দূর থেকেই চোখে পড়ল তাঁর কাটআউট। নাচের সেই মোহনীয় ভঙ্গি। মিলনায়তনের বাইরে দেয়ালজুড়ে পোস্টার। সেখানে তাঁর ছবি ছাড়াও আছে বিভিন্ন অ্যালবামের নাম, গানের তালিকা। তরুণেরা কেউ রিলস বানাতে ব্যস্ত, কেউ ছবি তুলতে। এই উন্মাদনা যে মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে, বলাই বাহুল্য। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ছিল ‘প্লেলিস্ট ট্রিবিউট টু অরিজিনালস’। মাইকেল জ্যাকসনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর গান গাইবে ওয়ারফেজ। ওয়ারফেজের ভক্ত-অনুসারীর অভাব নেই। তাই প্রিয় ব্যান্ড যখন পপসম্রাটকে শ্রদ্ধা জানাতে এমন আয়োজন করেছে, ভক্তরা কি আর দূরে থাকতে পারেন।
দেখতে দেখতে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠি, ৬টা ৪৭। কনসার্ট তো সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়ার কথা। আয়োজকদের একজন ছুটে এসে জানান, ৭টায় শুরু হবে। উত্তর শুনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচা।
ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, মঞ্চ আর আশপাশ ছবি, পোস্টারে মাইকেলকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত। ঠিক ৭টা ১০ মিনিটে সব আলো নিভে গেল। মঞ্চের সামনে বসানো পর্দায় শুরু হলো মাইকেলের অ্যানিমেটেড উপস্থাপনা। একটু আলো বাড়তেই মঞ্চে দেখা গেল মাইকেলের সেই নাচ। মাইকেলের সাজে তাঁর নাচের মুদ্রা অনুকরণ করে চমকে দিলেন এক শিল্পী। ধীরে ধীরে সব আলো জ্বলে উঠল, তুমুল করতালির মধ্যে মঞ্চে হাজির হলো ওয়ারফেজ।
দর্শকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ব্যান্ডের ভোকাল পলাশ নূর শুরু করলেন, ‘বিলি জিন’। ঘণ্টাখানেকের বিলম্বের বিরক্তি ভুলে মাইকেলের জাদুতে মেতে উঠলেন দর্শক। সেই যে শুরু, আর থামা নেই। একটানা চলল ১৬টি গান। একে একে ‘ইউ আর নট অ্যালোন’, ‘ব্ল্যাক অর হোয়াইট’, ‘দে ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট আস’, ‘হিউম্যান নেচার’, ‘বিট ইট’, ‘ব্যাড’ থেকে ‘থ্রিলার’ দিয়ে মুগ্ধতা ছড়াল ওয়ারফেজ। এদিন দারুণ ছন্দে ছিলেন পলাশ, প্রতিটি গানেই তৈরি হয়েছিল মূলের আবহ। মাঝে মাইকেলের ‘ব্যাড গার্ল’ নিয়ে হাজির হন ওয়াহিদা হোসাইন, তাঁর হাই স্কেলের পরিবেশনাও ছিল দারুণ। ওয়াহিদা ছাড়া ব্যাক ভোকালে তোরসা, অন্তরা, তাসফির পারফরম্যান্সও ছিল চোখে পড়ার মতো।
শুরুর দিকে কয়েকটি গান ওয়ারফেজ বাজালেও পরে কয়েকটি গানে মূল গানের ট্র্যাক ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি গান চলার সময়ই মঞ্চের সামনে মাইকেল জ্যাকসনের লুক অ্যালাইকরা পারফর্ম করেন, কখনো মাইকেলের গানের মিউজিক ভিডিওর গল্প তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। এই পারফরমারদের মধ্যে চোখে পড়েছে উজ্জ্বল, হিমুর নাচ। একটা গানে পারফর্ম করেন বান্দরবানের বেসিক গিটার লার্নিং স্কুলের শিক্ষার্থীরা; যা আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সব দর্শকের দেখার জন্য পাশে যে বড় পর্দা ছিল, সেটা তৈরি করা হয় পুরোনো দিনের টিভির আদলে। যেটা আয়োজনকে বেশ একটা রেট্রো লুক দিয়েছিল।
রাত ৯টায় ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ দিয়ে শেষ হয় মাইকেল ট্রিবিউট। ১৯৮৫ সালে আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে তহবিল সংগ্রহ করতে যৌথভাবে গানটি লিখেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন ও লিওনেল রিচি। ওয়ারফেজের সঙ্গে গানটিতে গলা মেলান উপস্থিত দর্শকেরাও। বাংলাদেশের পতাকা হাতে মঞ্চে হাজির হন সব পারফরমার। সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম আবহ।
ফিরতে ফিরতে মনে পড়ল, ১৯৯২ সালের এই দিনেই তো বিখ্যাত ‘ডেঞ্জারাস ওয়ার্ল্ড ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। সেই দিনেই আবার ঢাকায় অন্যভাবে ফিরে এলেন তিনি।
এমনিতেই ২০২৬ সালটা যেন ‘মাইকেল বর্ষ’। কিছুদিন আগেই তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত সিনেমা মাইকেল বক্স অফিসে ১০০ কোটি ডলার আয় করে রেকর্ড গড়েছে। মৃত্যুর ১৭ বছর পর আজও তিনি দেশে দেশে কতটা সমাদৃত, এতেই বোঝা যায়। তাই চোখের সামনে এক বেপরোয়া যুবক যখন ‘বিট ইট’ গাইতে গাইতে অনায়াস লাফে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ফেললেন; একটুও আশ্চর্য লাগল না।