সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / ভারতের ‘তেলাপোকাদের’ বিজয় যা প্রমাণ করল
ভারতের ‘তেলাপোকাদের’ বিজয় যা প্রমাণ করল

ভারতের ‘তেলাপোকাদের’ বিজয় যা প্রমাণ করল

যাঁরা ভারতীয় গণতন্ত্রকে সাধারণত বড় বড় নির্বাচন বা প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ার আশঙ্কার দৃষ্টিতে দেখেন, তাঁদের জন্য সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। এ সময়ে দেখা গেছে, গণতন্ত্রের ভিত এখনো কতটা শক্তিশালী। একটি অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে শুরু হয়ে যে ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং সফল যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

সবকিছুর শুরু একটি অপমানজনক মন্তব্য থেকে। মে মাসের মাঝামাঝি, এক খোলা আদালত শুনানিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ এবং ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। যদিও সূর্যকান্ত দাবি করেন, তিনি আসলে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে আইন পেশায় ঢোকার চেষ্টা করা লোকদের উদ্দেশেই এই মন্তব্য করেছিলেন, তবু কথাটি দেশজুড়ে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ, এমন এক দেশে যেখানে কোটি কোটি শিক্ষিত তরুণ-তরুণী
চাকরির অভাব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, সেখানে এ মন্তব্য তাঁদের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি আঘাত হানে।

এই অপমানের জবাবে তরুণেরা হতাশ বা নীরব হয়ে থাকেননি। বরং তাঁরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। মাত্র এক দিনের মধ্যেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন উদ্যোগ তৈরি হয়, যা দেশের ক্ষমতাসীন দলের নামের সঙ্গে ‘শব্দখেলা’ করে তৈরি। তাদের স্লোগান ছিল, ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’, যা ছিল একধরনের ব্যঙ্গ। কয়েক দিনের মধ্যেই এই সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাদের অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটির বেশি হয়ে যায়, যা দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়।

এই ব্যঙ্গের পেছনে ছিল বাস্তব সমস্যার গভীর প্রতিফলন। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি হলেও তাঁরা এখনো উচ্চশিক্ষাকেই সামাজিক উন্নতির একমাত্র পথ হিসেবে দেখেন। তাই তাঁরা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। কিন্তু এ বছর সেই প্রক্রিয়া বড় ধরনের সংকটে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়নের অনিয়ম ও ফলাফল হঠাৎ বাতিল হওয়ার মতো ঘটনায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীকে আবার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। এই পরীক্ষা বাতিল হওয়ার খবর শুনে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। ফলে অর্থনৈতিক হতাশা একসময় নৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি

গণতন্ত্র শুধু সংসদ, আদালত বা নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের অভ্যাস, তাদের অংশগ্রহণ এবং প্রতিবাদের মধ্যেও বেঁচে থাকে। ভারতের নাগরিকেরা দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের গণতান্ত্রিক চেতনা এখনো অদম্য।

এই ক্ষোভ প্রকাশের জন্য ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না এবং সমাজের বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ এতে সমর্থন জানান। জুন মাসে এই আন্দোলন অনলাইন থেকে রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান।সরকার শুরুতে এই আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়নি।

পরে যখন তারা বুঝতে পারে যে এটি উপেক্ষা করা যাবে না, তখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিছু নেতা আন্দোলনটিকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে দোষারোপ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনের সংগঠকদের ওপর নজরদারি চালানো হয়। জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, রাজধানীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবু আন্দোলন থামেনি। এর বিকেন্দ্রীকৃত চরিত্র ও দাবিদাওয়ার নৈতিক শক্তি সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে অকার্যকর করে দেয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো মানুষ জড়ো হন, যা জায়গার ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তাঁরা সংসদের দিকে মিছিলের ডাক দেন।

সরকার এরপর আরও কঠোর হয়। পুলিশ লাঠিপেটা করে, অনেককে মারধর করে, জলকামান ও পেলেট বন্দুক ব্যবহার করা হয়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৮০ জন আহত হয়। কিন্তু এতে আন্দোলন দমে যায়নি। বরং ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এবং আন্দোলন দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সরকার বুঝতে পারে যে তারা ভুল করেছে। আগের কিছু আন্দোলনের মতো এটিকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমস্যা বলে দেখানো সম্ভব হয়নি। এই আন্দোলনে যে তরুণেরা যুক্ত, তাঁরা দেশের ভোটারদের প্রায় অর্ধেক। তাঁদের অনেকেই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন এবং এর মধ্যে অনেকেই আগে সরকারকে সমর্থন করতেন। তাই তাঁদের বিরোধিতা করলে রাজনৈতিকভাবে বড় ক্ষতি হতে পারে।

অবশেষে সরকার পিছিয়ে আসে। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসে এবং পরীক্ষা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শাস্তি দেওয়ার জন্য বিশেষ বিচারব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও গ্রহণ করে, যা আগে তারা মানতে রাজি ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি তৈরি করা একটি সরকারের জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল বড় পরিবর্তন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের তরুণেরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে ক্ষমতাসীনেরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, জনগণের ইচ্ছাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায় না। তাঁরা আরও প্রমাণ করেছেন যে দমন-পীড়ন দিয়ে হয়তো কিছু সময়ের জন্য বিরোধিতা চেপে রাখা যায়, কিন্তু তরুণদের প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল আন্দোলনকে থামানো কঠিন।

এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। গণতন্ত্র শুধু সংসদ, আদালত বা নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের অভ্যাস, তাদের অংশগ্রহণ এবং প্রতিবাদের মধ্যেও বেঁচে থাকে। ভারতের নাগরিকেরা দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের গণতান্ত্রিক চেতনা এখনো অদম্য। এই আন্দোলনের সাফল্য শুধু মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা এবং শক্তিশালী শাসনের মধ্যেও জনগণের শক্তিই শেষ কথা। এই শক্তি হারিয়ে যায়নি, আর ভারতের গণতন্ত্রও টিকে থাকবে।

  • শশী থারুর জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং ভারতের পররাষ্ট্র ও মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে ভারতের বিরোধীদলীয় এমপি

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

About Editor Todaynews24

Check Also

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ

রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা মানে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর হতাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *