ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজা উপত্যকায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে আসছেন।
তবে গত বৃহস্পতিবারের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে শুধু হামাসের জন্য নয়, ইসরায়েলের জন্যও কিছু শর্ত ছিল। এতে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলকে গাজা উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ধাপে ধাপে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু এসব শর্ত ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল ও দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েল সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, হামাসের ‘প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ’ নিশ্চিত হয়েছে বলে ইসরায়েল মনে না করা পর্যন্ত গাজা থেকে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দাবি, এ চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল খুবই সন্তুষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ করার বিষয়টি শুধু নেতানিয়াহুর জন্য নয়, ইসরায়েলের নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা অন্য সব রাজনীতিকের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা ইতিমধ্যে বলেছেন, ইসরায়েল যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি মেনে না চলে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খুব, খুব হতাশ’ হবেন।
ভোটের রাজনীতিতে আত্মঘাতী পদক্ষেপ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর অনেক ইসরায়েলি নাগরিক গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় যে যুদ্ধ চালিয়েছে, তাকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থা জাতিগত নিধন বলে উল্লেখ করেছে।
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই শিশু ও নারী। একই সঙ্গে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
গত মে মাসে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিদের ৮২ শতাংশ গাজায় ফিলিস্তিনিদের নিজ বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের পক্ষে। একই জরিপে আরও দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও তাঁদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের পক্ষে মত দিয়েছেন।
এক মাস পর প্রকাশিত আরেক জনমত জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী ইহুদিদের ৬৪ শতাংশের বিশ্বাস, গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘কোনো নিরপরাধ মানুষ নেই’।
এ ছাড়া ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রীরাসহ অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিক বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, একই ধরনের বসতি শিগগিরই গাজায়ও স্থাপন করা হবে।
এ কারণে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং উপত্যকাটির পুনর্গঠনের উদ্যোগের সম্ভাবনা অনেক ইসরায়েলির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ঘোষণার পরপরই দেশটির বিভিন্ন রাজনীতিক এর তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বিতর্কিত ইতামার বেন গভির এ চুক্তিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বেন গভির লিখেছেন, হত্যাকারীদের (হামাস) লক্ষ্য করে অভিযান বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অর্থ, হামাসকে পরবর্তী জাতিগত নিধনের জন্য নিজেদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। গাজায় লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে, ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। ইসরায়েলকেই জয়ী হতে হবে।
ইসরায়েলের ‘এলাকা ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করা’ কথাটিকে ব্যাপকভাবে জাতিগত নির্মূলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।
ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের মতো মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত রাজনীতিকেরাও এ চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
আইজেনকোট বলেন, যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে যেকোনো চুক্তি করা হলে তা হবে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা’।
আইজেনকোট লিখেছেন, ৭ অক্টোবরের (২০২৩ সাল) সেই সকাল থেকে প্রায় তিন বছর কেটে গেছে। অথচ (ওই বছরের) ৬ অক্টোবরের সন্ধ্যায় হামাসের যেসংখ্যক সশস্ত্র সদস্য ছিলেন, এখন তারা আবার প্রায় একই সংখ্যায় নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করেছেন।
শান্তির রাজনীতি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে মার্কিন-ইসরায়েলি জনমত বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পরামর্শক ডালিয়া শেইন্ডলিন মনে করেন, সামনে নির্বাচন থাকায় এ ইস্যুতে নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক মামলা চলমান। এগুলোয় তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেও কারাদণ্ড এড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ী হওয়া।
তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে বিরোধীরা এগিয়ে আছে। এমনকি তারা সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট আসনও পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডালিয়া শেইন্ডলিন বলেন, ৭ অক্টোবর থেকে চালানো হামলায় মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক (ট্রমা) তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নেতানিয়াহুর মাথাব্যথা নেই। তিনি মূলত রাজনীতির হিসাব-নিকাশই করছেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর জোটের শরিকদের চাওয়া-পাওয়া।

শেইন্ডলিনের মতে, গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা সরিয়ে নেওয়াটা নেতানিয়াহুর জন্য সহজ সিদ্ধান্ত হবে না। তিনি এমনভাবে পরিস্থিতি সামলাতে চাইবেন, যেন একদিকে ডানপন্থী ভোটার ও জোটের সমর্থন ধরে রাখা যায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও অসন্তুষ্ট না করা হয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই ইতিমধ্যে তাঁর ওপর বিরক্ত।
শেইন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহু চাইবেন না, ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র মনে করুক যে তিনি এ চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছেন। তাই তিনি হয়তো গাজার ভেতরে সেনাদের অবস্থানের ক্ষেত্রে কিছু প্রতীকী পরিবর্তন আনতে পারেন, কিন্তু পুরোপুরি প্রত্যাহার করবেন না।
শেইন্ডলিনের ধারণা, ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনীর যে অবস্থানে থাকার কথা ছিল, সেখানে ফিরিয়ে নেওয়াটা। তবে ওই চুক্তির পরও ইসরায়েল ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং চুক্তি উপেক্ষা করে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ করার বিষয়টি শুধু নেতানিয়াহুর জন্য নয়, ইসরায়েলের নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা অন্য রাজনীতিকদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা ইতিমধ্যে বলেছেন, ইসরায়েল যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি মেনে না চলে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খুব, খুব হতাশ’ হবেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েল অধ্যয়ন বিষয়ের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর জন্য যেকোনো সরকার গঠন করাটাই এখন কঠিন লড়াই। আর তিনি যদি এ চুক্তিতে সম্মত হন, তাহলে সে পথ আরও কঠিন হয়ে যাবে।
এর আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের ওপর আরোপিত বিভিন্ন শর্ত এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোটের ঐক্যও ধরে রেখেছিলেন। জোটের কয়েকটি দল বারবার হুমকি দিয়েছিল, হামাসের পুরোপুরি পরাজয় ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে তারা সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে।
সর্বশেষ চুক্তিটি নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো নীরব থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁকে এ বিষয়ে অবস্থান জানাতেই হবে।
গত মে মাসে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিদের ৮২ শতাংশ গাজায় ফিলিস্তিনিদের নিজ বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের পক্ষে। একই জরিপে আরও দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও তাঁদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, এটি নেতানিয়াহুর জন্য সত্যিকারের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, তিনি যদি এ চুক্তির সমালোচনা করেন, তাহলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন। যদিও ট্রাম্প এখনো ইসরায়েলের নির্বাচনে তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি, তবু নেতানিয়াহু নিশ্চয়ই আশা করছেন যে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তাঁর জন্য কোনো রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারেন।
ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, সেটি হতে পারে নেতানিয়াহুর ক্ষমার পক্ষে আবারও প্রকাশ্য বক্তব্য; সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও হতে পারে; কিংবা দুটোই হতে পারে। তাই ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে রাখাটা তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা এখন আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে কি না, এ নিয়ে অনেক ইসরায়েলি নাগরিকের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবু দেশটির অধিকাংশ মানুষ ও রাজনৈতিক মহল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর নির্ভর করার গুরুত্বকে স্বীকার করে। দুই দেশের সম্পর্কের সামান্য টানাপোড়েনকেও নেতানিয়াহুর সমালোচনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন তাঁর বিরোধীরা।
তবে ইসরায়েলের আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক প্রতিষ্ঠান মিটভিমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট নিমরোদ গোরেন বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু অতীতেও বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
গোরেনের মতে, নেতানিয়াহু এমন ব্যবস্থা করবেন যেন ট্রাম্প চুক্তির ঘোষণা দিতে পারেন এবং স্বাক্ষর অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পারেন। তবে নেতানিয়াহু সত্যিই গাজা থেকে সেনা সরিয়ে নেবেন বলে তিনি মনে করেন না।
এই ইসরায়েলি বিশ্লেষক বলেন, ‘আমার ধারণা, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নটি শুধু জনমতের বিষয় নয়। এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চিন্তা, আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
গোরেন আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নিজের সীমান্তের ভেতরে থাকলেই হবে না। সীমান্তের বাইরে যেখান থেকে হুমকি আসতে পারে, সেখানেও ইসরায়েলের উপস্থিতি থাকতে হবে। তাই আমার ধারণা, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, নেতানিয়াহু সেনা প্রত্যাহারের কথা বলার বদলে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন।’