সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / বিশ্বকাপ ফুটবলের উৎসব শেষ, এবার পরিবেশের হিসাব
বিশ্বকাপ ফুটবলের উৎসব শেষ, এবার পরিবেশের হিসাব

বিশ্বকাপ ফুটবলের উৎসব শেষ, এবার পরিবেশের হিসাব

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেন ট্রফি জিতলেও মেলেনি আরেকটি হিসাব—যার এক পাশে ফুটবল, অন্য পাশে পরিবেশ। প্রশ্ন হলো, এটি কি ইতিহাসের সবচেয়ে কার্বন-নিবিড় ফুটবল বিশ্বকাপ? নাকি এ আসরই প্রমাণ করে দিল, আধুনিক ফুটবলের ভবিষ্যৎ শুধু মাঠে নির্ধারিত হয় না; তার ভাগ্য জড়িয়ে আছে জলবায়ু, ফ্যাশন, প্রযুক্তি ও মানুষের ভোগের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও।

এবারের আসর ছিল নজিরবিহীন। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ এবং তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে অনুষ্ঠিত এ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি পরিবেশবিদদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—এত বড় আয়োজনের প্রকৃত পরিবেশগত মূল্য কত?

এই বৈশ্বিক ফুটবল উৎসবের পরিবেশগত মূল্যও কম নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ ৪ দশমিক ২ থেকে ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য বলে অনুমান করা হয়েছে। এ পরিমাণ নির্গমন একটি ছোট দেশের বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের কাছাকাছি। গবেষণাভেদে সংখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কার্বন-নিবিড় বিশ্বকাপগুলোর একটি।

কার্বনের সবচেয়ে বড় উৎস

অনেকের ধারণা, স্টেডিয়ামের আলো বা আতশবাজিই বুঝি সবচেয়ে বড় দূষণকারী। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ভ্রমণ। তিনটি দেশ, ১৬টি শহর এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ছড়িয়ে থাকা ম্যাচ ভেন্যুর কারণে দল, কর্মকর্তা, গণমাধ্যম ও লাখো সমর্থককে নিয়মিত বিমানযাত্রা করতে হয়েছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, মোট সম্ভাব্য কার্বন নির্গমনের সিংহভাগই এসেছে বিমানভ্রমণ থেকে।

এমনকি বিশ্বকাপ চলাকালে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একাধিক আন্তমহাদেশীয় ও আন্তনগর বিমানযাত্রাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

মাঠের বাইরে আরেকটি বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ফুটবল নয়; এটি একই সঙ্গে ফ্যাশন, বিপণন, বিনোদন ও ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মঞ্চগুলোর একটি।

প্রতিটি বিশ্বকাপেই কোটি কোটি নতুন জার্সি বিক্রি হয়। সীমিত সংস্করণের কালেকশন, বিশেষ সংস্করণের বুট, ক্যাপ, স্কার্ফ, জ্যাকেট—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল একটি ভোক্তা অর্থনীতি।

২০২৬ বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়।

তবে এবার একটি নতুন প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। বড় স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক এবং তুলনামূলক কম কার্বন উৎপাদনপ্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জোর দিয়ে প্রচার করেছে। গরম আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানোর জন্য নতুন ধরনের পারফরম্যান্স ফেব্রিকও তৈরি হয়েছে। এগুলো দেখায় যে শিল্পটি পরিবেশগত চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু সমস্যার শেষ এখানেই নয়; কারণ, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাজারে আসে বিপুল পরিমাণ অনানুষ্ঠানিক ফ্যান মার্চেন্ডাইজ।

সস্তা টি-শার্ট, নকল জার্সি, পতাকা, ক্যাপ, স্কার্ফ—যার বড় অংশই কয়েক সপ্তাহ ব্যবহারের পর অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

ফ্যাশন–গবেষকদের মতে, এই ইভেন্টনির্ভর ভোগবাদ টেকসই উৎপাদনের প্রচেষ্টাকে আংশিকভাবে দুর্বল করে দেয়। অর্থাৎ একদিকে ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করছে, অন্যদিকে বিশ্বকাপকে ঘিরে অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য আবার নতুন পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে।

হাফটাইম শো উপভোগ করছেন স্পেনের সমর্থকেরা। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম, ১৯ জুলাই

আশার আলো—ভিনটেজ জার্সির উত্থান

পুরো গল্পটাও হতাশার নয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে একটি ইতিবাচক প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে—ভিনটেজ ও রিসেল ফুটবল জার্সির বাজারের বিস্তার।

নতুন জার্সির বদলে পুরোনো বিশ্বকাপ জার্সি, ক্লাব জার্সি কিংবা সংগ্রহযোগ্য সংস্করণ কেনার প্রবণতা বেড়েছে।

এটি শুধু নস্টালজিয়ার বিষয় নয়; বরং একটি জার্সির ব্যবহারকাল যত বাড়বে, নতুন জার্সি তৈরির প্রয়োজন তত কমবে। আর সেটিই সার্কুলার ফ্যাশনের অন্যতম মূলনীতি।

ফ্যাশন–বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের স্পোর্টস মার্চেন্ডাইজ বাজারে রিসেল ও পুনর্ব্যবহার বড় ভূমিকা নিতে পারে।

জলবায়ু বদলাচ্ছে, ফুটবলও

এই বিশ্বকাপ আরেকটি বিষয় সামনে এনেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়; এটি বর্তমানের ম্যাচ ব্যবস্থাপনার অংশ।

উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহের কারণে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, অতিরিক্ত হাইড্রেশন বিরতি, ম্যাচের সময় নির্বাচন এবং দর্শকদের সুরক্ষা—এসব বিষয় আয়োজকদের পরিকল্পনায় বড় গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচিও (ইউএনইপি) উল্লেখ করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখন ফুটবলের মতো আউটডোর খেলাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।

মাঠে জলবায়ুর প্রভাব যতটা দৃশ্যমান, মাঠের বাইরের ডিজিটাল জগতের পরিবেশগত প্রভাব ততটাই অদৃশ্য। কিন্তু সেটিও দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে।

ডিজিটাল বিশ্বকাপের অদৃশ্য কার্বন ফুটপ্রিন্ট

বিশ্বকাপ এখন আর শুধু স্টেডিয়ামের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খেলা শেষ হওয়ার অনেক পরও তার উপস্থিতি ছড়িয়ে থাকে কোটি কোটি মুঠোফোন, স্মার্ট টিভি, ট্যাবলেট, ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোয়। একসময় একটি টেলিভিশনের সামনে বসেই বিশ্বকাপ দেখা যেত। এখন একই ম্যাচ একই সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য পর্দায় পৌঁছে যায়। সেই বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামোরও রয়েছে একটি পরিবেশগত মূল্য।

২০২৬ বিশ্বকাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এই ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিধি আরও বাড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট, স্বয়ংক্রিয় হাইলাইট তৈরি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভিডিও সুপারিশ এবং অন-ডিমান্ড ভিডিও ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে এই ডিজিটাল কার্বন ফুটপ্রিন্ট ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লাইভ স্ট্রিমিং, সম্প্রচার, ক্লাউডসেবা, ডেটা সেন্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সচল রাখতে প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেলেও সার্ভারগুলো থেমে থাকে না; কোটি কোটি দর্শকের দেখা, শেয়ার, মন্তব্য ও ভিডিও ধারণ করে রাখতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। এ কারণেই ডিজিটাল ফুটবলের কার্বন ফুটপ্রিন্টও জলবায়ু আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ডিকার্বনাইজেশন গবেষণা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভিডিও স্ট্রিমিং ও ডেটা সংরক্ষণের দ্রুত বিস্তারের ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। গবেষকদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ‘অদৃশ্য’ বা ‘পরিচ্ছন্ন’ মনে হলেও প্রতিটি এআই অনুরোধ, ভিডিও স্ট্রিম ও ক্লাউডসেবা ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বাস্তব কার্বন ফুটপ্রিন্ট তৈরি করে।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

বিশ্বকাপ আমাদের যা ভাবতে বাধ্য করল

২০২৬ বিশ্বকাপ এক অর্থে বৈপরীত্যের প্রতীক। একদিকে এটি দেখিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বড়, আরও বাণিজ্যিক এবং আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে; অন্যদিকে এই আসরই মনে করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ও জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা উপেক্ষা করে সেই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

শুধু বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের সব বড় ক্রীড়া আয়োজনের জন্যই এখন একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—দর্শকসংখ্যা, আয় কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও কি সাফল্যের অন্যতম মানদণ্ড হবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলো এখন টেকসই আয়োজনকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ফিফাও ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘ মেয়াদে নেট-জিরো লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য একটি টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকারভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ পাবে, সেটিই হবে আগামী বছরগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশের সামনে নতুন বাস্তবতা

বিশ্বকাপের জার্সি, ট্রেনিং কিট ও সমর্থকদের পোশাকের বড় একটি অংশ তৈরি হয় বাংলাদেশের কারখানায়। তাই বিশ্বকাপের পরিবেশগত বিতর্ক আমাদের জন্য দূরের কোনো বিষয় নয়; বরং এটি আমাদের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশ্ববাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে সার্কুলার অর্থনীতি ও টেকসই ফ্যাশনের দিকে অগ্রসর হয়েছে। অবিক্রীত পোশাক ধ্বংসের ওপর নিষেধাজ্ঞা, পোশাককে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী করার নীতি এবং টেক্সটাইলবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা—এসবই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতের বাজারে শুধু কম দামে উৎপাদন করলেই চলবে না; একটি পোশাক কতটা টেকসই এবং তার পরিবেশগত প্রভাব কতটা কম, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এদিকে ভিয়েতনাম, চীন আর ভারতও পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফাইবার, কম কার্বন উৎপাদন এবং সার্কুলার টেক্সটাইলে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতা এখন শুধু উৎপাদনক্ষমতার নয়, টেকসই উৎপাদনেরও।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে বাংলাদেশকে। বিশ্বের অন্যতম সবুজ পোশাক কারখানার দেশ হিসেবে আমাদের এখন পরবর্তী ধাপে যেতে হবে—পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফাইবার, বস্ত্রবর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সার্কুলার ফ্যাশনে আরও বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে। কারণ, ভবিষ্যতের রপ্তানিবাজারে শুধু দ্রুত উৎপাদন নয়, টেকসই উৎপাদনই হবে প্রতিযোগিতার নতুন মানদণ্ড।

শেষ কথা

বিশ্বকাপের ক্যারাভান চার বছর পর আবার ফিরবে। কিন্তু পৃথিবীর জলবায়ু আমাদের প্রতিদিনের প্রতিপক্ষ। আগামী বিশ্বকাপ শুধু আরও বড় হবে কি না, সে প্রশ্ন নয়; বরং আরও সবুজ হবে কি না, সেটিই ভবিষ্যতের আসল পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার ফল নির্ভর করবে মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তগুলোর ওপরও—উৎপাদনে, সরবরাহশৃঙ্খলে, প্রযুক্তিতে এবং আমাদের প্রতিদিনের ভোগের অভ্যাসে।

  • শেখ সাইফুর রহমান হাল ফ্যাশন–এর প্রধান। সাবেক ক্রীড়া সাংবাদিক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

কৃষি পরিসংখ্যানে গরমিল যেভাবে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি

কৃষি পরিসংখ্যানে গরমিল যেভাবে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি

কখনো উৎপাদন বেশি দেখানো হয়, কখনো কম। আবার মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি হিসাবেরও মিল পাওয়া যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *