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, একটি ভিডিও কল কিংবা একটি লোকেশন শেয়ার করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।
কিন্তু ১৯৯৬ সালে ভালোবাসার ভাষা ছিল হাতে লেখা চিঠি।
ম্যান্ডি এক রাতে বসে লিখলেন বারোটি চিঠি। পরদিন ভোরে এভারেস্টগামী বাসে উঠে একের পর এক ট্রেকারের হাতে সেই চিঠিগুলো তুলে দিলেন।
শুধু একটি অনুরোধ করেছিলেন—
‘পথে যদি লি নামে কোনো ইংরেজ ছেলেকে দেখতে পান, দয়া করে চিঠিটা তাঁর হাতে পৌঁছে দেবেন।’
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রতিটি চিঠিই পৌঁছেছিল।
লিও উত্তর লিখেছিলেন। সেই উত্তর আবার অন্য ট্রেকারদের হাত ঘুরে ফিরে এসেছিল ম্যান্ডির কাছে।
ভাবতে অবাক লাগে, সম্পূর্ণ অচেনা মানুষগুলো কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই হয়ে উঠেছিলেন দুটি হৃদয়ের ডাকপিয়ন।
হিমালয়ের পথ ধরে হাতবদল হতে হতে পৌঁছে গিয়েছিল ভালোবাসার বার্তা।
আজও সেই চিঠিগুলোর কয়েকটি তাঁরা যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। কাগজগুলো হয়তো পুরোনো হয়ে গেছে, কিন্তু শব্দগুলোর বয়স বাড়েনি।
ম্যান্ডি আর লির গল্প শুনতে শুনতে একসময় ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি একজন সাংবাদিক। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো উপন্যাসের ভেতরে বসে আছি। যেখানে নায়ক-নায়িকার দেখা হয় না কোনো ক্যাফেতে, নয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে; হয় হিমালয়ের এক ছোট্ট চায়ের দোকানে।
সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণগল্পগুলো পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে নয়।
সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণগল্পগুলো মানুষের।
কারণ, শেষ পর্যন্ত আমরা কোনো দেশকে মনে রাখি না। মনে রাখি সেই দেশের মানুষকে। তাঁদের গল্পকে। তাঁদের স্পর্শকে।
হয়তো সে কারণেই ম্যান্ডি ও লির ১২৭ দেশের দীর্ঘ ভ্রমণজীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি কোনো দর্শনীয় স্থান থেকে নয়, শুরু হয়েছিল একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে। (চলবে)
ছবি: সামাজিক মাধ্যম ও লি–ম্যান্ডির সৌজন্যে