Home / বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি / মানুষের চন্দ্রজয় সত্যি না ভুয়া?
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের চাঁদে হাঁটার ঘটনা আজও অনেকের কাছে ভুয়া মনে হয়।

মানুষের চন্দ্রজয় সত্যি না ভুয়া?

মহাকাশের বিশাল অসীমতা ও অচেনা রহস্য মানুষকে যুগে যুগে কৌতূহলী করেছে। সেই কৌতূহল থেকেই মানুষ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রেখেছিল। কিন্তু এই ঐতিহাসিক অর্জন নিয়েও সমাজে ছড়িয়ে আছে নানা জটিল সংশয় ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের চাঁদে হাঁটার ঘটনা আজও অনেকের কাছে ভুয়া মনে হয়। গত ৫৭ বছরে নানা মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, মানুষের চন্দ্রজয়ের পুরো ঘটনা একটি নাটকমাত্র। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল স্পেস সেন্টারের ডিসকভারি ডিরেক্টর অনু ওঝা বলেন, ‘আমরা অনলাইনে তথ্যের এক বিশাল সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছি। মানব ইতিহাসের পুরো সময় মিলিয়ে যত তথ্য পাওয়া গেছে, গত কয়েক বছরে তথ্যের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। এই তথ্যের মহাসমুদ্র দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। এই ঝড়ের মধ্যে পথ চলার একমাত্র উপায় হলো সূক্ষ্মভাবে চিন্তাভাবনা করার দক্ষতা। চন্দ্র বিজয় নিয়ে অনেক সংশয় বা ভুয়া তথ্য রয়েছে। এসব বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।

সংশয় ১: ছবির ছায়ার দিক সমান্তরাল নয়

১৯৬৯ সালের চন্দ্রজয়ের সময় তোলা বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, আর্মস্ট্রং ও অন্য একটি বস্তুর ছায়া সমান্তরালভাবে পড়েনি। অনেকের দাবি, সূর্য একমাত্র আলোর উৎস হলে ছায়া সমান্তরাল হওয়া উচিত ছিল। একাধিক কৃত্রিম আলো ব্যবহারের কারণেই কি এমন হয়েছে? অনু ওঝা বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি চাঁদের পৃষ্ঠের ছবি। কিন্তু আমরা পৃথিবীতেও চাইলেই এ ঘটনা ঘটাতে পারি। আপনারাও সবাই বিষয়টি নিজে খেয়াল করেছেন। পারসপেক্টিভ বা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমান্তরাল রেখাকেও অসমান্তরাল মনে হয়। আপনি যখন ত্রিমাত্রিক কোনো ঘটনাকে দ্বিমাত্রিক ক্যানভাসে আনবেন, তখন রেখা অদ্ভুত আচরণ করতে পারে। শিল্পীরা শত শত বছর ধরে এই কৌশল ব্যবহার করছেন। সূর্য যখন আকাশে নিচের দিকে থাকে, তখন বাইরে বের হয়ে দেখলেও ছায়া সমান্তরাল দেখাবে না।

সংশয় ২: ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্টের তেজস্ক্রিয়তা

পৃথিবীর চারপাশ ঘিরে রয়েছে আধানযুক্ত কণার এক জটিল অঞ্চল। এটিকে বলা হয়, ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট। এখানে সূর্য থেকে আসা প্রচণ্ড শক্তিশালী কণা আটকে থাকে। এই অঞ্চলে উচ্চ তেজস্ক্রিয়তার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। চন্দ্রাভিযানের নভোচারীরা কীভাবে এই তেজস্ক্রিয়তা পার হয়ে বেঁচে ফিরলেন? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন অনু ওঝা। তিনি বলেন, আপনি যদি কখনো আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে থাকেন, তবে জানবেন আগুনের গর্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব সেটি পার হতে হবে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, পায়ের তাপ পরিবাহিতার কথা ভাবলে দ্রুত হেঁটে গেলে পা পোড়ার মতো তাপ পায়ে পৌঁছাবে না। আপনি একদম ঠিক থাকবেন। শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। একইভাবে অ্যাপোলো যাত্রার শুরুতে এই ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট পার হওয়ার সময় খুব কম ছিল। আপনি যদি যথেষ্ট দ্রুত যান, তবে ভ্যান অ্যালেন পার হওয়া মোটেও কোনো সমস্যা নয়। চাঁদে যেতে হলে তো আপনাকে দ্রুতই যেতে হবে।

সংশয় ৩: ছবিতে কোনো তারা দেখা যায় না কেন?

১৯৬৯ সালে চাঁদের ছবিতে আকাশ একদম কালো দেখায়, কিন্তু কোনো তারা দেখা যায় না। ষড়যন্ত্রকারীদের মতে, নাসা তারা তৈরিতে ব্যর্থ হয়ে ছবি থেকে তা বাদ দিয়েছে। আসল বিষয় হলো, সেই সময়ে নভোচারী ও চাঁদের মাটি দুটিই ছিল প্রখর সূর্যের আলোতে আলোকিত। দিনের বেলায় প্রখর আলোতে তোলা ছবির ক্ষেত্রে ক্যামেরার শাটার স্পিড অনেক দ্রুত রাখতে হয়। পাশাপাশি অ্যাপারচার রাখতে হয় খুব ছোট। এ অবস্থায় তারার মতো অস্পষ্ট বস্তু ছবিতে ফুটে ওঠে না।

চাঁদে পতাকা ওড়ার দৃশ্যের সত্যতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে

সংশয় ৪: বাতাসে পতাকা ওড়ার দৃশ্য

চাঁদের বুকে বাজ অলড্রিনের পতাকা স্যালুট করার দৃশ্যটি অন্যতম এক স্মারক। চাঁদে কোনো বাতাস নেই, তবু পতাকা উড়ছিল কেন? ছবিটি ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, পতাকার ওপরের প্রান্তে একটি টেলিস্কোপিক রড বা পোল দিয়ে যুক্ত করা ছিল। ফলে এটি সোজা হয়ে ভেসে ছিল। বিজ্ঞানী ওঝা ব্যাখ্যা করে বলেন, এভাবে স্থাপন করার কারণেই এটিকে বাতাসে ওড়ার মতো মনে হচ্ছে। আর চার দিন ধরে ভাঁজ করে নিয়ে যাওয়ার কারণে পতাকায় সব কুঁচকানো দাগ থেকে গিয়েছিল।

সংশয় ৫: মানুষ আর কখনো চাঁদে গেল না কেন

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ ছিল চাঁদে শেষ মানববাহী মিশন। এরপর মানুষ আর সেখানে যায়নি। এ প্রসঙ্গে অনু ওঝা জানান, এটি কোনো চক্রান্ত ছিল না। এটি ছিল স্রেফ ভূরাজনীতি। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার বদলে ফেলেছিল। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং আমরা প্রতিযোগিতায় জিতে গেছি—এমন ভাবনার একটি ভূরাজনৈতিক প্রভাব ছিল এখানে। চাঁদে বিজ্ঞান গবেষণা চালুর ঠিক উপযোগী সময়েই যুক্তরাষ্ট্র থেমে যায়। পরবর্তী সময়ে নজর দেওয়া হয় স্পেস শাটল ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দিকে।

সংশয় কাটিয়ে চিরন্তন পদচিহ্ন

২০০৯ সালে লুনার রিকনসায়েন্স অরবিটার চাঁদের পৃষ্ঠের অনেক উচ্চমানের ছবি তোলে। সেখানে অ্যাপোলো নামার সব কটি স্থান স্পষ্ট দেখা গেছে। অনু ওঝা বলেন, বিভিন্ন ছবি আমাকে সত্যি অবাক করে। সেই পদচিহ্ন এখনো আছে। চাঁদের গাড়ির সেই চাকার দাগ কোটি কোটি বছর ধরে হুবহু থেকে যাবে। মানবসভ্যতার যা-ই ঘটুক না কেন, মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই আমাদের চিহ্ন রেখে এসেছি।

সূত্র: রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রিনউইচ

About Editor Todaynews24

Check Also

সাড়ে তিন ঘণ্টা পর সচল ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপ

হঠাৎ ডাউন হয়ে যাওয়ার সাড়ে তিন ঘণ্টা পর মেটা প্ল্যাটফর্মের মালিকানাধীন—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ সচল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *