
শহুরে ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যে সময়টুকু বিশ্রামের সময় পায়, তা কোনো যানবাহনের সিটে কোনো তীব্র ট্রাফিক জ্যামে। ধরো, তুমি এই রকমই কোনো পরিস্থিতিতে পড়েছ আর ভাবছ কীভাবে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া যায়। তোমার মাথায় যেসব সমাধান আসতে পারে—
*রাস্তার সংখ্যাবৃদ্ধি অথবা ফ্লাইওভারের সংখ্যাবৃদ্ধি;
*মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করা;
সাধারণত বইপুস্তক থেকে শেখা এই জ্ঞানগুলোকেই আমরা ট্রাফিক সমস্যার সমাধান বলে মনে করি। তবে গণিত এগুলোকে সমাধান নয়; বরং সমস্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখে। চলো গণিতের মাধ্যমে এই সমস্যার সঠিক সমাধান বের করি।
গ্রাফ থিওরি এবং বিন্দুর খেলা (Graph Theory)-
গ্রাফ হলো অসংখ্য বিন্দুর একটি নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিটি বিন্দু একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। গণিতবিদেরা একটি শহরকে একটি বিশাল গ্রাফের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে বিভিন্ন স্থানগুলো হলো বিন্দু এবং একটি স্থান থেকে অপর স্থানে যাওয়ার রাস্তা হলো একটি রেখা। ঠিক এই গ্রাফ থিওরির ওপর নির্ভর করে গুগল ম্যাপে (Google Map) এর মতো অ্যাপগুলো আমাদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে থাকে। গ্রাফ থিওরি যখন একটি স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার সব রাস্তা দেখায়, তখন ‘ডাইকস্ট্রার অ্যালগরিদম’ ওই স্থানে পৌঁছানোর সবচেয়ে উত্তম রাস্তাটি দেখায়।
ডাইকস্ট্রার অ্যালগরিদমও কীভাবে এটি কাজ করে?
ডাইকস্ট্রারের অ্যালগরিদম হলো একটি অ্যালগরিদম, যা একটি ওয়েটেড গ্রাফে বিন্দুগুলোর মধ্যে সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই অ্যালগরিদম কোনো রাস্তার ‘Path Weight’ নির্ণয় করে। এর মান নির্ভর করে ট্রাফিক ঘনত্ব, রাস্তার দূরত্ব, ভ্রমণের সময়কাল এবং রাস্তার অবস্থা এই ৪টি বিষয় আর ওপর। ধরা যাক, কোন ব্যক্তি A স্থান থেকে B স্থানে যেতে চায় এবং তার কাছে চারটি রাস্তা আছে। এখন অ্যালগরিদমটি এই চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ৪টি রাস্তার ‘Path Weight’ নির্ণয় করবে। যে রাস্তা ‘Path Weight’ সবচেয়ে কম হবে গুগল ম্যাপ ওই রাস্তাটি সবচেয়ে উত্তম রাস্তা হিসেবে বিবেচনা করবে।
ব্রায়াসের প্যারাডক্স হলো ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চমৎকার তবে অদ্ভুত গাণিতিক ধারণা। সহজ কথা বলতে গেলে একটি যানজটপূর্ণ এলাকায় যানজট কমানোর জন্য যদি কেউ রাস্তা বানায়, তবে ট্রাফিক সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই ভাবে একটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাফিক সমস্যাটি নির্মল করে দিতে পারে। চলো একটি উদাহরণের মাধ্যমে জিনিসটি বোঝা যাক।
ব্রায়াসের প্যারাডক্স (Braess’s Paradox) -কীভাবে আরও রাস্তা তৈরি করলে যানজট আরও বাড়তে পারে!
ব্রায়াসের প্যারাডক্স হলো ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি চমৎকার তবে অদ্ভুত গাণিতিক ধারণা। সহজ কথা বলতে গেলে একটি যানজটপূর্ণ এলাকায় যানজট কমানোর জন্য যদি কেউ রাস্তা বানায়, তবে ট্রাফিক সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই ভাবে একটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাফিক সমস্যাটি নির্মল করে দিতে পারে। চলো একটি উদাহরণের মাধ্যমে জিনিসটি বোঝা যাক।
ধরো, আমরা A থেকে B অবস্থানে যাব। এখন এই ক্ষেত্রে আমাদের কাছে ৩টি রাস্তা আছে। এখন এই অবস্থানে যেতে গেলে সবচেয়ে কম দূরত্বের রাস্তা হয় ১ম রাস্তাটি, ফলে সব থেকে বেশি ভালো মানুষ এই রাস্তা দিয়ে যায়। তবে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক সময় ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হয়। ফলে অনেকেই আবার ২য় এবং ৩য় রাস্তাটি সুষমভাবে বেছে নেয়।
এই অবস্থায় যদি একটি ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়, তবে অবশ্যই চিন্তা করা হবে যেন ওই ফ্লাইওভার দিয়ে ওইখানে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। এখন যেহেতু নতুন রাস্তা নিয়ে কারোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সবাই ঐ নতুন রাস্তা দিয়ে যেতে চাইবে, যার ফলে ওই রাস্তায় বিশাল ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেবে।
আচ্ছা, এবার সরকার সিদ্ধান্ত নিল নতুন ফ্লাইওভার না করে ১ম রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিল। সরকার যখন ১ম রাস্তাটি বন্ধ করে দিল, তখন চালকদের সামনে বিকল্প রাস্তা বেছে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হলো, যা সামগ্রিকভাবে ট্রাফিকের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করল এবং জ্যাম কমিয়ে দিল।
শুনে কি অবিশ্বাস্য লাগছে? তবে চলো কিছু বাস্তব ঘটনা জানা যাক-
নিউইয়র্ক সিটি (১৯৯০): আর্থ ডে (Earth Day) উপলক্ষে শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত ‘42nd Street’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল পুরো শহর একটি বড় ট্রাফিক জ্যামে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যানজট উল্টো কমে গেছে!
সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া (২০০৩): শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি বড় ছয় লেনের হাইওয়ে ভেঙে সেখানে পার্ক এবং নদী তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক গতিশীল হয়েছিল।
কিউয়িং থিওরি (Queueing Theory)
তোমরা কি কখনো ভেবেছ, সিগন্যালে কেন এত লম্বা লাইন তৈরি হয় এবং কেন জ্যাম পেছনের দিকে ছড়াতে থাকে? এর পেছনে ব্যাখ্যা দেয় ‘কিউয়িং থিওরি’
মূল কথাটি হলো, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে X সংখ্যক গাড়ি ঢুকছে এবং Y সংখ্যক গাড়ি বের হচ্ছে। যখন এই X–এর মান Y থেকে বেশি হয় তখন ধীরে ধীরে জ্যাম পেছনের বাড়তে থাকে। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ৫০টি গাড়ি প্রবেশ করছে কিন্তু সিগন্যাল বা সরু রাস্তার কারণে প্রতি মিনিটে মাত্র ৪০টি গাড়ি বের হতে পারছে। আবার এই অবস্থায় রাস্তার একটা ছোট্ট মোড়ে একটি গাড়ি যদি হুট করে লেন পরিবর্তন করে ২ সেকেন্ডের জন্য ব্রেক চাপে, তার ঠিক পেছনে থাকা ১০০টি গাড়িকেও ব্রেক চাপতে হয়, এইভাবে জ্যামটি বিশাল আকার ধারন করে। ট্রাফিক জ্যাম এড়ানোর জন্য এসব স্থানে ব্রেক না চাপতে আরেকটু সামনে গিয়ে হালকা স্থানে ব্রেক চাপতে হবে। এই কারণে বর্তমানে রাস্তার মাঝখান কিছু নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া রাস্তা পার হওয়া যায় না এটি করার মূল উদ্দেশ্য অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রাফিক জ্যাম এড়ানো।