-
চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলায় পুলিশের তালিকায় ১০৯ জন; এর বাইরে রয়েছে অন্তত ১৩৯ অস্ত্রধারী।
-
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনে অস্ত্র নিয়ে আক্রমণকারী ৪৬ জনের কারও নাম ‘শুটার’ তালিকায় নেই।
-
ফেনীর তালিকায় অস্ত্রধারী মাত্র ৫ জন। অনুসন্ধানে আরও অন্তত ৩৩ জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
চুরি-ছিনতাই দিয়ে অপরাধজগতে ঢোকা শহীদুল ইসলাম পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। একসময় ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা হিসেবে পরিচিত এই শহীদুল এখন চট্টগ্রামের আলোচিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের একজন। অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) করা চট্টগ্রাম মহানগরের ‘শুটার’ তালিকায় শহীদুলের নাম আছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহীদুলের মতো বাহিনী পরিচালনা, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা অনেকের নামই নেই পুলিশের তালিকায়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার ছাড়া) পুলিশের তালিকার বাইরে অন্তত ১৩৯ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম মহানগরেই তালিকার বাইরে রয়েছে অন্তত ৮৫ জন। অথচ পুলিশের তালিকায় মহানগরে ‘শুটার’ হিসেবে নাম আছে মাত্র ৯ জনের।
চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় পুলিশের তালিকায় মোট ১০৯ জনের নাম রয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের তালিকায় যতজনের নাম আছে, অনুসন্ধানে তার চেয়েও বেশি অস্ত্রধারীর তথ্য মিলেছে, যারা তালিকার বাইরে। এতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই তালিকার পূর্ণতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহীদুলের মতো বাহিনী পরিচালনা, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা অনেকের নামই নেই পুলিশের তালিকায়।
পুলিশের তালিকায় থাকা শহীদুল ইসলাম ভোলার দৌলতখানের বাসিন্দা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম ষোলশহর এলাকায় অবস্থান করে তিনি বাহিনী পরিচালনা করতেন। চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ, টর্চার সেল পরিচালনা ও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর র্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও তাঁর বাহিনী নগরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।
এসবির উদ্যোগে গত ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশের ‘শুটারদের’ একটি তালিকা করা হয়। সেখানে মোট ২৪৩ জনের নাম, মামলা, তাঁরা কারাগারে নাকি জামিনে রয়েছেন—এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলার ১০৯ জনের নাম রয়েছে। হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুটারদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যেই পুলিশ এই তালিকা করে।
তালিকায় চট্টগ্রাম মহানগরের শুটার হিসেবে ৯ জনের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. রায়হান, মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন, বাদশা ওরফে ছোট বাদশা, মো. আলাউদ্দিন, মো. হেলাল ওরফে মাছ হেলাল, মো. নজরুল ইসলাম সোহেল, শহীদুল ইসলাম ও নুরে আলম সোহাগ। এর মধ্যে বোরহান উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন পলাতক। বাকিদের কেউ কারাগারে, কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার ছাড়া) পুলিশের তালিকার বাইরে অন্তত ১৩৯ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম মহানগরেই তালিকার বাইরে রয়েছে অন্তত ৮৫ জন। অথচ পুলিশের তালিকায় মহানগরে ‘শুটার’ হিসেবে নাম আছে মাত্র ৯ জনের।

এই ৯ জনের বাইরে কেবল চট্টগ্রাম মহানগরেই আরও ৮৫ জন অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসীর’ তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের নাম তালিকায় আসেনি।
এর বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগের সাত জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার বাদে) পুলিশের তালিকায় শুটার রয়েছে ১০০ জন। সবচেয়ে বেশি ৩৩ জনের নাম রয়েছে নোয়াখালী জেলায়। তবে তালিকার বাইরে আরও অন্তত ৫ জন অস্ত্রধারীর নাম পাওয়া গেছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণের ঘটনার ছবি ও ভিডিও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাওয়ার পর আলোচনায় ছিল ফেনী। কিন্তু পুলিশের তালিকায় ফেনী জেলায় অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নাম রয়েছে কেবল ৫ জনের। আরও ৩৩ জনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে, যাঁদের অনেকে অস্ত্রধারী হিসেবে এলাকায় বহুল পরিচিত; কিন্তু তাঁদের নামও পুলিশের তালিকায় আসেনি।
পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসীদের’ অনেকেই বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরসহ এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় রয়েছে। তারা খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত।

একইভাবে চট্টগ্রাম জেলায় অন্তত ১১ জনের নামও তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও এমন কয়েকজনের নাম বাদ গেছে।
পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসীদের’ অনেকেই বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরসহ এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় রয়েছে। তারা খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। পেশাদার অপরাধীর বাইরে অস্ত্রধারীদের কেউ কেউ বিএনপির ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো কোনো অস্ত্রধারীকে এনসিপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও দেখা গেছে, যাঁরা একসময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভ্যুত্থানের পর যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল, তখন থেকেই চট্টগ্রামের পেশাদার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তা পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বিভাগের ১১ জেলায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৯০টি খুনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২৭টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চাঁদাবাজি, জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক বিক্রি, আধিপত্য বিস্তার, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা, কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধ ও রাজনৈতিক বিরোধে এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে।
শুধু চট্টগ্রাম জেলায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ২৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম পুলিশের একটি সূত্র বলছে, জানুয়ারি মাসের ২৬ দিনেই ১২টি খুন হয়। সর্বশেষ ৮ মে রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী রৌফাবাদ এলাকায় পাঁচ-ছয়জন অস্ত্রধারী হাসান রাজু নামের একজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে পালিয়ে যায়। হাসান এর আগে গত ২৬ এপ্রিল রাউজানে যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। পুলিশ বলছে, পূর্ববিরোধের জেরে খুনের প্রতিশোধ নিতে এই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে।
পেশাদার অপরাধীর বাইরে অস্ত্রধারীদের কেউ কেউ বিএনপির ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো কোনো অস্ত্রধারীকে এনসিপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও দেখা গেছে, যাঁরা একসময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন।

চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামে কারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, কারা চাঁদার জন্য ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গিয়ে গুলি করে, হুমকি দেয়—সেটা পুলিশের অজানা নয়। কিন্তু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নেই।
ভুক্তভোগীদের এই অভিযোগের যৌক্তিকতা মেলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পুলিশি পাহারায় থাকা চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর বাসায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘ফিল্মি স্টাইলে’ গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত অস্ত্রধারীদের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আবার ৫ নভেম্বর নগরের চান্দগাঁও এলাকায় জাতীয় নির্বাচনের গণসংযোগ অনুষ্ঠানে গুলির ঘটনায় ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নিহত হন। এ ঘটনায়ও কাউকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
চট্টগ্রামের বেপরোয়া অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম ১০ মে প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান ও সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অস্ত্রধারীরা বেপরোয়া, পায় রাজনৈতিক আশ্রয়
ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছেন মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। গত ৯ মে বিকেলে ইমন ফোন করে বাংলা টিভির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিপ্লব দে পার্থর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বিপ্লব দে। তিনি জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকও। বিপ্লব দে পার্থ প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে ধারাবাহিকভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সদ্য বদলি হওয়া কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন গত ১০ মে প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়েছে এবং অভিযোগ তদন্ত করে অভিযুক্ত ইমনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশের ‘শুটার’ তালিকায় নাম থাকা মোবারক পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী। তাঁর বাড়ি ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকায়। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর কিছু ছবিতে ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র বহনের প্রমাণ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও খুনের আটটি মামলা রয়েছে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তালিকায় নাম রয়েছে আরেক আলোচিত অস্ত্রধারী মো. রায়হানের। তাঁর নাম চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা—দুই তালিকাতেই রয়েছে। রায়হানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও খুনের অভিযোগে ১৩টি মামলা রয়েছে। একের পর এক হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় তাঁর নাম এলেও তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত বছরের ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় গোলাগুলির ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে নজরুল ইসলাম ও বোরহানের নাম। স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, নজরুল ইসলাম পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন তাঁতী লীগের সভাপতি ছিলেন। আর বোরহান চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক এবং বর্তমানে যুবদলের পদপ্রত্যাশী। পুলিশ সূত্র জানায়, দুজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদকের আটটি করে মামলা রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বোরহান ও তাঁতী লীগ নেতা নজরুল নিজেদের নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহর অনুসারী পরিচয় দিয়ে আসছেন। তবে গাজী সিরাজ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে এই দুজনের কোনো সম্পর্ক নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেন তাঁর ছবি ব্যবহার করে নগরের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের টাঙানো ব্যানার তুলে ফেলার নির্দেশ দেন। এরপর বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় লাগানো কিছু ব্যানার খুলে ফেলেন মো. জসিম নামে যুবদলের এক কর্মী। এর মধ্যে শাহাদাত ও সিরাজের ছবিসহ বোরহানের একটি ব্যানারও ছিল। ব্যানার ছেঁড়ার কারণে রাতে জসিমকে আট থেকে দশজনের একটি দল তুলে নিয়ে যায়। আটকে রেখে মারধর করা হয়। জসিমকে আটকে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে যান ছাত্রদল-যুবদলের কিছু নেতা-কর্মী। এ সময় বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বোরহানের লোকজন। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাজ্জাদ নামের এক ছাত্রদলকর্মীর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় নিহত সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ আলমের করা মামলায় যুবদলের আট কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় বোরহান ও নজরুলও আসামি। পুলিশ সূত্র বলছে, বাকলিয়া এলাকায় জায়গা দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে আসছেন তাঁরা। এখনো তাঁরা গ্রেপ্তার হননি।
চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় আলোচিত এসব অস্ত্রধারীর নাম পুলিশের তালিকায় না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।

পুলিশের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম থাকা নুরে আলম সোহাগ ছাত্রদলের খুলশী থানার সদস্যসচিব। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় একদল অস্ত্রধারী নিয়ে প্রকাশ্যে গোলাগুলি করে আতঙ্ক ছড়ান তিনি। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে ওই বছরের ১৮ নভেম্বর ওমর গণি এমইএস কলেজে প্রকাশ্যে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে নুরে আলম সোহাগের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নগরের দামপাড়া ইউনিক কাউন্টারের সামনে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়কের আত্মীয়ের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা ঘটনাটির মীমাংসা করে দেন বলে জানা গেছে।
নুরে আলম সোহাগ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র নেই। ওমরগণি এমইএস কলেজে প্রকাশ্যে পিস্তল দিয়ে গুলি করার ঘটনাও অস্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন আইনে একাধিক মামলা থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নাম নেই পুলিশের তালিকায়। চাঁদা না পেলেই অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার ছোট সাজ্জাদের অনেকগুলো ভিডিও ফুটেজ প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
নুরে আলম চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শরীফুল ইসলাম তুহিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এ বিষয়ে শরীফুল ইসলাম গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে পুলিশের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকায় নুরে আলম সোহাগের নাম এসেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশের সঙ্গে এই তালিকা নিয়ে কথা বলবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রসহ নুরে আলমের ছবি ছড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে শরীফুল ইসলাম বলেন, নুরে আলম এ ধরনের কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. শওকত আলী গত ১০ মে প্রথম আলোকে বলেন, মহানগর এলাকার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যারা চাঁদার জন্য হত্যার হুমকি দিচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
আলোচিত অনেকের নাম নেই তালিকায়
চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নাম নেই পুলিশের তালিকায়। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মারামারির ১৮টি মামলা রয়েছে। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী তিনি। গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এখন তিনি কারাগারে আছেন। চাঁদা না পেলেই অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার ছোট সাজ্জাদের অনেকগুলো ভিডিও ফুটেজ প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
পুলিশের তালিকায় নাম নেই ইসমাইল হোসেন ওরফে টেম্পুরও। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, চাঁদা না পেয়ে বিভিন্ন সময় একাধিক গুলির ঘটনা ঘটিয়েছেন ইসমাইল। একসময় টেম্পোচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করা ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশু হত্যা, চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ ৩০টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
ইসমাইল হোসেনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায়। বড় হয়েছেন চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার পশ্চিম ফরিদারপাড়া এলাকায়। কিশোর বয়সে গড়ে তোলেন ‘টেম্পু বাহিনী’। অর্ধশতাধিক উঠতি সন্ত্রাসী রয়েছে তাঁর বাহিনীতে। এই বাহিনীর অনেক সদস্যের কাছেই অস্ত্র রয়েছে। তারা বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও থানা এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত।
চান্দগাঁও এলাকার আরেক অস্ত্রধারী মো. মুন্নার নামও নেই পুলিশের তালিকায়। ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর নগরের পাঁচলাইশ বাদুরতলা এলাকায় একটি গ্যারেজের সামনে গুলি ছোড়েন তিনি। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি নগরের হিলভিউ এলাকায় অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করা আরেক ব্যক্তি মো. জাহেদের নামও নেই পুলিশের তালিকায়। এ ছাড়া শামীম আজাদ ওরফে ব্ল্যাক শামীম, বায়েজিদ এলাকার সাদ্দাম হোসেন ওরফে গলাকাটা বাঁচা, সাইফুল আলম ওরফে বার্মা সাইফুল, তাঁর ভাই মো. সবুজ ওরফে বার্মা সবুজ, সৈয়দুল করিম, আবু বক্কর, খোরশেদ আলম, বোরহান উদ্দিন ও মোহাম্মদ হাসানের নামও আসেনি পুলিশের তালিকায়। তবে বিভিন্ন সময় তাঁদের অস্ত্রসহ মহড়া দিতে ও গুলি করতে দেখা গেছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া ও গুলি ছোড়া অনেকের নামও নেই ‘শুটার’ তালিকায়। আন্দোলনের সময় নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করেন যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা। গুলিতে ১৫ জন নিহত হন। পরে এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে পুলিশ ৪৬ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করে। এর মধ্যে ২০ জনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-পুলিশ। কিন্তু পুলিশের বিশেষ শাখার করা তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া ৪৬ জনের কারও নাম নেই ওই তালিকায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই নগরের মুরাদপুর এলাকায় পিস্তল হাতে ছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। সেই ছবিও ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর নামও নেই শুটার তালিকায়। একইভাবে জুলাই আন্দোলনের সময় অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়া যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া মো. ফিরোজ, নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংগঠক মো. দেলোয়ার, যুবলীগ কর্মী এন এইচ মিঠু, মো. জাফরসহ অনেকের নাম নেই তালিকায়।
চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় আলোচিত এসব অস্ত্রধারীর নাম পুলিশের তালিকায় না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশ শুটারদের বেশির ভাগকে গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে আটক থাকায় হয়তো তাঁদের নাম বাদ পড়েছে। তালিকায় না থাকলেও পলাতক শুটারদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় পুলিশের তালিকায় ১৯ জনের নাম রয়েছে। তবে তালিকার বাইরে বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ১১ জন অস্ত্রধারীর তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের সদ্য বিদায়ী ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান গত মে মাসে প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুটারদের গ্রেপ্তারে আমরা খুবই আন্তরিক। প্রতিনিয়ত তাদের ওপর নজরদারি রয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছে।’
চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বেশি, কিন্তু তালিকায় নাম কম কেন—জানতে চাইলে তখন তিনি বলেছিলেন, এটি চলমান প্রক্রিয়া। তালিকায় থাকুক না থাকুক, নজরদারি রয়েছে।
ফেনীর চিহ্নিত অস্ত্রধারীদের নামই নেই
পুলিশের তালিকায় চট্টগ্রাম বিভাগের সাত জেলায় শুটার হিসেবে ১০০ জনের নাম এসেছে। তবে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে তালিকার বাইরে আরও ৫৪ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য পেয়েছেন।
পুলিশের ‘শুটার’ তালিকায় ফেনীর পাঁচজনের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন জিয়া উদ্দিন বাবলু (৩৫), মো. রেজাউল করিম নাদিম (৩৭) , করিমুল্লাহ বিকম ওরফে রেনছু করিম (৫৭), মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মাসুদ (৩৬) ও সাহিদুল ইসলাম (৩২)। তবে আলোচিত ও পরিচিত অনেক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর নাম তালিকায় আসেনি। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে এমন অন্তত ৩৩ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর অনুসারী।
২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট নিজাম হাজারী ও তাঁর অনুসারীরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করেছিলেন। গত বছরের ২ অক্টোবর প্রথম আলোতে ‘ফেনীর সেই অস্ত্রধারীরা ধরা পড়েনি, অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়া ৩০ জন অস্ত্রধারীর নাম প্রকাশ করা হয়। অস্ত্রসহ অনেকের ছবিও প্রকাশিত হয়। কিন্তু পুলিশের তালিকায় তাঁদের নাম নেই।
পুলিশের ‘শুটার’ তালিকায় ফেনীর পাঁচজনের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন জিয়া উদ্দিন বাবলু (৩৫), মো. রেজাউল করিম নাদিম (৩৭) , করিমুল্লাহ বিকম ওরফে রেনছু করিম (৫৭), মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মাসুদ (৩৬) ও সাহিদুল ইসলাম (৩২)। তবে আলোচিত ও পরিচিত অনেক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর নাম তালিকায় আসেনি।
নিজাম হাজারী চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছিরের ‘ক্যাডার’ ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি চট্টগ্রামে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ২০০০ সালের ১৬ আগস্ট অস্ত্র আইনে ডবলমুরিং থানার একটি মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড হয় নিজাম হাজারীর। অস্ত্র মামলায় সাজা ভোগ করলেও তাঁর নামও তালিকায় নেই। নিজাম হাজারী গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে পালান।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অস্ত্রধারীদের মধ্যে প্রকাশ্যে যাঁদের গুলি ছুড়তে দেখা গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফেনী জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান ওরফে খোকন হাজারী। সেদিন মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে দেখা গিয়েছিল ফেনী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কহিনুর আলম, কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফকে। রাইফেল নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে আজগর ফকিরকে। ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে ছিলেন জেলা সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নূর করিম জাবেদ, অর্ণব ও রাকিবকে।
অস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে শর্শদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জানে আলম, ফাজিলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুল হক (রিপন), ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন মজুমদার, ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী (সোহেল), জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির, দাগনভুঞা উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম (পিটু), জেলা যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ১৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সোহেল ওরফে ব্ল্যাক সোহেল, সোনাগাজী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (ভুট্টু), ফেনী পৌর যুবলীগের সভাপতি রফিক ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বাবলু, পৌর যুবলীগ নেতা মোহন, নাহিয়ান ও সাব্বিরকে।
ফেনী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর সাইফুর রহমান ও আবুল কালাম ওরফে গরু কালাম; ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন, ধলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নূর নবী, শর্শদী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম সম্রাট, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, মঙ্গলকান্দি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেনকে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করতে দেখা গেছে।
কিন্তু ফেনী থেকে পাঠানো এসবির তালিকায় এঁদের কারও নামই রাখা হয়নি। এই বিষয়ে গত ২ জুন কথা হয় তৎকালীন ফেনী জেলা পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। পরে তিনি অন্যত্র বদলি হয়েছেন। তখন তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এসবির এই বিষয়গুলো খুবই গোপনীয়। তাঁর সময়কালে অস্ত্রধারীদের তথ্য-উপাত্ত তিনি পাননি। কিছু অস্ত্রধারীর তথ্য জেলা পুলিশের কাছে রয়েছে।
সদ্য বিদায়ী এই পুলিশ সুপার দায় এড়ালেও জেলা পর্যায়ে এসবি তাঁর অধীনেই কাজ করে। সুনির্দিষ্টভাবে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসবির দায়িত্বপ্রাপ্ত।
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. সাইফুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে তৎকালীন আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল, তাদের শনাক্ত করে পুলিশ ২৬ জনের একটি তালিকা করেছে। সে তালিকা ফেনী থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
নোয়াখালীর মির্জার ক্যাডারদের নামও নেই
নোয়াখালীতে তালিকার বাইরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত পাঁচজন অস্ত্রধারীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন বসুরহাট পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. রাসেল, শহীদ উল্যাহ রাসেল, শাহাদাত হোসেন সাহেদ, ফয়সাল আহম্মেদ জিসান ও রাজু ওরফে রাজু খান। তাঁদের মধ্যে শহীদ উল্যাহ রাসেলের অস্ত্রসহ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্থানীয় পুলিশ সূত্র বলছে, তাঁরা কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার আলোচিত সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জার ক্যাডার। ২০২১-২২ সালে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় তাঁদের প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা যায়। ওই সময় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে স্থানীয় সাংবাদিক মো. মুজাক্কির এবং শ্রমিক লীগ নেতা আলা উদ্দিন নিহত হন।
নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আরিফ হোসেন গত মাসে প্রথম আলোকে বলেন, তালিকায় কোনো এলাকায় কারও নাম বাদ পড়েছে কি না, সেটা তিনি বলতে পারছেন না। তবে পুলিশ জেলার প্রতিটি উপজেলায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিষয়ে এর মধ্যে তথ্য সংগ্রহ করেছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় জানা গেছে। এর মধ্যে আবুল কালাম আজাদ একসময় জাতীয় পার্টি করতেন। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁকে এনসিপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেখা যায়। হাতিয়া থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা আছে। মো. কামাল আওয়ামী লীগের কর্মী, মো. হৃদয় বিএনপির কর্মী। ইউসুফ মেম্বার আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; বর্তমানে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ থেকে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির হাতিয়া উপজেলা আহ্বায়ক মো. সামছূত তিব্রিজ প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের বিষয়ে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী তাঁদের অস্ত্র হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং তাঁদের দিয়ে নানা অপকর্ম করিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে কোনো অপরাধে জড়িত না থাকায় তাঁদের এনসিপিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
অন্য জেলায়ও বাদ পড়েছে অনেকে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অস্ত্রধারী হিসেবে তালিকায় রয়েছে ১৮ জনের নাম। তালিকার বাইরে গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় আলোচিত শাকিল সিকদার ওরফে লায়নের নাম পাওয়া গেছে। ভিডিও ফুটেজে তাঁকে বন্দুক হাতে গুলি করতে দেখা যায়। পরে ভারতে পালানোর সময় তিনি বিএসএফের হাতে আটক হন। বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠকের পর তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগে তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলিসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। তবে পুলিশের তালিকায় শাকিলের নাম নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা পুলিশের কাছে আছে। গোপনীয়তার স্বার্থে সেই তালিকা প্রকাশ করা যায় না। জেলায় যেসব আগ্নেয়াস্ত্রের ঘটনা ঘটেছে, তাদের নামসহ অস্ত্রধারীর তালিকায় থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরে পুলিশের তালিকায় ছয়জনের নাম রয়েছে। এ কে এম সালাহ উদ্দিন (টিপু), খোরশেদ আলম, কাউসার ওরফে ছোট কাউসার, রাহাত হোসেন (বাবু), রিয়াজ ওরফে চিতা ও আব্দুল খালেক। এঁদের মধ্যে জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন (টিপু) লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সাবেক আলোচিত মেয়র প্রয়াত আবু তাহেরের ছেলে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট আন্দোলন চলাকালে টিপু নিজ বাসার ছাদ থেকে গুলি করে অনেককে আহত করেন।
তালিকায় কুমিল্লার ছয়জনের নাম এসেছে। ১৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে অনেকের যে নাম বাদ পড়েছে, সেটার কিছু উদাহরণ রয়েছে। যেমন ২০২২ সালের ৫ নভেম্বর কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিন টাউন হল মাঠের বাইরে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দলীয় কর্মী মেহেদী হাসান গুলি ছুড়ছে এবং সীমান্ত অস্ত্রে গুলি ভরছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট লালমাই উপজেলায় বিএনপির কর্মিসভায় হামলা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সদস্য আবাদ হোসেন, যুবলীগ কর্মী নাইম হোসেন ও ছাত্রলীগ কর্মী মাহমুদ হোসেনকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়। এ ছাড়া চৌদ্দগ্রামের যুবলীগ নেতা মোস্তফা মনিরুজ্জামান ওরফে ‘বন্দুক জুয়েল’ এলাকায় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরার কারণে আলোচিত ছিলেন। কিন্তু এঁদের কারও নামই তালিকায় নেই।
এমন তালিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এটা গোপনীয় বিষয়। এটা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ নেই। তবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা সব সময় এক অবস্থায় থাকে না। এটা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হয়।
ত্রুটিপূর্ণ তালিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের তালিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের তালিকা করতে হয় অনেক যাচাই-বাছাই করে। যাতে কোনো ভুল নাম তালিকাভুক্ত না হয়, আবার দাগি সন্ত্রাসীদের নাম যেন বাদ না পড়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তালিকা ভুল হলে ধরে নিতে হবে গোড়াতেই গলদ। তালিকা অসম্পূর্ণ হলে অভিযানও অসম্পূর্ণ হবে; ফলে অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। তিনি বলেন, ত্রুটিপূর্ণ তালিকা হলে এটা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমনটা না হয়।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধি, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী]