আপনি কি সুডোকু মেলাতে পছন্দ করেন? ছুটির দিনে খবরের কাগজের পাতায় যখন সুডোকুর ছক মেলাতে বসেন, তখন নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেন কীভাবে একটি সংখ্যার সঙ্গে অন্য সংখ্যাগুলোর চমৎকার একটি প্যাটার্ন লুকিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের কাছে সংখ্যা দিয়ে তৈরি এই ধাঁধাগুলো নিছকই সময় কাটানোর উপায় হলেও, একদল মানুষের কাছে এটিই তাঁদের জীবন। সংখ্যার এই জাদুকরী জগৎ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের বলা হয় নাম্বার থিওরিস্ট বা সংখ্যাতাত্ত্বিক। ঠিক এমনই একজন প্রতিভাবান সংখ্যাতাত্ত্বিক জ্যাকব জিমারম্যান।
৪০ বছরের কম বয়সী গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল, যাকে গণিতের নোবেলও বলা হয়। এ বছর এই দুর্লভ সম্মাননাটি যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদেরই একজন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক জ্যাকব জিমারম্যান। কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, গণিতের এত বড় একটি স্বীকৃতি পাওয়ার পরও তিনি এখন তাঁর গবেষণার মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। সংখ্যাতত্ত্বের জগৎ ছেড়ে তিনি এখন ডুব দিচ্ছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গভীর রহস্য উদ্ঘাটনে!
৩৮ বছর বয়সী এই তরুণ গণিতবিদ মনে করেন, সংখ্যাতত্ত্বের আসল কাজ শুধু উত্তর খোঁজা নয়, বরং নতুন প্রশ্ন তৈরি করা। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৬৩৭ সালে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা একটি সমীকরণ লিখেছিলেন: an + bn = cn। তিনি বলেছিলেন, n-এর মান যদি ২-এর চেয়ে বড় কোনো পূর্ণসংখ্যা হয়, তবে এই সমীকরণের কোনো সমাধান থাকবে না। এখানে a, b, c অবশ্যই ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা হতে হবে।
ওয়াইলস ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলো এখন স্ট্রিং থিওরির মতো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানেও কাজে লাগছে!
ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করা যাক। n-এর মান যদি ঠিক ২ হয়, তবে এটি হয়ে যায় পিথাগোরাসের সেই চিরচেনা উপপাদ্য a2 + b2 = c2, যা দিয়ে সমকোণী ত্রিভুজের বাহুর দৈর্ঘ্য মাপা হয়। এর অনেক সমাধান আছে, কিন্তু n-এর মান ৩ বা তার বেশি হলেই আর কোনো সমাধান মেলে না।
ফার্মা তাঁর বইয়ের মার্জিনে লিখে গিয়েছিলেন, এর প্রমাণ তাঁর কাছে আছে, কিন্তু মার্জিনে জায়গা না থাকায় তিনি সেটি লিখছেন না! এরপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা এই ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। অবশেষে নব্বইয়ের দশকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ওয়াইলস আধুনিক সংখ্যাতত্ত্বের সাহায্যে এর সমাধান করেন।
জিমারম্যানের মতে, এ ধরনের সমীকরণগুলো দেখতে খুব ছিমছাম ও সুন্দর। এগুলো নিয়ে কাজ করলে গণিতের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অবাক করা সব সেতুবন্ধন তৈরি হয়। যেমন, ওয়াইলস এই উপপাদ্য প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলো এখন স্ট্রিং থিওরির মতো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানেও কাজে লাগছে!
সংখ্যাতত্ত্বের অনেক জটিল সমীকরণ এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে অধরা। তবে ২০২১ সালে জিমারম্যান এবং একদল গণিতবিদ মিলে আন্দ্রে-ওর্ট কনজেকচার নামে একটি বহুল চর্চিত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেন। এই কাজের জন্যই মূলত এ বছর তাঁর গলায় ফিল্ডস মেডেল উঠেছে।
জ্যাকব জিমারম্যানের জন্ম রাশিয়ার কাজান শহরে। তবে ১৯৯০ সালে তাঁর পরিবার পাড়ি জমায় ইসরায়েলে এবং পরে ১৯৯৬ সালে থিতু হয় কানাডায়।
বিষয়টা একটু বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বলা যাক। ধরুন, আপনি বিশাল বড় এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছেন। এর ভেতরে বিশেষ কিছু উজ্জ্বল বিন্দু বা মণি-মুক্তা ছড়ানো আছে। সাধারণ চোখে মনে হবে এগুলো বুঝি এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু আন্দ্রে-ওর্ট কনজেকচারের মূল কথা হলো, এই বিশেষ বিন্দুগুলো মোটেও এলোমেলো নয়, এরা নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট কিছু জ্যামিতিক রেখা বা কাঠামোর ওপর অবস্থান করে। উচ্চতর মাত্রার অতি জটিল জ্যামিতিক গঠনে এই বিন্দুগুলো কীভাবে কাজ করে, জিমারম্যান সেটিই গণিতের ভাষায় নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তাঁর পিএইচডি উপদেষ্টা পিটার সারনাকের মতে, ‘এ ধরনের মৌলিক সমস্যার সমাধান গণিতের ইতিহাসে খুবই বিরল’।
এবার একটু জ্যাকবের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানা যাক। কীভাবে তিনি গণিতের দুনিয়ায় এলেন? কেনই-বা এখন গণিত ছেড়ে অন্য জগতে ঢুকতে চান?
জ্যাকব জিমারম্যানের জন্ম রাশিয়ার কাজান শহরে। তবে ১৯৯০ সালে তাঁর পরিবার পাড়ি জমায় ইসরায়েলে এবং পরে ১৯৯৬ সালে থিতু হয় কানাডায়। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ২০১১ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর, ২০১৪ সালে তিনি কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর থেকে সেখানেই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে তাঁর সাধনা চলছে।
ফিল্ডস মেডেল জেতার পর জিমারম্যানের কাছে তাঁর কাজ সম্পর্কে মানুষকে বোঝানো আরও সহজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখন হাঁটছেন ভিন্ন পথে। তাঁর নতুন গন্তব্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
২০১১ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর, ২০১৪ সালে জ্যাকব জিমারম্যান কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর থেকে সেখানেই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে তাঁর সাধনা চলছে।
গত কয়েক বছরে এআই তাঁর কাজের গতি দ্বিগুণ করে দিয়েছে। বড় বড় গবেষণাপত্র পড়ে সারাংশ তৈরি করা কিংবা গাণিতিক প্রমাণের খসড়া বানানোর মতো কাজগুলো এআই নিমিষেই করে দিচ্ছে। জিমারম্যান মনে করেন, খুব শিগগিরই এআই গাণিতিক কাজে মানুষের চেয়েও বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে।
তাহলে ভয়টা কোথায়? জিমারম্যান খুব স্পষ্ট করেই বলেন, ‘অনেকের চোখেই আমার ধারণাগুলো একটু বেশিই চরমপন্থী মনে হতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এআই আমাদের সমাজ এবং পুরো মানবজাতির জন্য একটি ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর ভেতরে আসলে কী ঘটছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক বা তাত্ত্বিক ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি। এগুলো মূলত ট্রায়াল অ্যান্ড এরর বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ভর করে চলছে। জিমারম্যানের লক্ষ্য, গণিতের সাহায্যে এই সিস্টেমগুলোর একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করা। আমরা যদি সত্যিই বুঝতে পারি এগুলো কীভাবে কাজ করে, তাহলে হয়তো আমরা এআইকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, সঠিক পথে চালিত করতে পারব এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারব।