সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / দই বানাতে দই লাগে, তাহলে প্রথমবার দই কীভাবে বানানো হয়েছিল
কখনো কি মনে এই প্রশ্ন এসেছে, দই বানাতে যদি আগে থেকেই একটু দইয়ের প্রয়োজন হয়, তবে পৃথিবীর একদম প্রথম দইটি তৈরি হয়েছিল কীভাবে? তখন তো দইয়ের বীজ হিসেবে ব্যবহার করার মতো কোনো দই–ই ছিল না

দই বানাতে দই লাগে, তাহলে প্রথমবার দই কীভাবে বানানো হয়েছিল

দই বানানোর নিয়ম অনেকেরই জানা। গরম দুধ ঠান্ডা করে সামান্য একটু পুরোনো দই মিশিয়ে ঢেকে রেখে দিলেই সুন্দর জমে যায় দই। কিন্তু কখনো কি মনে এই প্রশ্ন এসেছে, দই বানাতে যদি আগে থেকেই একটু দইয়ের প্রয়োজন হয়, তবে পৃথিবীর একদম প্রথম দইটি তৈরি হয়েছিল কীভাবে? তখন তো দইয়ের বীজ হিসেবে ব্যবহার করার মতো কোনো দই–ই ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দইয়ের জন্ম হয়েছিল একদম দুর্ঘটনাবশত। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন পশুর চামড়ার থলিতে দুধ জমা করে রাখত, তখন পশুর চামড়া থেকে একধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবেই দুধে মিশে যেত। এই ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব ও বিক্রিয়ায় সাধারণ তরল দুধ জমে টক ও ঘন দই হতো।

তবে কোনো আবিষ্কার কিন্তু মানুষের চারপাশের ছোট ছোট ঘটনা খেয়াল করার ওপর ভিত্তি করেই শুরু হয়। হাজার বছর আগে মানুষ ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব কী, তা একেবারেই জানত না। তারা শুধু দেখেছিল, পশুর চামড়ার থলিতে দুধ রাখলেই তা জমে চমৎকার টক দই হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে সবাই ভাবত, চামড়ার থলিটিতেই শুধু দই হয়। কিন্তু কিছুদিন পর মানুষ খেয়াল করল, থলির পুরোনো একটু দই রেখে তাতে নতুন দুধ ঢাললেই দ্রুত দই জমে যায়। এরপর তারা বুঝে গেল, আগের জমানো একটু দই অন্য পাত্রের দুধে মিশিয়ে দিলেই একই জিনিস ঘটে। এভাবেই অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জন্ম নেয় দই থেকে দই বানানো।

কিন্তু দইয়ের ইতিহাস কতটা পুরোনো? কোনো খাবার প্রাকৃতিক উপায়ে জমে বা পরিবর্তিত হয়ে নতুন স্বাদের নতুন খাবারে পরিণত হওয়ার ঘটনা কিন্তু লিখিত ইতিহাসের চেয়েও অনেক আগের। মানুষ যখন থেকে লিখতে বা পড়তে শিখেছে, তার বহু হাজার বছর আগে থেকেই প্রকৃতিতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে। ঠিক এভাবেই দুধে প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটিয়ে তৈরি করা দই মানুষের খাদ্যাভ্যাসের প্রাচীনতম উপাদানগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা দই

আজ দইকে ইংরেজিতে যে ‘ইয়োগার্ট’ (Yogurt) নামে চিনি, তার উৎস খোঁজা যাক। ইতিহাস বলে, আধুনিক দইয়ের আদি জন্মস্থান তুরস্ক। তুর্কি শব্দ ‘ইয়োগ’ থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি, যার সাধারণ অর্থ হলো কোনো তরলকে ঘন, জমাট বা গাঢ় করা। তবে ইংরেজি ভাষায় এই শব্দের ব্যবহার বেশ পরের ঘটনা। ১৬২৫ সালে স্যামুয়েল পার্চাস নামের এক ভ্রমণলেখক তাঁর লেখায় প্রথম এ বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছিলেন, তৎকালীন তুর্কিরা একধরনের টক ও ঘন দুধ খেতে খুব পছন্দ করত, যাকে তারা বলত ‘ইয়োগার্ড’।

তবে ইউরোপীয় বা ইংরেজি ভাষার ইতিহাসে লেখা থাকার বহু হাজার বছর আগেই মানুষ দই বানাতে শিখে গিয়েছিল। প্রাচীনকালের মানুষ হয়তো বিজ্ঞানের এই জটিল ব্যাকটেরিয়ার খেলা বুঝত না। কিন্তু তারা এটা ঠিকই বুঝেছিল দুধে এই পরিবর্তন ঘটলে তা সহজে নষ্ট হয় না এবং খেতেও চমৎকার লাগে।

খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে রোমান দার্শনিক প্লিনি দ্য এল্ডার লিখেছিলেন, তৎকালীন বর্বর হিসেবে পরিচিত কিছু জাতি দুধকে জমিয়ে দারুণ এক টকজাতীয় খাবারে রূপ দিতে পারত। আসলে আনাতোলিয়ার ছাগলপালকেরা ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার থলিতে দুধ জমিয়ে রাখতে গিয়েই প্রথম দই আবিষ্কার করে। পশুর চামড়ায় থাকা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে দুধের বিক্রিয়া ঘটে এবং তা জমে দইয়ে পরিণত হয়। তারও আগে, খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদশাস্ত্রে দুধ জমাট বেঁধে তৈরি করা খাবারের উপকারিতার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিখ্যাত শাসক চেঙ্গিস খান তাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনীকে নিয়মিত দই খাওয়াতেন। বিশ্বাস করা হতো, দই সৈন্যদের সাহসী ও শক্তিশালী করে তোলে। পরে ১৫৪২ সালে ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া তীব্র পেটের সমস্যায় ভোগার পর তুর্কি চিকিৎসকদের পরামর্শে দই খেয়ে সুস্থ হন। এর পরপরই তিনি পশ্চিম ইউরোপে দইয়ের প্রচলন করেন। কিছুদিন পর মানুষ দইয়ের সঙ্গে মধু, ফল ও দারুচিনি মিশিয়ে এটাকে উপাদেয় মিষ্টিতে রূপ দেয়।

টক দই

বিংশ শতাব্দীতে এসে বুলগেরিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র স্টামেন গ্রিগভ প্রথম আবিষ্কার করেন দই জমানোর পেছনে রয়েছে ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস বুলগারিকাস’ নামের একটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া। পরবর্তী সময়ে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এলি মেচনিকফ প্রমাণ করেন, বুলগেরিয়ার কৃষকদের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার পেছনে মূল রহস্যই ছিল এই দই। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দুধে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা দইকে বিশেষ টক স্বাদ দেয় এবং শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর উপাদান দূর করে। এর পর থেকেই পশ্চিমের দেশগুলোতে ফার্মেসিতে ওষুধ হিসেবে দই বিক্রি শুরু হয়।

১৯১৯ সালে আইজ্যাক ক্যারাসো দইয়ের সঙ্গে জ্যাম বা ফলের রস মিশিয়ে বাজারে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর ছেলে ড্যানিয়েল ১৯৩২ সালে ফ্রান্সে বিশ্ববিখ্যাত ‘ড্যানোন’ (Danone) নামের দইয়ের কোম্পানি ও গবেষণাগার গড়ে তোলেন। এর ঠিক চার দশক পর জোসেফ ও এডগার ডিকিনসন ব্রিটেনে বিখ্যাত ‘লংলি ফার্ম’ দই তৈরি শুরু করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

আজকের দিনেও খাঁটি দই তৈরিতে ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস’ ও ‘স্ট্রেপ্টোকোকাস’ নামের ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়। দুধকে দীর্ঘ সময় ধরে জমাট বাঁধতে দিলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দুধের চিনি ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে এবং দইকে সেই পরিচিত প্রাকৃতিক টক স্বাদ ও ঘন করে দেয়।

তবে ইদানীং সুপারমার্কেটে যেসব কৃত্রিম বা প্রক্রিয়াজাত দই পাওয়া যায়, সেগুলোতে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে দই জমতে দেওয়া হয় না। স্বাদ বা টেক্সচার ঠিক রাখতে মেশানো হয় রাসায়নিক উপাদান, স্টেবিলাইজার কিংবা মিষ্টিজাতীয় নানা উপাদান। তবে বাসায় দই বানাতে এমন কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। ভালো মানের দুধ আর হাজার বছরের পুরোনো সেই ব্যাকটেরিয়ার সঠিক ব্যবহারই পারে দইয়ের প্রাকৃতিক গুণ আর স্বাদ বজায় রাখতে।

সূত্র: লংলি ফার্ম

About Editor Todaynews24

Check Also

সালমান খান বললেন অভিনেতা হওয়ার মূল্য অনেক

ভক্তদের আগ্রহের শেষ নেই বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে ঘিরে। তার অভিনয়জীবন, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে নানা অভ্যাসও প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে। এবার অভিনেতাকে নিয়ে বহু বছরের পুরোনো এক মজার ও ব্যতিক্রমী স্মৃতির কথা শেয়ার করেছেন প্রযোজক ও শিল্পপতি শৈলেন্দ্র সিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *