সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিলে আমাদের কী হবে
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিলে আমাদের কী হবে

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিলে আমাদের কী হবে

কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুধু বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মস্থল নয়, দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার ভিত্তি। এসব দেশ থেকে লাখো প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় প্রবৃদ্ধি পর্যন্ত এক অদৃশ্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যে মধ্যপ্রাচ্য লাখো বাংলাদেশির স্বপ্ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস ছিল, সে ভূখণ্ড এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ধোঁয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা তেলের বাজারের ওঠানামার চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ভেতরে, যেখানে অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমের চাহিদা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবোটিকস মানুষের হাতে করা বহু কাজের বিকল্প হয়ে উঠছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে জাতীয়করণ নীতির মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী এক দশকে এসব দেশে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদার চরিত্রই বদলে যেতে পারে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার যদি বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সনির্ভর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মৌলিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আজ আর কাল্পনিক নয়; বরং ক্রমেই নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এটি শুধু কতজন বাংলাদেশি বিদেশে যাবেন, তা নয়; বরং আগামী দশকে আদৌ আমাদের শ্রম রপ্তানির প্রচলিত মডেলটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে। এ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। কারণ, এটি শুধু শ্রমবাজারের সংকট নয়—আমাদের উন্নয়ন কৌশল, বৈদেশিক আয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আগের মতো নেই

বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রতিবছর ১০ লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের বড় অংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো, যেখান থেকে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে। কিন্তু এই বিপুল জনশক্তির বেশির ভাগই স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিক।

এই মডেল গত তিন দশকে সফল ছিল। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, পর্যটন, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত শিল্পের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে চলছে ‘সৌদীকরণ’, কাতারে চলছে ‘কাতারীকরণ’, সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলছে ‘আমিরাতকরণ’, কুয়েতে চলছে  ‘কুয়েতীকরণ’ আর ওমানে চলছে ‘ওমানীকরণ’ তথা নিজেদের নাগরিকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।

এ প্রবণতা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশেও দেখা যাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই এসব জাতীয়করণ নীতির মূল উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অটোমেশন, স্মার্ট লজিস্টিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা পুনরাবৃত্তিমূলক স্বল্প দক্ষ কাজের চাহিদা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে অবকাঠামো নির্মাণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পগুলোর গতি ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছানোয় মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক  নির্মাণশ্রমিকের চাহিদাও আগের মতো নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এখন পরিমাণের চেয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিশেষায়িত পেশাগত যোগ্যতার মূল্য দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশসহ প্রচলিত শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিমানবন্দর থেকে ফেরত যাচ্ছেন যাত্রী। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে

কেন এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিচ্ছে। তারা দেখিয়েছে, দু–এক বছরের মধ্যে আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ চাকরি (প্রায় ৮০ লাখ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে আর প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি (প্রায় ১২ লাখ) স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছে, অর্থাৎ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমের পরিবর্তে দক্ষ ও প্রযুক্তি-সক্ষম কর্মীর চাহিদা বাড়বে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আরব অঞ্চলের কর্মসংস্থানের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ খাতে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, আরব অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান নির্মাণ, উৎপাদন, পরিবহন, বাণিজ্য ও আতিথেয়তা খাতের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কেন্দ্রীভূত, যেখানে বিদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

সংস্থাটির ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরব অঞ্চলে মোট কর্মঘণ্টা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই হ্রাস ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার ধাক্কারও চেয়ে বড় (তথ্য সূত্র: আইএলও, ২০২৬)। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতায় কর্মসংস্থান সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবেন অভিবাসী শ্রমিকেরা। কারণ, এই দেশগুলোয় নতুন শ্রমিক নিয়োগ কমার এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ দুর্বল হওয়ারও প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ কাজে নিয়োজিত। ফলে তাঁরা সাধারণত কম মজুরি পান, সহজে প্রতিস্থাপিত হন এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের ধাক্কাও সবার আগে তাঁদের ওপর আসে। অন্যদিকে একই সময়ে আরব বিশ্বজুড়েই চাহিদা বাড়ছে শিল্প অটোমেশন প্রযুক্তিবিদ, উন্নত ওয়েল্ডার, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, লজিস্টিকস অপারেটর, তথ্যপ্রযুক্তি-দক্ষ কর্মী এবং ডিজিটাল রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ কি সেই মানুষগুলো তৈরি করছে? সৎ উত্তরটি সম্ভবত—এখনো নয়।

নির্মাণশ্রমিক, সাধারণ সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহস্থালি কর্মী বা নিম্নস্তরের সেবা খাতের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান অভিবাসন পথ তৈরি করেছে। এ কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব কর্মীর শ্রম ছাড়া অনেক অর্থনীতি চলতে পারে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তবতা হলো সব কাজের মূল্য সমানভাবে বাড়বে না।

যেসব কাজ পুনরাবৃত্তিমূলক ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য, সেগুলো ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়বে। অটোমেশন, রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এ পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। এর অর্থ এই নয় যে আগামীকাল লাখ লাখ শ্রমিকের চাকরি চলে যাবে; বরং পরিবর্তনটি ধীরে ধীরে আসবে—কম স্বল্প দক্ষ কর্মী নিয়োগ হবে, দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়বে, একই কাজের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হবে এবং যাঁরা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন না, তাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।

চার দশক ধরে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যেকে সস্তা শ্রম দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না, কিনবে দক্ষতা। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে শ্রমবাজারে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সংখ্যায় বেশি কর্মী বিদেশ পাঠায় না; বরং অত্যাধুনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে পাঠায়।

ধরা যাক, আগামী ১০ বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমানে স্বল্প দক্ষ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেল। তখন কী হবে? অনেকের ধারণা, শুধু রেমিট্যান্স কমবে। বাস্তবে সংকট শুরু হবে তারও আগে। প্রথমে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কমবে। এরপর মজুরি কমবে। নিয়োগকর্তারা একই বেতনে আরও দক্ষ কর্মী নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশের স্বল্প দক্ষ শ্রমিক সবচেয়ে আগে বাদ পড়বেন। হাজার হাজার প্রত্যাবর্তী শ্রমিককে দেশি শ্রমবাজারে ফিরতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমবে। গ্রামীণ ভোগ ব্যয় কমবে। যে পরিবারগুলো প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর চাপ বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ পড়বে। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, অর্থাৎ এটি শুধু শ্রমবাজারের সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের জন্য একটি কাঠামোগত ঝুঁকি।

অন্য দেশগুলো কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে

বাংলাদেশের মতোই ফিলিপাইন, ভারত, ভিয়েতনাম, নেপাল বা পাকিস্তান একই বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করে, কিন্তু তাদের কৌশল ভিন্ন। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মেরিটাইম পেশাজীবী এবং বিভিন্ন সেবা খাতের দক্ষ কর্মী তৈরি করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ফিলিপাইন শুধু শ্রমিক পাঠায় না, নির্দিষ্ট দেশের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী নার্স, কেয়ারগিভার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ ও কারিগরির কর্মী তৈরি করে। ভারত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।

নেপাল সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যাতে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় দেশি অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা সনদ, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে নেপাল যৌথ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পাকিস্তান বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ননীতিতে জোর দিয়ে কোন খাতে উপসাগরীয় দেশগুলোয় ভবিষ্যতে চাহিদা থাকবে সে অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সনদায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তান প্রবাসী কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আধুনিক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জব-ম্যাচিং, ডিজিটাল সার্টিফিকেট যাচাই, অনলাইন প্রি-ডিপার্চার প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালুর রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে। দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষতার পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যাতে স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠানো যায়।

এসব দেশ তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মী দিয়েও তারা বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও একই পথে যেতে হবে। বাংলাদেশের নীতিও সংখ্যাভিত্তিক অভিবাসন থেকে দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসনের দিকে না গেলে এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।

সমাধান কোথায়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কীভাবে আরও বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো যায় কিংবা রেমিট্যান্স কত বাড়ল—এই সংখ্যাতাত্ত্বিক মানসিকতা বাদ দিতে হবে। চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নিতে হবে, কীভাবে এমন দক্ষ কর্মী তৈরি করা যায়, যাঁদের জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তারা প্রতিযোগিতা করবেন। এ পরিবর্তনের জন্য অন্তত পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে:

প্রথমত, বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। কোন দেশে আগামী ১০ বছরে কোন পেশার চাহিদা বাড়বে, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এর জন্য শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র বাড়ালেই হবে না, দরকার একটি সমন্বিত ‘দক্ষতা কূটনীতি’।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি সনদ ও দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশি কর্মীরা উচ্চমূল্যের চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। শুধু একটি প্রশিক্ষণ সনদ দিয়ে কর্মী তৈরি করলে হবে না, সেই দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, ভাষা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে অভিবাসন প্রস্তুতির অপরিহার্য অংশ করতে হবে। ইংরেজি, আরবি ভাষাসহ সফট স্কিলকে প্রশিক্ষণের বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।

চতুর্থত, বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।

পঞ্চমত, অভিবাসনকে শুধু প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে নয়; শিক্ষা, শিল্প, পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।

সবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী আর ভারত, নেপাল বা পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হচ্ছে প্রযুক্তি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব দক্ষ কর্মীবাহিনী। এ প্রতিযোগিতায় জিততে হলে মানুষ রপ্তানি নয়, দক্ষতা রপ্তানির নীতি গ্রহণ করতে হবে। চার দশক ধরে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যেকে সস্তা শ্রম দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না, কিনবে দক্ষতা। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে শ্রমবাজারে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সংখ্যায় বেশি কর্মী বিদেশ পাঠায় না; বরং অত্যাধুনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে পাঠায়।

সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
*মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

দিল্লির রাজপথ যখন জ্বলছে, সংসদ তখন চুপ থাকতে পারে না

দিল্লির রাজপথ যখন জ্বলছে, সংসদ তখন চুপ থাকতে পারে না

একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আসল শক্তি শুধু আইন প্রয়োগের ক্ষমতায় নয়, ভিন্নমতকে কতটা নম্রতা ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তার মধ্যেও নিহিত।একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ভয় পায় না, বরং সেটিকে নাগরিকদের উদ্বেগ ও আশঙ্কার আয়না হিসেবে দেখে। কিন্তু দুর্বল শাসনব্যবস্থা সেই আয়নাকে শত্রু ভেবে লাঠিপেটা আর দমন-পীড়নের মাধ্যমে ভেঙে ফেলতে চায়। আর সেই ভাঙা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *